মুক্তিপণের জন্য এমন নির্যাতন!

0
8

ঢাকা , ১১ মার্চ , (ডেইলি টাইমস ২৪):

রাজধানীতে ভুয়া ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে দুই যুবককে আটকে রেখে মুক্তিপণের দাবিতে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে। ভুক্তভোগী এক যুবক অভিযোগ করেন, ‘টাকার জন্য আমার পায়ুপথে স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়েছে, লোহার প্লাস দিয়ে হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলানোর চেষ্টা করেছে, দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক শক।’

ওই দুই যুবক হলেন আল আমিন (১৯) ও মহিন (১৯)। এ ঘটনায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় ১ মার্চ মামলা করেছেন ভুক্তভোগী আল আমিন। আর মহিনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচজনকে। মামলার আলামত হিসেবে ঘটনাস্থল থেকে স্ক্রু ড্রাইভার, চাপাতি, বাঁশের লাঠি ও চুল কাটার কাঁচি জব্দ করা হয়েছে।

আল আমিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহিন তাঁর বন্ধু। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাঁরা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে নামেন। তখন চার-পাঁচজন যুবক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে আটক করে তাঁদের টার্মিনাল এলাকার একটি বাসায় নিয়ে আটকে রাখেন। এরপর টানা দুই দিন দুজনকে আটকে রেখে তাঁদের পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। টাকা না পেয়ে চালানো হয় নির্যাতন। দুই দিন পর কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন আল আমিন। এরপর ১ মার্চ তিনি ধলপুরের অবস্থিত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‍্যাব)-১০ খবর দেন। এরপর র‍্যাবের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে বাসা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে সেখানে আল আমিনের বন্ধু মহিনকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ শনিবার পর্যন্ত তাঁকে উদ্ধার করতে পারেনি।

যেভাবে নির্যাতন
সেদিন বাস থেকে নামার পর তাঁরা সাভারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসের জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেখানে অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজন যুবক এসে বলেন, তাঁরা ডিবির লোক। তাঁদের কাছে মাদক আছে। ভুক্তভোগী আল আমিন বলেন, ব্যাগ কেড়ে নেওয়ার পর বলে, তাঁদের কাছে ইয়াবা আছে। এ কথা বলেই তাঁদের নেওয়া হয় সায়েদাবাদের ৪৩/৩৩ স্বামীবাগ লেন, সায়েদাবাদের একটি বাসায়। বাসার তিনতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়।

আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাসায় নেওয়ার পরপরই আমার কাছে থাকা ১৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয় তাঁরা। এরপর আমার মোবাইল ফোন দিয়ে আমার বাবাকে ফোন দিয়ে বলে, দুই লাখ টাকা দিলে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে, না হলে মেরে ফেলা হবে।’

আল আমিনের বাবা সিএনজিচালিত অটোচালক। পরিবার নিয়ে থাকেন চট্টগ্রামে। আল আমিন বলেন, বাবা যখন বলেন, এত টাকা তিনি কীভাবে দেবেন, তখন থেকে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো শুরু হয়। মামলার এজাহারে আল আমিন বলেন, বাবার কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অনুমান ১২ থেকে ১৩ জন যুবক মিলে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ও মহিনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন করেছেন। আসামিরা পর্যায়ক্রমে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে পায়ুপথে বারবার নির্যাতন করার ফলে রক্তক্ষরণ হয়। কয়েকজন মিলে প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলানোর চেষ্টা করেন। হত্যার উদ্দেশ্যে ইলেকট্রিক শক দেয়। তাঁদের দুই দিন কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।

অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে
আল আমিন ও মহিনের ওপর নির্যাতন চালানোর মামলার প্রধান আসামি মো. রনি (২৩)। রনির বিরুদ্ধে গেন্ডারিয়া ও যাত্রাবাড়ী থানায় আরও তিনটি মামলা আছে। এগুলো মাদক ও হত্যাচেষ্টার মামলা। আর মামলার দুই নম্বর আসামি সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা আছে দুটি। এগুলো মাদক ও হত্যাচেষ্টার মামলা।

ভুক্তভোগী যুবক ও এলাকার লোকজনের দেওয়া তথ্য বলছে, রনির বাড়ি চাঁদপুর। তিনি সায়েদাবাদ এলাকায় পানি সরবরাহ করেন। ভুক্তভোগী আল আমিনের অভিযোগ, রনিই তাঁকে বেশি নির্যাতন করেছেন। স্ক্রু ড্রাইভার ও ইলেকট্রিক শক দিয়েছেন তিনি।

যে বাসায় নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেই বাসার মালিক আনিচা ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাসায় দুজনকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয় নির্যাতনকাজে ব্যবহৃত স্ক্রু ড্রাইভারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র। তাঁর দাবি, সালাউদ্দিন নামের এক যুবক দুই মাস আগে তাঁর বাসা ভাড়া নেন। কিন্তু তিনি নিজে বাসায় থাকেন না। মাস গেলে টাকা পান। সালাউদ্দিনসহ অন্যরা বাসায় কী করেন, তা তিনি জানেন না।

ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হন চাঁদপুরের রনি (২৩), সালাউদ্দিন (২৯), সূত্রাপুরের রনি (৩০)। পরে গ্রেপ্তার হন সায়েদাবাদ ওয়াসা কলোনির সুমন (৩০) এবং জুম্মনকে (৩০)। পলাতক আছেন সায়েদাবাদ ওয়াসা কলোনির বাসিন্দা সাগর (২৪), মানিক (৩২), পারভেজসহ (২৯) আরও চারজন অজ্ঞাত আসামি।

তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওয়াছিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী মহিনকে এখনো উদ্ধার করতে পারিনি। তবে সাগরসহ অন্য আসামিদের ধরতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছি। শিগগিরই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে।’