নেতাই এতিমের টাকা মেরে খেলে সাঙ্গ-পাঙ্গরা কী খেতে পারে

0
15

ঢাকা , ২২ ফেব্রুয়ারী , (ডেইলি টাইমস ২৪):

সারাদেশে স্থানীয় সরকারে থাকা জনপ্রতিনিধিদের মাঝে যারা বিএনপির নেতা, তাদের টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও উন্নয়ন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, যত টাকাই দেই না কেনো এরা উন্নয়ন করতে পারে না। কারণ এদের মন থাকে লুটপাটের দিকে। এদের মাথায় পচন। এদের নেতাই যদি এতিমের টাকা মেরে খায়, তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা কী খেতে পারে? আপনারাই বিচার করে দেখেন। আপনারাই ভেবে দেখেন।

বৃহস্পতিবার রাজশাহী সরকারি মাদরাসা মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা আপনাদের মার্কা, নৌকা জনগণের মার্কা। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে এদেশের মানুষ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকতে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের যে সংবিধান হয়েছিল সেখানে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। শহীদ মিনার নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘে স্বীকৃতি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ এই দেশের স্বাধীনতা এনেছে। এই দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল বলেই স্বাধীনতা পেয়েছে। স্বাধীনতা পেয়েছে বলেই আজকে উন্নয়ন হচ্ছে।

তিনি বলেন, পচাত্তরের পনেরই আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। আমার মাকে হত্যা করা হলো। আমার মায়ের কী দোষ ছিল আমি জানি না। আমার ভাই কামাল, জামাল, ছোট রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিল। আমার একমাত্র চাচাকে হত্যা করেছে। একই দিনে আমার মেজো ফুপু, ছোট ফুপুর বাড়িতে তারা আক্রমণ করে আমার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। পিতা, মাতা, ভাই হারিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে এসেছি। সব বেদনা, দুঃখ-কষ্ট বুকে নিয়েও সারা বাংলাদেশ ঘুরেছি। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই, আমরা এখানে দিতে এসেছি। জনগণের কল্যাণে কাজ করতে এসেছি।

বিপদে রক্ষা করেছে নূহ নবীর নৌকা, আর এই নৌকা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সেই নূহ নবীর আমল থেকে বিপদে রক্ষা করেছে নূহ নবীর নৌকা। আর এই নৌকা স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, এই নৌকা উন্নয়ন দিয়েছে। আপনাদের কাছে আমি আবেদন জানাই, আগামীতে নির্বাচন। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ডিসেম্বরে সেই নির্বাচনে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মার্কা দিয়ে নির্বাচন হবে। মার্কাটা কী? মার্কাটা হচ্ছে নৌকা। সেই নৌকা মার্কায় আমি আপনাদের কাছে ভোট চাই। যেভাবে উন্নয়ন করে যাচ্ছি, সেই উন্নয়ন যেন অব্যাহত থাকে। মানুষ যেন খেয়ে-পরে সুখে থাকে, শান্তিতে থাকে তার জন্য আমি আপনাদের কাছে আবেদন করি, আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন। আপনাদের কাছে আমি ওয়াদা চাই। আপনারা হাত তুলে ওয়াদা করেন নৌকা মার্কায় আপনারা ভোট দেবেন।

আপনাদের জন্য উপহার নিয়ে এসেছি

বক্তব্যের শুরুতে রাজশাহীবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের জন্য কিছু উপহার নিয়ে এসেছি। ইতোমধ্যে আমরা কিছু প্রকল্প উদ্বোধন করেছি আর কিছু নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। আমরা উপহার নিয়ে আসি। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ছিল। তারা কী দিয়েছিল?’

বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের সময় রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘঠিত বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার চিত্র তুলে ধরনে প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনাদের দিয়েছিল শুধু লাশ উপহার। সৃষ্টি করেছিল বিধবা ও পিতাহারা সন্তান। শিবির-ক্যাডাররা হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করেছিল। এই বাংলাভাইয়ের হাতে আব্দুল কাইয়ুম বাদশাকে মেরে গাছের সঙ্গে উল্টো ঝুলিয়ে রেখেছিল। বিএনপি-জামায়াত আমলে এই এলাকা ছিল সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদ, বাংলাভাইদের অভয়ারণ্য। এখানে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারত না, নিরাপদে চলতে পারত না। এই রকম একটি অবস্থা তারা সৃষ্টি করেছিল সারাদেশব্যাপী। উন্নয়ন পায়নি মানুষ, পেয়েছে বোমাবাজি। মানুষের মনে ছিল আতঙ্ক।

শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা জানেন, আন্দোলনের নামে ওই খালেদা জিয়ার হুকুমে পেট্রলবোমা মেরে চলন্ত বাসে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৫০০ মানুষ হত্যা হয়েছে। তিন হাজারের মতো মানুষ আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। রেললাইন ধ্বংস করে দিয়েছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগ এসে আবার রেললাইন করেছে।

তিনি বলেন, ৭০টি সরকারি অফিস, ছয়টি ভূমি অফিস পুড়িয়েছে। তারা বিদ্যুৎ দিতে পারে না, বিদ্যুৎতের টাকা লুটপাট করে চুরি করে খেয়েছে। আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছি, এই চাপাইনবাবগঞ্জের কানসার্টে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। কর্মরত ইঞ্জিনিয়ারকে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। এটাই বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন। মানুষকে খুন করা-এটাই তাদের কাজ।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘এই বিএনপি মানুষের কল্যাণ করতে পারে না, লুটপাট করে খেতে পারে। আপনারা জানেন, আজকে বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছেন। কেন গ্রেফতার হয়েছেন? এতিমের টাকা। সেই ৯১ সালে এতিমখানা তৈরি করবে বলে বিদেশ থেকে টাকা এনেছে। আমার এখানে প্রশ্ন, এতিমখানার ঠিকানা কোথায়? সেই ঠিকানা দিতে পারে নাই। সেখানে কয়জন এতিম আছে? তার কোনো সংখ্যা নাই? এতিমরা কি একটা টাকাও পেয়েছে এ পর্যন্ত? পায় নাই। তারা (বিএনপি) বলে, এতিমের টাকা তো সুদে-আসলে বেড়েছে। সুদের টাকা খেয়েছে কে? এতিমের টাকা সুদে-আসলে বেড়েছে আর তা ভোগ করেছেন খালেদা জিয়া, তার পরিবার আর তার দলের লোকজন। এতিমের তো কোনো ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি, তাদের তো দেয়নি। তাদের বঞ্চিত করেছে।

তিনি বলেন, আজকে মামলা দিয়েছে কে? মামলা দিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই মামলায় আজকে তার সাজা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন। লুট করা, চুরি করা এটাই তাদের চরিত্র। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমেরিকার ফেডারেল কোর্ট, তার (খালেদা জিয়া) ছেলে যে টাকা চুরি করেছে, ঘুষ খেয়েছে সেই কথা তারাই বলেছে। সিঙ্গাপুরের কোর্ট, সেই একই কথা। তার আরেক ছেলের দুর্নীতির কথা। এই দেশের টাকা জনগণের কাজে লাগে নাই। বিদেশে পাচার করেছে, সেই পাচার করা টাকা আমরা ফেরত এনেছি।

