সাক্ষাৎকার

অনেকেই ভালোবেসে আমাকে বিয়ে-শাদি দিয়ে ফেলছে

ঢাকা , ০৩ মার্চ , (ডেইলি টাইমস ২৪):

ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা পপি বর্তমানে ব্যস্ত রয়েছেন ‘সাহসী যোদ্ধা’ নামের চলচ্চিত্র নিয়ে। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এ নায়িকা জানিয়েছেন, দর্শক যত দিন চাইবে অভিনয় দিয়েই তত দিন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকতে চান তিনি।

২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকালে এফডিসিতে শুটিংয়ের ফাঁকে অভিনয়, ক্যারিয়ার ও ইন্ডাস্ট্রির নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন…

আপনার সময়কার অনেক শিল্পীই এখন আর নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করেন না। কিন্তু আপনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। কাজের অনুপ্রেরণা পান কোথা থেকে?

পপি: আমার এ অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকেই, যখন যে কাজটা করি মনোযোগ দিয়েই করি। সে কাজটি নিয়েই ব্যস্ত থাকি, শতভাগ নিজেকে সে কাজের মধ্যে রাখি। যখন পড়াশোনা করেছি তখন আমার জীবনে পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় প্রাধান্য পায়নি। হয়তো আমি ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল ছিলাম না।

আর আমি যত দিন স্ক্রিনে থাকব, বিদায় না নিব, দর্শক যত দিন আমাকে চাইবে আমি তত দিন ওভাবেই কাজ করতে চাই। আমার কাছে মনে হয়, আমি যা কাজ করেছি, তার থেকেও ভালো কাজ করা উচিত। আমার কাছে মনে হয় আমি আমার সেরা কাজটা এখনো করতে পারিনি। অনেক ছবিতে অভিনয় করেছি। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি আরেকটু ওয়েট করলে আরো ভালো কাজ করতে পারব। ওই জায়গা থেকেই এখনও আমার মধ্যে কাজের আগ্রহ বোধটা রয়েছে।

যদি একটু পিছন ফিরে যাই, গত কয়েক বছরের আপনার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, অভিনয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের গ্যাপ রয়েছে। এটি আপনার অভিনয়ের ক্যারিয়ারে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলছে?

পপি: না, তেমন নয়। আমি তো ভালো কাজের জন্য অপেক্ষা করছি। যার কারণে শিল্পী হিসেবে নিজের মতো করে নিজেকে গড়ার একটি বিষয় থাকে। আর দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতাও একটা বিষয়। শুটিংয়ের আগে তো এক ধরনের প্রস্তুতি নিই। ক্যারেকটারটা কেমন হবে, এর সঙ্গে কসটিউম কিংবা আমার চরিত্রটির চাল-চলন কেমন হবে সেটা নিজের ভেতরে লালন করার চেষ্টা করি। আমার দিক থেকে কাজের ক্ষেত্রে কখনো সিনসিয়ারিটির অভাব থাকে না।

কখনো কী এমন হয়েছে, কোনো একটি সিনেমার কাজ করতে গিয়ে নানান তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে একটা সময় মনে হয়েছে, আর সিনেমায় অভিনয়ই করব না?

পপি: না, তেমন কোনো ঘটনা নাই। কিন্তু আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ‘কুলি’ ছবির শুটিং করতে করতেই আরও ১৫-১৬টা ছবির শুটিং শুরু হয়ে যায়। ওই সময়ের মধ্যে ‘আমার ঘর আমার বেহেস্ত’ নামে আরেকটি ছবি প্রস্তুত হয়ে যায়। এরই মধ্যে শহিদুল ইসলাম খোকন তার ‘চারিদিকে শত্রু’ ছবির কাজ শেষ করেছেন। তখন মোটামুটি তিনটি ছবি প্রস্তুত। সে সময় এই তিনটি প্রোডাকশন হাউজের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গেল, কে আগে সিনেমা মুক্তি দিবে। আর তিনটি সিনেমার গল্প তো তিন ধরনের।

