সাক্ষাৎকার

নেগেটিভ চিন্তাধারা সবখানেই খারাপ, সেটা ব্যক্তিগত জীবন, প্রফেশন কিংবা চ্যালেঞ্জেও: আলমগীর

ঢাকা, ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস ২৪):

অভিনেতা আলমগীরের দীর্ঘ ৪৫ বছরের ক্যারিয়ার। এই যাত্রায় অভিনেতা হিসেবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। আর ক্যামেরার পেছন কিংবা সামনে যেখানেই হোক না কেন, সব কিছুতেই যেন এক খুঁতখুঁতে ভাব। নিজের মনের মত করে হওয়া চাই। এরজন্য আলাদা সুনাম রয়েছে তার। তার হিসেব মতে-তিনি তার ক্যারিয়ারে একবার মাত্র ফটোসেশন করেছেন। যদি ভালো করে ইন্টারভিউ দেওয়ার কথা-সেটির সংখ্যার দিক থেকে ১০ কিংবা ১৫টার উপরে নয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক, গায়ক ও পরিচালক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে তার। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন নয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

নির্মাতা আলমগীরের ঝুলিতে রয়েছে, ‘নিষ্পাপ’, ‘নির্মম’, ‘বৌমা’, ‘মায়ের দোয়া’ ও ‘মায়ের আশীর্বাদ’ এর মতো চলচ্চিত্র। সর্বশেষ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন কলকাতায়। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা আলমগীর নির্মাণ করছেন ‘একটি সিনেমার গল্প’। পরিচালনার পাশাপাশি এতে একটি চরিত্রে অভিনয়ও করছেন তিনি। পরিচালনা, অভিনয় ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে কয়েকদিন আগে এফডিসির চার নাম্বার ফ্লোরের রূপসজ্জা কক্ষে বসে কথা বলেছেন তিনি।

আপনার ভাষ্য, ‘ছবিটি এখনকার সিনেমার গল্প নিয়ে’। আমার প্রশ্ন হচ্ছে-‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রটি বর্তমানে নির্মিত অন্যান্য সিনেমা থেকে কেন আলাদা হবে?

আলমগীর: আলাদা কেন হবে, সেটা আমি জানি না। কোন ছবিটি আলাদা, কোন ছবিটি কি, সেটি নির্ধারণ করবে দর্শক। আমার এই ছবিটার গল্পটা গতানুগতিক ধারার বাইরে। আর ভাল-মন্দটাও দর্শকরাই বিচার করবেন। আমি চেষ্টা করছি ভালো করতে।

দীর্ঘ বিরতির পর চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন আপনি। শুটিংয়ের সময় এমন কী ঘটেছে, আপনি শিল্পীদের কাছে অভিনয়ের জায়গা থেকে যেমনটি চাচ্ছেন, কিন্ত পাচ্ছেন না?

আলমগীর: সাধারণত শিল্পীরা তো কাঁদামাটির মত। যে পাত্রে রাখা হবে, তারা সে আকার ধারণ করবে। আর না পারার কোন কারণ নেই। আমার সাথে যারা এখন কাজ করছে, অন্য একটি সেটে গেলে তারা আরেকরকম কাজ করবে। কারণ ওই পরিচালক ওইভাবে চায়। আমি একজন পরিচালক হিসেবে যেভাবে চাচ্ছি, তারা আমাকে সেভাবেই দিচ্ছে। আর একজন পরিচালক তার মন মতো না পাওয়া পর্যন্ত শট ওকে করেন, এমন পরিচালক খুব কমই আছেন।

আমার ধারণা, আপনি এ প্রশ্নটির সম্মুখীন এর আগেও হয়েছেন, ক্যামেরার সামনে বহুবার দাঁড়িয়েছেন, এছাড়া ক্যামেরার পেছনেও দাঁড়িয়েছেন। এরমধ্যে আপনি পার্থক্যটা কী দেখতে পান?

