গণমাধ্যমে ইজতেমা : কিছু তথ্য কিছু পরামর্শ

ঢাকা, ০৮ জানুয়ারী , (ডেইলি টাইমস ২৪):

সাংবাদিকদের জন্য প্রাথমিক তথ্য

এজতেমা বা ইজতেমা, যে রকম উচ্চারণ করি না কেন, এর উৎস আরবি ভাষা। বাংলায় এর অর্থ সমবেত হওয়া অথবা ‘মহাসম্মেলন’ও বলা যেতে পারে। ভারতে ১৯২০ সালে ও তৎকালীন বঙ্গদেশে ১৯৪৪ সাল থেকে তাবলিগ জামাতের কাজ শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে প্রথমবারের মতো কাকরাইল মসজিদের ভেতরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পগাড় গ্রামের কাছে একটি মাঠে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে ইজতেমায় বিদেশি কয়েকটি জামাত অংশ নেয়। এখান থেকেই এর নাম হয় ‘বিশ্ব ইজতেমা’। ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর তুরাগ নদীর পারে প্রথমবারের মতো বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকে নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা এ ইজতেমায় অংশ নিতে থাকে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে ৮৮টি দেশের এবং ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ১০২টি দেশের মুসলিম সমাজ এ ইজতেমায় অংশ নেয়।

এই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করে তাবলিগ জামাত। ‘তাবলিগ জামাত’ নামটি কোথা থেকে কিভাবে এসেছে—এ নিয়ে সামান্য বিতর্ক আছে। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ১৯২০ সালে সাহাবা আজমাইনের নকশায় নতুনভাবে ভারতের মেওয়ায় কাজটি শুরু করেন। তিনি বারবার বলেছেন, তাবলিগ জামাত নামটি আমি দিইনি। কেউ যদি আমাকে বলত, এ কাজটির একটি নাম দিন, তাহলে আমি এর নাম দিতাম ‘তাহরিকে ঈমান’—অর্থাৎ ‘ঈমানের আন্দোলন’। [সূত্র : মাওলানা সা’দ [দা.বা.]-এর বয়ান, বিশ্ব ইজতেমা,

টঙ্গী, ২০১৫]

প্রকৃতই তাবলিগ জামাত সারা বিশ্বে যে কাজটি করছে, তা একটি ঈমানের আন্দোলনই। তাঁরা মনে করছেন, মুসলিমদের তো ঈমান আছে, তবে তাঁর ঈমান এত দুর্বল যে তাঁকে তা মসজিদে আনতে পারছে না। মুসলিমরা নবী (সা.)-কে ভালোবাসে, কিন্তু তাঁর সুন্নতের ওপর চলতে পারছে না। তাবলিগ জামাত বলে, মুসলিমদের ঈমানের দাওয়াত দাও, আর অমুসলিমদের দাও ইসলামের দাওয়াত।

গণমাধ্যমের সক্রিয়তা ও সহযোগিতা এবং কিছু বিভ্রান্তি

তাবলিগ জামায়াতের কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, নিজেকে ছোট মনে করা, অন্য ভাইকে নিজের থেকে বড় মনে করা। এ কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচারবিমুখতা। সব কিছু আল্লাহকে রাজি-খুশি করতেই করা হচ্ছে। নিজেকে জাহির না করা। যিনি বয়ান করছেন, তাঁর নামের ঘোষণা আপনি কখনোই কাকরাইল গেলে বা ইজতেমায় গেলে শুনতে পাবেন না। মিডিয়ায় ইজতেমার যে প্রচার হয়, তা তাবলিগ জামাতের আয়োজিত নয়, গণমাধ্যম নিজের থেকেই এটা করে। কোনো সংবাদ সম্মেলন, পোস্টার লিখন, ব্যানার তৈরি ইজতেমা উপলক্ষে তাবলিগ জামাত থেকে করা হয় না। এর ফলে সামান্য তথ্যশূন্যতা মাঝেমধ্যে দেখা যায়। একবার এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় টঙ্গীর ইজতেমার কাছাকাছি কোনো জায়গায় আগত এক নারীর সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, এখানে মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়নি। আসলে ইজতেমাটি পুরুষদের জন্য। মেয়েদের এখানে আসার কথাই নয়। এখন ঢাকাসহ সারা দেশে হাজার হাজার বাসায় তাবলিগের বিন্যাস অনুযায়ী ফাজায়েলের কিতাব থেকে মেয়েদের জন্য সম্মিলিত তালিম হয়। তাবলিগ জামাত থেকে মা-বোনদের সেখানেই অংশ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।

অনেক সময় গণমাধ্যমে বিশাল এ ইজতেমাকে বলা হয়, মুসলিমদের হজের পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম জামাত। আসলে হজের সঙ্গে একে তুলনা করা উচিত নয়। হজ মুসলিমদের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভেব একটি। এর সঙ্গে ইজতেমার তুলনা সঠিক হবে না।