আর প্রথম ছবি যে কোনো একজন শিল্পীর জন্য বিশাল ব্যাপার। আর শুরুতেই অনেক ছবি করে ফেলছি, সেদিক থেকে আমি ভাগ্যবান ছিলাম। প্রথম ছবি খারাপ হলো মানে ইন্ডাস্ট্রি থেকে আউট। এরপর আর তাকে নিয়ে কেউ ঝুঁকি নিতে চাইবে না। এরপর তিনটি হাউজের মধ্যে এক ধরনের গণ্ডগোল হয়। কেউ বলে কুলি, কেউ বলে…।

এরপর একটা সময় গিয়ে আমিও দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সবকিছু মিলিয়ে সিদ্বান্ত হলো কুলিটাই আগে মুক্তি পাবে এবং এই ছবি নিয়ে রীতিমতো বোর্ড মিটিং, ইন্ডাস্ট্রির সকল পরিচালক থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রির সকল মাথা এক সঙ্গে বসেছিল। ওই সময়টা নিয়ে খুব আনন্দ লাগছিল, শুধু আমাকে নিয়ে এত আয়োজন! এরপর ‘কুলি’ রিলিজ হওয়ার পর যা হয়েছে তা তো আর বলার দরকার নেই।

আমাদের দেশের বেশিরভাগ অভিনয়শিল্পীরা খুব একটা ফিটনেস সচেতন নন, সেদিক থেকে আপনি তো বহুদিন ধরেই কাজ করছেন। ফিগার ও ফিটনেস কীভাবে মেনটেইন করছেন?

পপি: কাজ ও গল্প অনুযায়ী আমি ফিটনেস মেনটেইন করি। আজ থেকে মাসখানেক আগে যারা আমাকে দেখেছে তারা বলতে পারবে, আমি ঠিক কেমন ছিলাম। বর্তমানে আমি যে ছবিটির কাজ করছি, তার জন্য ওয়েট লুস করেছি। এটা তো শুধু একটা সিনেমার কথা বললাম। আমি যে কোনো কাজ শুরুর আগে কিছুটা সময় নিই। কারণ আমি সে কাজটির চিত্রনাট্য পাওয়ার পর আমি সে নির্মাতার সঙ্গে বসি। এরপর নিজেকে কীভাবে প্রেজেন্ট করলে বেটার লাগবে, সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করি।

আমি আরেকটা বিষয় একটু যোগ করতে চাই, আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিককার কথা। আমি খেয়াল করলাম, যখন শাবনূরের দিকে ক্যামেরা ওপেন হতো তার চেহারাটায় ক্লোজআপাটা ধরত, মৌসুমী আপু ও পূর্ণিমা আপুর ক্ষেত্রেও একই, কিন্তু পপি মানেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত। কারণ একটাই—শুধু আমার ফিগারের কারণেই। তখন আমাকে ইউজ এবং অ্যাবইউজ দুটোই করা হয়েছে। ক্যামেরাটা চেহারায় ধরলে অভিনয়ের সুযোগটা থাকে।

কিন্তু সেখানে পা থেকে ধরলে, ফিগার এক্সপোজ করলে অভিনয়ের সুযোগ থাকে না। এটা আমার জন্য ব্যাড লাকও ছিল। একটা সময় গিয়ে আমি ভীষণ বোরও হলাম। আমাকে সবাই নায়িকা হিসেবেই তুলে ধরছে, অভিনেত্রী হিসেবে নয়। এরপর আমি একটা সময় গিয়ে রাগের চোটে ইচ্ছেমতো খাওয়া-দাওয়া করতাম। অ্যাটলিস্ট মোটা থাকলে পা থেকে তো আর ক্যামেরা ওপেন হবে না। অনেক বড় বড় ডিরেক্টর কিংবা মেকার তারাও এমন করেছে! আর এখন তো অনেক কিছুই পাল্টে গেছে!

যেমন…

পপি: আগে সবাই ফ্যামিলির মতো কাজ করেছি। এখন যে যার মতো। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। খাবারের ব্রেক দিলেও একসাথে খাবার খেতে হতো। এখন তো সবাই ইন্ডাস্ট্রিতে বাড়ি, গাড়ি নিয়েই ঢোকে! আমি আমার রেমুনারেশনের টাকা দিয়ে বহু পরেই গাড়ি কিনছি। আমার বাবার আছে সেটা আলাদা বিষয়। কিন্তু আমি ফিল্মের টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছি বহু পরে।

বর্তমান সময়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বাণিজিক্য ছবির নায়িকাদের ওপর এখন প্রযোজকদের আস্থা কম। কারণ কী বলে মনে করেন?