আলমগীর: আমি তো অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৫ বছর হলো। সর্বশেষ বেশকিছু দিন আগেও অভিনয় করেছি। আমার ছবিটিতেও (একটি সিনেমার গল্প) করছি। আর এর আগে সর্বশেষ নির্মাণ করি ২০ বছর হল। এরমধ্যে ১-২টি নাটক করেছি টেলিভিশনের জন্য। রেগুলার অভিনয় না করার কারণ হলো- আমি যে জাতীয় চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী কিংবা মন থেকে তাগিদ আসে, সে ধরনের চরিত্র পাচ্ছিও না। এবং এ দেশে এ ধরনের চরিত্র লেখাও হয় না। তাই আমি করছি না।

অভিনয় এমন একটি জায়গা, যেখানে রিটায়ারমেন্ট নেই। যেখানে ভুলে যাওয়ারও কোন সুযোগ নেই। যারা অভিনয় করে তারা ভুলে যাবে, তা নয়। অভিনয় আমার প্যাশন। আমরা যারা এ দেশের অভিনেতা-অভিনেত্রী, তাদের ভেতরে একটা পাগলামি না থাকলে অভিনেতা-অভিনেত্রী হওয়া যায় না। অভিনয়ের সাথে যদি পরিচালনার কথা বলি-প্ল্যাটফর্ম তো দুটি। একটি ক্যামেরার সামনে, অন্যটি পেছনে। আগে অভিনয়টা খুব বেশি উপভোগ করতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, পরিচালনাটা আমার কাছে বেশি ভালো লাগছে।

বিষয়টা শুনতে কেমন জানি লাগে, তারপরও বলছি, নায়ক হিসেবে আপনি যে মাপের অভিনয় কিংবা জনপ্রিয়তাসহ অন্যান্য সব মিলিয়ে, কিন্তু পরিচালক হিসেবে সে মাপের নন। আর এ ধরনের ঘটনাও পৃথিবীতে ইতিহাসে বিরল। (ব্যতিক্রম হলিউডের ক্লিন্ট স্টুড) তারপরও আপনি কেন এ ঝুঁকিটা নিলেন?

আলমগীর: মানুষের জীবনের প্রত্যেকটি দিন একটি করে ঝুঁকি। আমি এখন শ্বাস নিচ্ছি, পরবর্তীতে কি হবে, তা আমি বলতে পারি না। ভেতরের শিল্পবোধের এক ধরনের তাগিদ তো থাকে। অভিনয় যেমন একটি আবিষ্কার, পরিচালনাও তেমন অন্য একটি ফর্মের আবিষ্কার। আবিষ্কারের প্রতি সব সময় আমার অন্যরকম ভালোবাসা ছিল। আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেই। আমি যে ছবিগুলোতে অভিনয় করেছি, সে ছবিগুলোতে আমাকে কিন্তু চরিত্রগুলোতে ঢুকতে হয়েছে। কারণ আমি তো ব্যক্তিগতভাবে তেমনটি নই। সোজা কথা, টোটাল জীবনটাই কিন্তু একটা রঙ্গমঞ্চ। সেখানে আমরা একেকজন একেকটা পাত্রপাত্রী। শুধু চরিত্রগুলো ভিন্ন।

তবে মূল চ্যালেঞ্জটা কী ছিল?

আলমগীর: চ্যালেঞ্জটা হলো কী, তুমি কিছু আবিষ্কার করতে চাইলে তোমাকে মনোযোগী হতে হবে, সে বিষয়টা ঘাটতে হবে, গবেষণা করতে হবে, ভালো দিকটা জানতে হবে, খারাপ দিকটা জানতে হবে। আগে, উপরে কী আছে, নিচে কী আছে, ডানে-বায়ে কি আছে, সব জানতে হবে।

উপমহাদেশের বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়না আপনার স্ত্রী, অন্যদিকে কন্যা আঁখি আলমগীর, বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী। তারা আপনাকে এ সিনেমাটির ক্ষেত্রে কীভাবে সহযোগিতা করছে?

আলমগীর: আচ্ছা, রুনা যখন গান করে সে কীভাবে গানটি গাইবে, আমি তো বলতে পারব না। চিত্রনাট্য কীভাবে হয়, কিংবা সংলাপ-সেটি তো রুনা বলতে পারবে না। এটা আমার প্রফেশন, গান গাওয়া তার প্রফেশন। আর হ্যাঁ এখন আমার ছবিতে গান লাগবে। সে গাইতে পারে, সুর করতে পারে। ওই জায়গাটাতে সে আমাকে সহযোগিতা করতে পারে। এবং করেছেও। যেটা সে তার ৫২ বছরের সঙ্গীত জীবনে কখনও করে নি, সেটি হলো সে কখনও সুর করে নি, এ ছবির জন্য সুর করেছে।

রুনা লায়লা এবং আপনি দুজনই বড় তারকা-ব্যক্তিজীবনের যখন কোন ইগোগত কিংবা কাজের ক্ষেত্রে যখন মতানৈক্যের কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তখন কী ভাবে সমাধান করেন?

