মুক্তমত

প্রগতিকে কে দেবে গতি

ঢাকা , ০৯ মার্চ , (ডেইলি টাইমস ২৪):

আটই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বেশ কিছুদিন থেকেই ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপিত হচ্ছে এই দিনটি। এই উদযাপনে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে নারীর জীবনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন এসেছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু একটি পরিবর্তন লক্ষণীয়।এই তারিখটিতে নারী তার কথা বলতে পারে, জানাতে পারে তার অবস্থান। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক, পুরুষ এই দিনটিকে মেনে নেয়। এই দিনের গুরুত্বকে তুলে ধরার জন্য এক সময় অফিস, আদালতে সর্বোচ্চ পদে একদিনের জন্য নারীকে বসতে দেয়া হয়েছিল।

সঙ্গত কারণেই আজ প্রশ্ন উত্থাপন করতে হচ্ছে : বাংলাদেশের নারীরা সঠিক বিচারে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিমান বাহিনীর বৈমানিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর অধিষ্ঠান কি তার মর্যাদাকে নিশ্চিত করছে?

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ নারী হলেও এদের জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় প্রত্যেক শিশু স্কুলে এলেও ওপরের দিকে ওঠার সময় নারী শিশুরাই বেশি ঝরে পড়ে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি অপুষ্টির শিকার। খাদ্য ও শিক্ষায় নিরাপত্তাহীনতার চেয়েও শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এখন উদ্বেগের বিষয়। ঘরে-বাইরে, বয়সে-অবয়সে নারী কোথাও নিরাপদ নয়।

যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে শুরু করে কোনো পেশার পুরুষই অভিযুক্ত হওয়া থেকে বাদ যাচ্ছে না। শুধু কি যৌন নির্যাতন? গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী দেশে ও বিদেশে, সর্বত্রই নির্যাতনের শিকার। দেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর মিডিয়ায় এলেও বিদেশের খবর থেকে যায় অজানা।

এই নির্যাতন সম্পর্কে পুরুষ তো বটেই, নারী সংগঠনগুলোরও কোনো উদ্বেগ আছে বলে মনে হয় না। মিডিয়ার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। এক সময় দিনাজপুরে ইয়াসমীনকে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছিল। প্রতিবাদের সামনের কাতারে ছিল নারী সংগঠনগুলো। আজ তারা সক্রিয় প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন না।

রাজনৈতিক দলগুলোও এখন নারী নির্যাতনের প্রশ্নে নীরব। অথচ ইয়াসমীনের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে এবং এসবের বিরুদ্ধে সীমিত প্রতিবাদ স্থানীয় ভিত্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

এই প্রতিবাদহীনতার ব্যাখ্যা কী হবে তা জানা আছে। প্রত্যেকেই বলবেন, গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হয়ে গেছে, প্রতিবাদের স্বাধীনতা এখন অনুপস্থিত। শুধু স্বাগত জানানোর জন্য মিছিল, সভা-সমাবেশ করা যেতে পারে। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত নাগরিকরা কোন সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিবাদে শামিল হবেন সেটা তারা ঠিক করতে পারছেন না- পারছেন না ভয়ে। এই ভয় গ্রাস করেছে সমাজকে। সমাজে সুশীল বলে যারা পরিচিত তারা নারী নির্যাতনের চেয়ে নারীর মাথায় হিজাব নিয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। সবাই চেষ্টা করেন হিজাবকে ধর্মান্ধতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই পৃথিবীজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে দিনটি। এই দিনটির লক্ষ্য হচ্ছে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্জন উদযাপন করা। একই সঙ্গে এ দিনটির আরেকটি উদ্দেশ্য লিঙ্গ সমতার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্যাপক শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি বৈষম্য। এ প্রেক্ষাপটেই ১৯০৮ সালে ১৫ হাজার নারী নিউইয়র্কের পথে নেমেছিলেন শ্রমঘণ্টা হ্রাস, বাড়তি বেতন এবং ভোটাধিকারের দাবিতে। বিগত একশ বছরে অনেক দেশেই পরিস্থিতি বদলেছে অথবা বদলানোর চেষ্টা চলছে।