পপি: আমার কাছে মনে হয়, আগে যারা ডিরেকশন দিয়েছিলেন কিংবা যে সব প্রোডাকশন হাউজ ছিল, তাদের নিজেদের ওপর এক ধরনের আস্থা ছিল। ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা ছিল। অন্যের ওপর নির্ভর করত না। আগে আমজাদ হোসেন ছবি বানাতেন। সে সময় তিনি নিজেই স্টার। তিনি স্টার তৈরি করতে পারতেন। তিনি যখন নির্মাণ করলেন ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, তখন হিট করার কারণে মেকিংয়ের জায়গাটাতে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেলেন। তারা অন্যের ওপর নির্ভর করতেন না। ওই মানের মেকার তো এখন আর নেই। যার কারণে এখন ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারার ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এখন তো সিনেমার গল্পে খুব একটা ভিন্নতা দেখা যায় না।

ক্যারিয়ারে আপনি এখন যে অবস্থানে আছেন, সামনে যে কাজগুলো আসবে সেগুলো নিয়ে কতটা কনফিডেন্ট আপনি?

পপি: কোন কাজটা ভালো হবে সেটা তো আগেই বলা যায় না। বাকিটা তো ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। প্রোডাকশন, মেকার, মেকিংয়ের ওপর নির্ভর করে, সঙ্গে পাবলিসিটিও। কিন্তু আমার ব্যাড লাক যে ওই মানের ছবি এখন হচ্ছে না। আমার মনে হয় এখন সময় আরও ভালো কাজ হওয়ার। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকলে আমার কাজের সংখ্যাটা বাড়ত। মানেরও পরিবর্তন হতো। কিন্তু হায়!

‘সাহসী যোদ্ধা’ নামে একটি সিনেমার শুটিং করছেন, কেমন হচ্ছে?

পপি: গল্পটা অনেক সুন্দর। দর্শক গত কয়েক বছরে হয়তো একই টাইপের গল্প দেখতে দেখতে বিরক্ত। নেই জায়গা থেকে ভিন্ন একটা গল্প দর্শক এ ছবিতে দেখতে পাবে। আমি আমার সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করব এ ছবিতে। বাকিটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আশা করি ভালো হবে। ছবিতে আমি একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় অভিনয় করছি। আমিন খান এ ছবিতে আমার সহশিল্পী।

শিল্পী সমিতির নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেছেন। ভবিষ্যতে কী রাজনীতির মঞ্চে আপনাকে দেখা যাবে?

পপি: আমার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ডে রাজনীতি রয়েছে। কিন্তু স্বভাবগতভাবে আমি খুব ঠান্ডা টাইপের। আমি নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করি। কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। জনসেবা সেটা নীরবেই করা যায়। মিছিল-মিটিং করে ভাষণ দিয়ে করতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। রাজনীতি করা মানে লাইফে বড় একটা হ্যাসেল নেওয়া, টেনশন নেওয়া। আমি ওগুলা চাই না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নামের সঙ্গে অভিনেত্রী শব্দটা জড়িয়ে থাকলেই খুশি। রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে নেই।

একটা বিষয় নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে গুঞ্জন চলছে, আলোচিত একজন নায়কের সঙ্গে পপির প্রেম চলছে?

পপি: কার সঙ্গে প্রেম চলে আমার, শুনি আগে। সত্যি যদি হইত তাহলে আমাকে আর বলা লাগত না। আবার কেউ কেউ আমাকে এত বেশি ভালোবাসে যে, তারা অনেকেই আমাকে বিয়ে-শাদি সবই দিয়ে ফেলছে! ভালো তো, তারা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। এগুলো তো স্টারিজমেরই অংশ।

আপনার সম-সাময়িক শিল্পীরা তো পারিবারিক বন্ধনে জড়িয়েছেন বহু আগেই, কিন্তু আপনি?

পপি: প্রথম কথা হচ্ছে সংসার করার জন্য যে মানুষটা দরকার, সেটা আমার লাইফে আসে নাই। যেহেতু এখনো আসে নাই বা নাই, তাই ওই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছি না। আমার কথা হচ্ছে, এখন যা বর্তমান সেটা নিয়েই আমি ব্যস্ত থাকি।

আরো সংবাদ...