তাবলিগ জামাতের কাজের সঙ্গে জড়িত নয়, এমন রেফারেন্সে মাঝেমধ্যে অনেক কিছু প্রচার করা হয়। কিন্তু এতে বিভ্রান্তি বাড়ে। গণমাধ্যম এ ব্যাপারে সচেতন থাকলে ভালো হয়। যেমন—২০১৬ সালে ইজতেমার খবর প্রচার করতে গিয়ে একটি গণমাধ্যম টঙ্গী পৌরসভার একজন কমিশনারের বরাত দিয়ে জানায়, বিদেশি মেহমানদের জন্য আজ কী কী রান্না হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা তাঁর জানার কথা নয়, আর ইজতেমার সংবাদে এটা কোনো বিষয়ও হতে পারে না। এতে ইজতেমার ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হয়।

বর্তমান সময় ‘ইজতেমা’, ‘তাবলিগ’, ‘আখেরি মোনাজাত’ ইত্যাদি শব্দ অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে থাকে। ‘যুব তাবলিগ’ নামেও একটি সংগঠন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলোর তাবলিগ জামাতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে গণমাধ্যম সতর্ক ও সচেতন থাকলে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কল্যাণ দান করবেন।

জোড় ইজতেমা কী

বিশ্ব ইজতেমার মাস দেড়েক আগে প্রতিবছরই টঙ্গীর মাঠে তিন চিল্লার সাথিদের ‘জোড়’ অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যম একে ‘জোড় ইজতেমা’ বলে প্রচার করতে থাকে। আসলে ‘জোড়’ অর্থ হলো সমবেত হওয়া, ‘ইজতেমা’ অর্থও সমবেত হওয়া। ‘জোড়’ শুধু সারা দেশের তিন চিল্লার সাথিদের নিয়ে, আর ‘ইজতেমা’য় যে কেউ আসতে পারেন। তাই ‘জোড় ইজতেমা’ কথাটি ভুল। একটি ভুল প্রয়োগ গণমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এর বিকল্প হিসেবে ‘ইজতেমা উপলক্ষে জোড়’ ব্যবহার করা যায়।

বিশ্বজুড়ে দাওয়াতের কাজ

তাবলিগ জামাত দ্বিন প্রচারে নবীদের কাজ করতে চায় এবং করছেও। কাজটি হলো, মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছে তারা, যাতে মুসলিমরা মসজিদে আসে। যদি মুসলিম সমাজের ঈমান-আখলাক, লেনদেন ভালো হয়ে যায়, তাহলে অমুসলিমরাও ইসলাম গ্রহণ করবে। মুসলিমরাই যদি নবী (সা.)-এর আদর্শে না উঠতে পারে, তাহলে অমুসলিমরা কখনোই ইসলামের দিকে আসবে না। এ বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ সারা দুনিয়ায় এখন ছড়িয়ে পড়েছে। আপনি সমুদ্রের পাড়ে যাবেন, দেখবেন, সেখানে দাওয়াতের কাজ চলছে। আপনি আফ্রিকার জঙ্গলে যান, দেখবেন, বনমানুষদের মধ্যেও এ কাজ শুরু হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের কর্মীরা সারা বিশ্বে রাষ্ট্রদূতের মতো এ পরিচিতি তুলে ধরছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের সাদাসিধা জীবন, তাদের খাওয়াদাওয়া, আচার-ব্যবহার, বিদেশ থেকে আগত মেহমানদের সততই আকৃষ্ট করছে।

বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষ দ্বিন প্রচার ও দ্বিন শেখার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। বিদেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষ দ্বিন প্রচার ও দ্বিন শেখার জন্য বাংলাদেশে আসছে। এর একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবও বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে এর বিশেষ প্রভাবটি প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ সরকার পর্যটনশিল্পকে আরো উন্নত করতে হাজার হাজার ডলার খরচ করে থাকে। কিন্তু গোটা বিশ্ব থেকে মানুষ ইজতেমা ও ইজতেমার বাইরে সারা বছরই বাংলাদেশে এসে থাকে। এ জন্য কিন্তু আমাদের সরকারকে কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না।

চার ভাগে ইজতেমা

২০১৬ সাল থেকে ইজতেমায় বাংলাদেশকে চার ভাগ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে জানুয়ারির ৮-১০ পর্যন্ত ১৬ জেলা ও ১৫-১৭ পর্যন্ত ১৬ জেলা ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে। বাকি ৩২ জেলা ২০১৭ সালে ১৩-১৫ জানুয়ারি ও ২০-২২ জানুয়ারি দুই ভাগে আগের মতো আসবে। যারা ২০১৬ সালে ইজতেমায় এসেছিল, তারা ২০১৭ সালে আসতে পারবে না। বর্তমানে ইজতেমা এতই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগে আমাদের দেশে আসার জন্য কজনই বা ভিসার আবেদন করত। এখন বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোতে বাংলাদেশে আসার জন্য বিদেশিরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। সারা বছরই বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এ কাজে কর্মচঞ্চল রয়েছে।