সাধারণভাবে বলতে গেলে এ সবকিছু ক্ষমতায়নের সঙ্গে জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিতি নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। ক্ষমতায় থাকার পরও এমন ব্যবস্থা অনুমোদিত হয় যাতে নারীর ক্ষমতায়নের পথে তৈরি হয় প্রতিবন্ধক। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে বিশেষ ক্ষেত্রে ষোলো বছর বয়সে কন্যাশিশুর বিয়ের আইনি অনুমোদন। বিয়ে অন্যায় বা অগ্রহণযোগ্য কর্ম নয়। কিন্তু ষোলো বছর বয়সে একজন কন্যাশিশুর বিয়ে তাকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে। আঠারো বছর বয়স না হলে সে দেশের ভোটার হতে পারবে না, মোটর চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবে না, নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। যে কন্যা শিশুটির বিয়ে ষোলো বছর বয়সে হয় তার জীবন থেকে এ অধিকারের স্বপ্ন হারিয়ে যায়। আইনি সুবিধা পেতে তাকে আরও যে বছরগুলো অপেক্ষা করতে হয় ততদিনে সে মা হয়ে, সমাজে সংসার নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে তার আর বাইরের জগতের জন্য সময় থাকে না। এই নারীই যখন পরবর্তী পর্যায়ে কোনো এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য, তখন সে ঋণের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ঘরে এসে সেই টাকা তুলে দিতে হয় স্বামীর হাতে। ক্ষুদ্র ঋণের এই পরিণতি নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ঋণ ব্যবহারে নারীর মতামত অধিকাংশ ক্ষেত্রে থেকে গেছে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশের নারীর জন্য একটা বাড়তি বোঝা পুরুষের নিয়ন্ত্রণ। অথচ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হলেও ইসলামের এ বিধানের কথা অনেকেই জানেন না, স্ত্রীর আয়ের ওপর স্বামীর কোনো অধিকার নেই। অধিকার সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন। এই বিধানের কথা ধর্ম শিক্ষকরাও জোর গলায় বলেন না। পিতার সম্পত্তির ওপর কন্যার অধিকার থাকলেও সে এই সুযোগ পায় না। বহু প্রগতিশীল ভাই তার বোনকে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে- এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি।

নারীর অধিকারহীনতার তালিকা যেমন দীর্ঘ, অধিকারের তালিকা, অধিকার আদায়ের কাহিনীও বেশ দীর্ঘ। বাংলাদেশের নারী লড়াই করে অনেক দূর এগিয়েছে। তবু অনেক ক্ষেত্রেই সে কথা বলতে পারে না- কারণ তার কথা বলায় বারণ আছে।

বর্তমান বছরে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- প্রগতিকে দাও গতি। অনুমান করতে পারি নারীর এগিয়ে যাওয়ার গতিকে ত্বরান্বিত করার জন্যই এই স্লোগান। কিন্তু নারী কোথায়, কিভাবে এগোবে? নারী দিবসের আগে স্যানিটারি ন্যাপকিন উইল ফেস্টের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘নারী কর্তৃত্ব গ্রহণ করো ও দৃশ্যমান হও।’

নারী কিভাবে কর্তৃত্ব গ্রহণ করবে? যে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে দিন বদলের সূচনা করা যায়, সেখানেই তো নারী প্রতিনিধিত্ব নেই। নারীকে এখনও কোটার অনুগ্রহে বসতে হচ্ছে জাতীয় সংসদে।

আরেকটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘ও মেয়ে একবার যদি সাড়া দাও তার ডাকে ফিরে তাকাতে হবে না আর, ফুটে উঠবে তুমি গোলাপের মতো, খুলে যাবে পৃথিবীর সব দুয়ার। তোমায় নিয়ে কাব্য হবে- হবে গান, অপরূপ সুন্দরী তুমি- শুনেছো কী তারাদের আহ্বান?’ একটি সাবানের নামে আয়োজিত প্রতিযোগিতার আহ্বানে এ কথা বলা হয়েছে। বক্তব্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই।

এ দৃষ্টিভঙ্গি সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি- শুধুই সুন্দর হিসেবে নারীর কল্পনা। এ সৌন্দর্য দেহের, মনের নয়, নয় দক্ষতা ও যোগ্যতার।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের, বৈষম্যের অনেক গবেষণা, অনেক তথ্য ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন করে সেসব বলার প্রয়োজন নেই। এদেশে নারী অনেক আগে ভোটাধিকার পেলেও সে নিরাপদে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারে না, সহিংসতাই তাকে প্রথম বারণ করে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে। আজকে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নারী নির্যাতনের বিষয়টি প্রায়ই আলোচিত হয়।

নারী নিজেও তার জীবনের, নির্যাতনের কথা বলে। কিন্তু তারপরও যে প্রশ্নটি থেকে যায় তা হচ্ছে নারী অধিকারের কথা বলাই কি যথেষ্ট? নারীর মর্যাদার, অবস্থানের মূল্য না দিলে, তাকে সুরক্ষা না দিলে নারী অধিকার শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। হাদিসে আছে, যে পিতা তিনজন কন্যাসন্তানকে সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করবেন, তিনি অবশ্যই বেহেশতে যাবেন। যারা ধর্ম প্রচার করেন তারা কি ধর্মের এই অনুশাসনের কথা গ্রাহ্য করেন?

মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক

আরো সংবাদ...