আলমগীর: এখানে বড় তারকা, ছোট তারকা কিংবা মহা তারকা নয়। কার বাড়িতে গন্ডগোল হয় না? স্বামী-স্ত্রী সবার মধ্যেই হয়। আবার স্বামী-স্ত্রী মিলে সংসারও করছে। প্রেমও হয়, সবই হয়। আমরা তো রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। মান, অভিমানও চলে। প্রেম ভালোবাসাও চলে। সবই চলে। আর পৃথিবীতে কোন সংসারটা স্যাকরিফাইস ছাড়া আছে? সংসারটা চলে কিন্তু বিশ্বাস এবং ত্যাগের উপরে। এর বাইরে কেউ কোন দিন সংজ্ঞা দিতে পারে নি।

এই প্রসঙ্গটা নিয়ে আরও আগেই কথা বলা দরকার ছিল। তারপরও এখন বলি, আপনি বিশ্বাস করেন কী না জানি না, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট বর্তমানে অনেকেই বলেন, শাকিব খান ছাড়া নাকি ছবি চলে না, (তবে ব্যতিক্রমও আছে)। কিন্তু আপনার সিনেমায় তো শাকিব খান নেই?

আলমগীর: আমি প্রথমেই প্রশ্নটিতে ইনট্রাপ করতে চাই, শাকিব ছাড়া সিনেমা চলে না-এটা বলে শাকিবের প্রতি অন্যায় করা হয়। একজন শিল্পীর জীবনে সব ছবি কী জনপ্রিয়? চিত্রনায়ক রাজ্জাকের ক্যারিয়ারে যত ছবি রয়েছে, সবই কী হিট? এমন কী, আমার সব ছবিও হিট হয় নি। শাকিবের ছবিও সব হিট নয়। ক’টা হিট ছবি আছে ওর ক্যারিয়ারে? শাকিবের রোজার ঈদের ছবিগুলো হিট আছে। কিন্তু কোরবানীর দুটো কিন্তু হিট নয়।

শাকিব ছাড়া ছবি চলে না বলে ওকে তো প্রেশারে রাখার দরকার নেই। তাকে তার দায়িত্বটা পালন করতে দেওয়া উচিত। আমরা যারা অভিনয়শিল্পী, আমাদের দায়িত্ব আমাদের সেরা অভিনয়টা দেওয়া। ছবি চলা কিংবা না চলা কিন্তু শিল্পীর একার দায় নয়। এটা একটা টিমওয়ার্ক। তবে হ্যাঁ, একটি ছবি পুলের জন্য ইনিশিয়াল একজন স্টারের প্রয়োজন। সেই স্টার ভ্যালু শাকিবের এখন আনচ্যালেঞ্জড। সে একজন বড় তারকা। ব্যবসাটা কিন্তু অন্য ব্যাপার।

একটা বিষয়, অনেকেই তো ছবির বিভাজন করেন, কমার্শিয়াল ছবি, আর্ট ছবি- আপনি কী এ ধারার বিভাজনে বিশ্বাসী?

আলমগীর: আর্ট ছবি, কমার্শিয়াল ছবি কিন্তু আমার দৃষ্টিতে নেই। আমার কথা হল, ছবি হবে ছবি। দর্শক যেটা পছন্দ করছে সেটা ভালো ছবি, আর যেটা করছে না সেটা ভালো ছবি নয়। কারণ আমরা ছবি বানাই কার জন্য? এই যে বলা হচ্ছে অফট্রাকের ছবি, প্যারালাল ছবি। যদি সে ছবি হলে মুক্তি দেওয়া না হতো, আমি বলতে পারতাম এটি অন্য যে কোন ভাগের একটি ছবি। কিন্তু এই ছবিগুলো তো হলে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে বাণিজিক্যভাবে। বাণিজ্যের আশায়। বাণিজ্যিক দিকটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