ছয় ছিফত ও পাঁচ কাজ

তাবলিগ জামাত ছয়টি গুণ অর্জনের কথা বলে। গণমাধ্যমকর্মীদের এ বিষয়ে ধারণা থাকা উচিত। এ গুণের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ঈমান। ঈমান মানুষের জন্য ফরজ, তাই ঈমানের মেহনতও ফরজ। ঈমানের দাওয়াতের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, এ দুনিয়ায় আমরা যা কিছু দেখি বা না দেখি, আল্লাহ ছাড়া সবই মাখলুক (সৃষ্ট বস্তু), মাখলুক কিছুই করতে পারে না আল্লাহর সাহায্য ছাড়া, আল্লাহ সব কিছু করতে পারেন মাখলুক (সৃষ্ট বস্তুর সাহায্য) ছাড়া। দ্বিতীয়ত, জোর দেওয়া হয় নামাজের ওপর। কারণ হাশরের ময়দানে প্রথম নামাজেরই হিসাব নেওয়া হবে। নবী (সা.) যেভাবে নামাজ পড়েছেন এবং তাঁর সাহাবা (রা.)-দের যেভাবে নামাজ পড়া শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবে নামাজ পড়ার এক যোগ্যতা অর্জন করাই মানবজাতির আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, ইলম ও জিকির। ইলম হলো আল্লাহ পাকের হুকুম জেনে নবী (সা.)-এর তরিকা অনুযায়ী চলা। আর জিকির হলো, সর্বাবস্থায় দিলের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ধ্যান ও খেয়াল পয়দা করা। চতুর্থত, একরামুল মুসলেমিন। সমাজে মানুষের মর্যাদা অনুযায়ী তার সঙ্গে ব্যবহার করার কথা। বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ এবং আলেমদের সম্মান করা মূল উদ্দেশ্য। পঞ্চমত, নিয়ত বিশুদ্ধ করা। যে কাজই মানুষ করে না কেন, তা যেন আল্লাহ তাআলার রাজি-খুশির জন্যই হয়। ষষ্ঠত, দাওয়াত ও তাবলিগ। এখানে কিছু সময় মেহনত করে মানুষ জান, মাল ও সময়ের সঠিক ব্যবহার শিখবে।

তবে তাবলিগ জামাতকর্মীদের জন্য পাঁচটি কাজ নিয়মিত করণীয় হিসেবে ফয়সালা রয়েছে। প্রতিদিন তিনটি কাজ করবে—এক. আড়াই ঘণ্টা মেহনত করবে। দুই. প্রতিদিন পরামর্শসভায় বসবে। তিন. প্রতিদিন কোরআন-হাদিস থেকে তালিমে অংশ নেবে। এর মধ্যে একটি হবে নিজের মহল্লার মসজিদে, অন্যটি নিজ বাসায় পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে। চার. সপ্তাহে দুটি গাস্তের (দাওয়াত) কাজ করবে। একটি নিজের মহল্লায়, অন্যটি পার্শ্ববর্তী মহল্লায় গিয়ে। পাঁচ. প্রতি মাসে তিন দিন আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগানো।

তাবলিগ জামাতে চার মাস (তিন চিল্লা) একটানা সময় লাগিয়ে এ কাজটি বোঝার জন্য তাগিদ রয়েছে ওলামা-হজরতদের। এরপর প্রতিবছর ৪০ দিন (্এক চিল্লা) লাগিয়ে সে নিজেকে সক্রিয় রাখবে। দ্বিনের ওপর চলা সহজ নয়। এ ছিফতগুলো মেহনত করে আমল করে চলতে পারলে দ্বিনের ওপর চলা সহজ হয়।

উপসংহার

বিশ্বব্যাপী এ একই পদ্ধতিতে তাবলিগ জামাতের কাজ চলছে। পূর্বে আমিরপ্রথা ছিল,  সেটি এখন নেই। পরে শুরাপ্রথার (কমিটি) মাধ্যমে কাজটি হতো। এখন তা-ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন তাবলিগ জামাতের কাজ চলে পরামর্শসভার মাধ্যমে। প্রতিদিনই পরামর্শ (মাশোয়ারা) হয় এবং সেখানেই বিভিন্ন কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফয়সালা হয়। কাজেই কাউকে ‘তাবলিগের আমির’ হিসেবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই।

আখেরাতের জীবন অনন্তকালের, তার দিকেই মানুষের দৃষ্টি বেশি থাকা উচিত। দুনিয়ার জীবন তো কোনো না কোনোভাবে কেটেই যাবে। তাবলিগ জামাত মানুষের মাঝে এ বোধটি তৈরি করতে সাহায্য করছে। মানুষের পরিবর্তনে সমাজেরও পরিবর্তন হচ্ছে, আরো হবে। বিশ্বব্যাপী ঈমানি আন্দোলন এভাবেই এগিয়ে যাবে। কিয়ামত পর্যন্ত তা চলতে থাকবে।

লেখক : বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক