একজন ইউএনও এবং ‘স্যার সিনড্রম’

ঢাকা, ১৩ জানুয়ারী , (ডেইলি টাইমস ২৪):

কিছু মানুষের লেখায় আমি বিমোহিত হই। এমন কয়েকজনের মধ্যে প্রবাসে থাকা খ্যাত সাংবাদিক ও লেখক মাসকাওয়াথ আহসান একজন। এমনজনদের লেখা চিন্তার দাবি রাখে। তাদের কারও কারও সাথে আমার কথা হয়, লেখা চালাচালি চলে। তাদের চিন্তা অনুধাবনের চেষ্টা করি, হয়তো তারাও করেন। কোনো ক্ষেত্রে চিন্তার মিল হয়, কোনো ক্ষেত্রে অমিল। যারা চিন্তা করেন তাদের জন্য এটাই স্বাভাবিক। গত দুদিনে আমাদের চিন্তার বিষয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রম’। আমি প্রায়শই দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রম’ নিয়ে কথা বলি, লিখি। একইভাবে এবং আমার থেকে আরও ভালো লিখেন মাসকাওয়াথ আহসান। তবে আশার কথা ‘স্যার সিনড্রম’ নিয়ে আমাদের সবার মধ্যে অমিলের চেয়ে মিলই বেশি।

‘স্যার সিনড্রমে’র কথার পুনরাবৃত্তির কারণ হলেন পাবনা জেলার একজন ইউএনও, বাংলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেই ইউএনও নাকি একজন সাংবাদিককে বলেছেন, ‘আপনি জানেন না একজন ইউএনওকে স্যার বা ম্যাডাম বলতে হয়’। ‘স্যার’ ডাক শোনার এমন আকুলতাই হলো দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রম’। একজন চাকুরের নিজেকে প্রভু ভাবার এই উপসর্গ নিরসনে মাসকাওয়াথ আহসান লিখলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি পৃথক মনোসমীক্ষণ পরীক্ষার প্রচলন করলে, একজন প্রার্থী জনসেবার জন্য প্রস্তুত কিনা তা নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।’

একজন ইউএনও’র কাজ কী, মানুষের জন্য ‘শ্রম’ দেওয়া। আমি এখানে ‘সেবা’ বলিনি। ‘সেবা’ হলো স্বেচ্ছাশ্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট, ‘শ্রম’ যুক্ত পারিশ্রমিকের সাথে। মাসকাওয়াথ আহসানের সেই লেখার পুরোটার সাথে আমি একমত শুধু এই ‘সেবা’ শব্দটি ছাড়া। একজন ইউএনও’র কাছ থেকে আমরা নিজ গাটের টাকা দিয়ে শ্রম কিনি। উনার কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নিই না। কিন্তু ‘বিসিএস’ নামক পরীক্ষা দিয়ে যারা প্রশাসনে যান বিপদটা তাদের মনোসমীক্ষণের ক্ষেত্রে। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ার পর তাদের অনেকেই নিজেকে ‘লর্ড’ ভাবতে থাকেন, অর্থাৎ ‘স্যার সিনড্রমে’ আক্রান্ত হন। আক্রান্তরা ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ডাকটির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন; সাথে ভুলে যান তারা স্রেফ পেশাজীবী, নীতি-নির্ধারক নন, নীতি নির্ধারণের কাজ অন্যদের।

অবশ্য গড়পরতা সবাই যে ‘স্যার সিনড্রমে’ আক্রান্ত এটা কিন্তু নয়। সিনড্রমের বিপরীত চিত্রও রয়েছে। প্রশাসনে অনেক চমৎকার মানুষ আছেন নিবেদিত মানুষের প্রয়োজনে শ্রম দেওয়ার জন্য। একজন সচিবকে জানি, যিনি নিতান্তই একজন ‘স্যার সিনড্রম’হীন মানুষ। সহজ সরল তার জীবনযাপন, ততোধিক সহজসরল এবং চূড়ান্ত মেধাবী মানুষ তিনি। অনেকদিন তার সাথে দেখা নেই, কথা হয়নি। জানি না এর মধ্যে তিনি বদলে গেলেন কি না। কিন্তু যতদূর তাকে বুঝেছি, এ মানুষ বদলে যাবার নয়। নিরাভরণ সৌন্দর্য যেমন প্রকৃত সৌন্দর্য, তেমনই নিরহংকার মানুষই সত্যিকার ‘মানুষ’। এরকম উদাহরণ অনেক আছে, রয়েছে বদলে যাওয়ার উদাহরণও। যেমন যারা ‘স্যার সিনড্রমে’ আক্রান্ত হন তারা বদলে যান, ভুলে যান তাদের শেকড়ের কথা।

একসময় ছিল পাবলিক সার্ভেন্ট, এখন বলা হয় গভর্মেন্ট সার্ভেন্ট, সরকারি চাকুরে। পাবলিক বদলে যখন গভর্মেন্ট বলা হয়েছে তখন এই সার্ভিসে ঢুকে পড়েছে ‘লর্ড’ ভাবার প্রবণতা, আক্রান্ত করেছে ‘স্যার সিনড্রমে’।

দুই

এতক্ষণ সরকারি চাকুরেদের কথা বললাম। এখন আত্মসমালোচনা করি। “কর্তা বলেন ‘ইয়ের ভাই’, আনন্দের আর সীমা নাই”, সাংবাদিকদের মধ্যেও অনেকে আছেন, আছেন লেখক-বুদ্ধিজীবীসহ অনেকের মধ্যেই এমন ‘ইয়ের ভাই’। যারা নিজের অবস্থান, যোগ্যতা, মেধা-মননকে না বোঝে ‘খোঁচানি’র অস্ত্র পেয়েই নিজেকে ‘ব্রহ্মাজ্ঞান’ করতে শুরু করেন।

হুমায়ুন আহমেদ তার স্যাটায়ার ঘরানার এক গল্পে বলেছিলেন এমন সাংবাদিকদের কথা। গল্পটার নাম মনে নেই, হুবহু বর্ণনাও বিস্মৃত। তবে কাহিনী চিত্র অনেকটা এরকম, ‘মন্ত্রীর ত্রাণকার্যক্রম কভার করার জন্য সাংবাদিকরা এসেছেন, একজন গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ঘন ঘন সিগারেটে টান দিচ্ছে। তার ভাবটা অনেকটা ডোন্টকেয়ার ধরনের। সবার সামনেই সিগারেটের গমগমে ধোঁয়া ছাড়ছেন।’

এই যে কাউকে না মানার যে ‘সিনড্রম’ এর নাম কী হতে পারে? এটার নামকরণও জরুরি। এদের জন্য অন্যদের নামও কলঙ্কিত হচ্ছে। যেমন হচ্ছে প্রশাসনে ‘স্যার সিনড্রমে’ আক্রান্তদের জন্য সেই সচিব সাহেবদের মতো ভালো মানুষদের।