আর শৈল্পিক ব্যাপারটা যে বলা হয়, পরিচালক থেকে হল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা হলো শৈল্পিক। বাকিটা কিন্তু বাণিজ্য। যারা প্যারালাল ছবি করছে তারাও কিন্তু বাণিজ্যের বিষয়টা মাথায় রেখেই করছে। আমার জীবনে আমি নাম নিব না, যারা এরকম বড় বড় বিখ্যাত বিখ্যাত ছবি করেছে, আমাদের দেশেরই যে কোন একজন পরিচালক, কক্সবাজারে শুটিংয়ে গিয়েছিল, আমি সন্ধ্যার সময় বসে আড্ডা মারছি। সন্ধ্যার সময় তিনি আমাকে একটি গল্পের লাইনআপ শুনালেন।

আমাদের দেশের ওয়ান অব দি বিগেস্ট ডাইরেক্টর আমাকে বলল, আলমগীর কেমন লাগল গল্পটা? আমি বললাম, খুব ভালো। এরপর বলল, চলবে না? তিনিও কিন্তু আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন? সেদিন আমার একটা শিক্ষা হয়েছিল। আমরা তো শিখে আসি নি। আমাদের কোন ইনস্টিটিউশন নেই। ওই যে বিখ্যাত লোকদের থেকেই ট্রেনিং নিয়েছি। তার মানে ছবি মানে ছবিই। যেটা আমি বানাচ্ছি দর্শক যদি পছন্দ করে তাহলে ভালো আর না করলে খারাপ।

আপনি এক ধরনের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেই শুটিং করছেন, সাংবাদিকদের প্রবেশও বিধি-নিষেধ রয়েছে। কেন?

আলমগীর: আমি আমার সেটে কেন সাংবাদিক প্রবেশ করতে দেই না কারণ ক্যামেরার সামনে যখন আমি দাঁড়াই কেউ কিছু বললে আমিও মনোযোগ দিতে পারি না। ৪৫ বছরের ক্যারিয়ারেও তাই। আমি সেটে কথা বলি না। টেলিফোনে কোন মন্তব্য দেই না। সাংবাদিক ঢুকতে পারে আমার সেটে, কিন্তু আমি কখনও কথা বলি নি। হাই হ্যালো পর্যন্তই।

অভিনয়ের প্রসঙ্গে আরেকটু কথা বলতে চাই, আগেই বলছিলেন মনের মতো চরিত্র পান বলেই অভিনয়ে নিয়মিত নন আপনি। পৃথিবীর অনেক দেশেই তো এমন রয়েছে- তারা শিল্পের খাতিরে অন্য দেশে গিয়ে নিয়মিত কাজ করেন-নিকোল কিডম্যান (অস্ট্রেলিয়া), রাসেল ক্রো (নিউজিল্যান্ড), জন মালাকাভিচ (যুক্তরাষ্ট্র), হিউ জ্যাকম্যান (নিউজিল্যান্ড) (ওসব দেশে ফ্রিকোয়েন্ট হয়। অন্যদেশ কিংবা ভাষায় গিয়ে অভিনয় করা। আমাদের উপমহাদেশে এদিক থেকে বিষয়টি কম কেন?

আলমগীর: তাহলে শুনো, গত বছরের ঘটনা। কলকাতা থেকে একজন পরিচালক হঠাৎ আমাকে ফোন করে বলল, দাদা আমার নাম…। আগে একটি ছবি করেছি…। এবার নতুন একটি ছবি নির্মাণ করছি নাম ‘আমার লবঙ্গ লতা’। বঙ্কিম চন্দ্রের একটি গল্প নিয়ে চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেছি। আপনাকে কাজটি করতে হবে। আমি বললাম, আমি তো তোমাকে জানি না। তারপর বলল, আমার ছবিতে ঋতুপর্ণা আছে। সেই আপনার কথা বলেছে। ও আপনার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করছে।

এরপর আমি আমার বইয়ের কালেকশন থেকে বের করে গল্পটি পড়লাম। সেই পরিচালককে ফোন করলাম। বললাম, তুমি তো ২০ দিন সিডিউল চাও। আমি তো ব্যবসা করি, আমার জন্য টাফ হয়ে যাবে। এরমধ্যে একদিন ঋতু ফোন করল। ওর সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক। আমি ওকে বললাম, তুই তো আমার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিস। এখন স্ত্রীর। ও বলল দাদা কিছু হবে না, করো।  তোমাকে ছাড়া হবে না। আমি বললাম, তুই রঞ্জিত মল্লিককে নে। ও বলল জমিদার ভাবটা আমাদের এখানে কোন আর্টিস্টের নেই।