এতিমের টাকা চুরি করে খাওয়া কোরআন শরিফেও নিষেধ আছে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বিএনপির নেতারা আন্দোলন করে। কীসের আন্দোলন? টাকা চুরি করে তাদের নেত্রী জেলে গেছে। আন্দোলন চোরের জন্য। এতিমের টাকা চুরি করে খাওয়া আমাদের কোরআন শরিফেও নিষেধ করা আছে। ২৭ বছরেও এতিমের ভাগ এতিমকে দিতে পারে নাই। সেই টাকা তার নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। আর তারই শাস্তি আজকে তিনি (খালেদা) ভোগ করছেন।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কাজ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটা ট্রাস্ট ফান্ড করি। প্রায় ১৮শ’ শিক্ষার্থী এবং একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত এবং আওয়ামী লীগের দুস্থ নেতাকর্মীদের আমরা এ ফান্ড থেকে সাহায্য দিয়ে থাকি। ওই কেয়ারটেকার সরকার তন্নতন্ন করে খুঁজেছে, কোনো অনিয়ম পায় কি না, আমাকে কোনোভাবে মামলায় ফাঁসাতে পারে কি না। এতটুকু অনিয়ম তারা সেখানে পায় নাই। আমি বলেছিলাম, ভালোভাবে তদন্ত করে দেখেন। আমরা জনগণের জন্য কাজ করতে আসি, জনগণের সম্পদ কেড়ে খেতে না।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের সম্পদ, আমরা দুই বোন বাবা হারিয়েছি। মা হারিয়েছি। ভাই হারিয়েছি, সব হারিয়েছি। পৈত্রিক সূত্রে যে বাড়ি পেয়েছি জনগণকে দান করে দিয়েছি। যে অর্থ পেয়েছি ট্রাস্ট করে এদেশের ছেলে-মেয়েদের আমরা শিক্ষার জন্য বৃত্তি দিচ্ছি। আমরা তো এতিমের টাকা মেরে খাইনি বরং আমরা মানুষকে দিয়েছি। আমরা দেশের জনগণকে দিতে আসি, মানুষের জন্য কাজ করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষকে পুড়িয়ে যারা হত্যা করতে পারে, তারা দেশের জন্য কি কল্যাণ করতে পারে? আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করি। সেখানে তারা মানুষের সম্পদ লুটে খায়। তারা বিদ্যুৎ দিতে পারে নাই, দিয়েছিল কী? খাম্বা। খালেদা জিয়ার ছেলে খাম্বার ব্যবসা করত, সবাইকে খাম্বা কিনে দিয়েছে। রাস্তার পাশে শুধু খাম্বা শুয়ে আছে, বিদ্যুৎ নাই।

বিএনপির কাজটা কী? লুটে খাওয়া

তিনি বলেন, বিএনপির কাজটা কী? লুটে খাওয়া। কেউ যদি এতিমের টাকার লোভ সামলাতে না পারে তো সে দেশের মানুষকে দেবেটা কী? তাদের ছিলটা কী? ৮১ সালে যখন জিয়া মারা গেল তখন বলল জিয়া পরিবারের কিছু নাই। আছে ভাঙা স্যুটকেস আর ছেড়া গেঞ্জি। আজকে শতশত কোটি টাকার মালিক। এখন অনেক টাকা বিদেশেও মানিলন্ডারিং করে, বিদেশেও পাচার করে। কোকো-১, কোকো-২ করে কোকো ৬ পর্যন্ত লঞ্চ। ড্যান্ডি ডাইয়িং ইন্ড্রাস্ট্রি আরও কতকিছু তারা করেছে। ব্যাংক থেকে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পর্যন্ত শোধ দেয় নাই।

‘আজান হচ্ছে, আজানের পরেই বক্তব্য শুরু করছি’

বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী একবার জিজ্ঞেস করেন, ‘আজান দিচ্ছে?’ তখন প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকা নেতাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আবারও বক্তব্য শুরু করেন। পরে নিজেই যখন আজান শুনতে পান তখন বলেন, ‘আজান হচ্ছে, আমি আজানের পরেই বক্তব্য শুরু করছি।’

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভা পরিচালনা করেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। জনসভায় আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মো. আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য প্রমুখ।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাকে কেন্দ্র করে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় রাজশাহী। পদ্মা পাড়ের জনসভাস্থলকে ঘিরে মিছিল আর স্লোগানের ঢেউ ওঠে পুরো এলাকায়। প্রবেশদ্বারগুলোসহ শহরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় শতশত তোরণ। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে রাজশাহীতে স্বাগত জানানো হয় বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে।

প্রধানমন্ত্রীর জনসভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই রাজশাহীর আট জেলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা জনসভায় আসতে শুরু করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শহরে আসেন তারা। এসময় ঢাক-ঢোল ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উল্লসিত নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। বুকে শেখ হাসিনা, পিঠে নৌকা খঁচিত হলুদ রঙের টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে ফাগুনের বাতাসের মতোই জনমানুষের ঢেউয়ের মিলনমেলায় পরিণত হয় পদ্মার তীর। দুপুরের আগে জনসমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সমাবেশ শুরু হওয়ার পরে জনতার ঢল জনসভার মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত হয়। রাজশাহী শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পদ্মা পাড়ও প্লাবিত হয় মানুষের ঢেউয়ে।