শুনো, লক্ষ লক্ষ নদীর পানি কিন্তু সাগরে গিয়ে মিশে সাগরের তৃষ্ণা কিন্তু শেষ হয় না, সে কিন্তু আরও চায়। শিল্পীর অবস্থাও তেমনই। আবার একটি শিল্পী যত বড়ই হোক, তাকে সাগরের সঙ্গে মিশিয়ে দিই, সাগরের মতোই। যত বড় সাগর হবে, তাকে কিন্তু মাটির সঙ্গেই টাচ রাখতে হবে। যত বড়ই হও মাটিতে থেকো আকাশে উড়ে যাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ-ভারত পাশাপাশি বন্ধু রাষ্ট্র। কৃষ্টি, কালচারও অনেকটাই এক। তবে একটা বিষয়, বাংলাদেশে প্রচুর পরিমানে ভারত বিদ্বেষী দেখা যায়। ভারতেও প্রচুর বাংলাদেশ বিদ্বেষী রয়েছে। অনেকটা বলতে গেলে- যদি বাংলাদেশের কেনো ক্ষতি হয় তাহলে ভারত খুশি, আর ভারতের হলে বাংলাদেশ খুশি। তবে ভিন্নতাও রয়েছে, শিক্ষিত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে। এই যে একটা সংকট এর মূল কারণ কী?

আলমগীর: সত্য কথা বলতে আমি এ ধরনের সংকট অনুভব করি না। আমার দৃষ্টিতে আসে নি। আমি তো পুরো কলকাতার সঙ্গে মিশি না। পুরো বাংলাদেশকেও চিনি না। আমার একটা গন্ডি আসে। সত্য কথা বলতে আমি তাদের মধ্যে পাই নি। আমরা তাদের ছোট করি দেখি এমন কাউকে দেখি নি, তারাও আমাদের ছোট করে দেখে এমন কাউকে দেখি নি। আর আমি তো একটি বিষয়ে বিশ্বাসী, বিভিন্ন মানুষের দেশ থাকে, শিল্পীদের কোন দেশ নাই।

অনলাইন গণমাধ্যমে কথা বলা নিয়ে আপনার এক ধরনের অনীহা রয়েছে, কেন?

আলমগীর: কিছুদিন আগের ঘটনা, শাকিবের সঙ্গে পরিচালক সমিতির একটা ঝামেলা হল। আমি ডেকে মিটমাট করে দিলাম। শাকিব তো আমাদেরই ছেলে। কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে। আমরা যখন তরুণ ছিলাম কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলতাম। এখন তো আমাদের বয়স হয়েছে। বেঁফাস কথা আসবে না। আমি পরিচালক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বললাম। আমাকে বলল, আলমগীর ভাই আপনি বললে আমরা কোন মানা করব না। মিটমাট করলাম।

পরেরদিন একটি অনলাইন পত্রিকায় লিখে দিয়েছে, আলমগীরের নতুন ছবির নায়ক চেঞ্জ। শুভকে বাদ দিয়ে শাকিবকে নিয়েছি। শুভ তো তখনই ভীষণ মন খারাপ করেছে। আমি কথা বলে বুঝলাম। আমি ওকে বললাম, তোমাকে যেহেতু সাইন করেছি, তুমিই আমার হিরো। কত বড় একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং শাকিবকে মিট করিয়ে দেওয়া মানে আমি ওকে আমার ছবিতে নিচ্ছি।

আর আমার নতুন ছবির (একটি সিনেমার গল্প) শুটিং শুরুর কদিন পরের ঘটনা, একটি ছেলে এসেছে ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য। আমি বলেছি বাবা, তুমি চলে যাও আমি ইন্টারভিউ দিব না। সে বলছে জনাব আলমগীর হোসেন..। আমি বললাম কী বললা তুমি? তুমি তো আমার নামই জানো না। ইন্টারভিউ দিব না। তুমি যাও। পরে হাসান ইমাম ভাই বললেন দাও, তাই দিয়েছি। আমার নাম তো আলমগীর হোসেন না!

তাদের (অনলাইন গণমাধ্যমের) সংবাদ পরিবেশনের ভূমিকাটা কেমন হওয়া উচিত?

আলমগীর: এই যে অনলাইন পত্রিকা, ম্যাগাজিন, যাই বলো না কেন? আমি এর পক্ষেই আছি। কিন্তু সেটি ইতিবাচক হতে হবে। এবং নেতিবাচক হবে সেটার ভিত্তিটাও থাকতে হবে। আর হেডলাইনগুলো চোখে পড়েছে। সেগুলো চেঞ্জ করা উচিত। খুব ভালো থাকে না। চটকদার হয়। এটা ঠিক নয়। ৪৫ বছরের ক্যারিয়ারে তুমি বিশ্বাস করতে পারো, আমি একবার মাত্র ফটোসেশন করেছি? ঘরে বসে যদি ভালো করে ইন্টারভিউ দিয়েছি সেটা সংখ্যার দিক থেকে ১০ কিংবা ১৫টার উপরে নয়। আমি সহজে নিজেকে ওপেন করি না। যখন কেউ আমাকে জানে তখন আবার ভুলটা ভেঙে যায়। আমি আমার মধ্যে থাকতে ভালোবাসি। আমি মাটিতে হাঁটি এবং মাটিতেই হাঁটতে চাই।

আমি আরও কিছু কথা বলতে চাই, পৃথিবীর যে কোন দেশেই সবাই মিলে ইন্ডাস্ট্রি চলে। আর সাংবাদিকরা যদি বেহিসাবী হয়, তাহলে চলচ্চিত্রের ক্ষতি হয়ে যাবে। আর হচ্ছেও। যদি চলচ্চিত্রের উপকারে আসে কিংবা ভালোবেসে নিউজ করতে পারে সেটা চলচ্চিত্রের জন্য ভালো। আর নেগেটিভ চিন্তাধারা সব খানেই খারাপ। সেটা ব্যক্তিগত ব্যক্তিগত জীবন, প্রফেশন ও চ্যালেঞ্জেও খারাপ। এজন্য ফিল্মের সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন প্রত্যেককেই ইতিবাচক ভাবনার অধিকারি হতে হবে। একজন সাংবাদিক একটি ছবি দেখার পর যদি দেখেন, এটি অখাদ্য তিনি সেটির সমালোচনা লিখতে পারেন। তার অধিকার রয়েছে। আর একটি ভালো ছবি হলে তার প্রশংসা মাত্রার অতিরিক্ত করাটাও কিন্তু অন্যায় নয়।

যতটুকু জানি আপনাকে আশির দশকে সাংবাদিকরা একবার ব্যানও করেছিলেন। ঘটনাটা কী ছিল?

আলমগীর: সেটা বলছি, তার আগে আরেকটি ঘটনা বলি। ১৯৮৫ সালের ঘটনা, একজন নারী সাংবাদিক বলেছিল, আনোয়ার হোসেনকে অভিনয়ের এ বি সি ডি শিখতে হবে। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এ কোন সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন সম্পর্কে এমন একটি মন্তব্য করে বসতে পারল? আমার মনে তখনই প্রশ্ন জেগেছিল, সে কি ‘ভাত দে’ ছবিটি দেখেছিল? কী অপূর্ব অভিনয় করেছিল আনোয়ার হোসেন। আর আলমগীর ও তো এখনও পাঠশালাতেই যায় নি।

এ কথাটাও বলেছিল। আমাকে বলুক। সে সময় তো আমি তো কেউ না। আমরা যারা অভিনয়শিল্পী ছিলাম আমাদের কারও সে কথা বলার অধিকার ছিল না। ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে সমালোচনা করা যায়। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করাটা যে কতটা কঠিন, যে করে সে জানে। অভিনয়ের বিশালতা হলো আকাশের চাইতেও বেশি। একজনম তো দূরের কথা শত জনমেও খুঁজে শেষ করা যায় না।

সে সময় আমাকে একদিন এক সাংবাদিক বললেন, আপনি কী আমাদের অ্যাভোয়েড করেন? পছন্দ করেন না? আমি তখন তাকে বলেছি, তোমরা সিনে জার্নালিস্টরা নিরপেক্ষ নও। এরপর আমার বিরুদ্ধে অনেক লেখালেখিও হয়েছে। তারপর আমাকে সাংবাদিকরা ব্যান করেছে। আমার ইন্টারভিউ ছবি ছাপা হত না। তাই বলে আমি কি নিচে চলে গিয়েছি? আমি কারও সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করি নি। আমি আমার জায়গায় ঠিক ছিলাম। তখন একজন প্রযোজক ছিলেন সিদ্দিক জামান নান্টু, তিনি মারা গেছেন। সে বলে একদিন আমার বাসায় কিছু সাংবাদিক ডেকে পার্টি করে মিটমাট করে দিয়েছিল।

আরো সংবাদ...