প্রবাসের খবর

মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে কেপ ক্যানাভেরালে উপস্থিত রেকর্ড সংখ্যক বাংলাদেশি

ঢাকা , ১২ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):  

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেপ ক্যানাভেরালে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি জড়ো হয়েছেন। এর আগে একসঙ্গে এত বাংলাদেশিকে কখনই দেখেনি মার্কিনীরা।আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ দেখতে দেশ বিদেশের শত শত বাংলাদেশি সেখানে ভীড় জমাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের শত শত নেতাকর্মীসহ গণমাধ্যমের কর্মীরা ইতিমধ্যে কেপ ক্যানাভেরাল এলাকায় জড়ো হয়েছেন। বাংলাদেশিদের পাদভারে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে কেপ ক্যানাভেরালের নাসা’র কেনেডির স্পেস সেন্টার ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়। বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময় উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বাংলাদেশে এই সময়টি হচ্ছে ১১ মে রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট।

আজ কেপ ক্যানাভেরাল এলাকায় আবহাওয়া অনুকূলেই থাকবে। সুন্দর ঝকঝকে আকাশে থাকবে আংশিক রোদ। দিনে তাপমাত্রা থাকবে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৮২ দশমিক ২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। রাতে তাপমাত্রা কমে হবে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৬৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সূর্য উঠবে সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে। আর সূর্য ডুববে ৮টা ৩ মিনিটে। প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টার এই দিনে আনন্দ আর হৈ হুল্লোরের পাশাপাশি নাসা’র কেনেডির স্পেস সেন্টারের ৩৯-এ লঞ্চিং প্যাড থেকে ফ্যালকন ৯ (ব্লক ৫) কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ রকেটটিসহ মহাকাশে ওঠার দৃশ্য দেখে মাতোয়ারা হয়ে উঠবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

বুধবার সন্ধ্যায় হিলটন হোটেলে প্রীতি সমাবেশ, নিবন্ধন ও ডিনার পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের চূড়ান্ত বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সকাল ও সন্ধ্যার এ বৈঠক দুটোয় উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এবং আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। আরো ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ, বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদসহ কমিশনের কর্মকর্তাগণ।

বিভিন্ন প্রস্তুতির বিষয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানান, স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। উৎক্ষেপণের জন্য স্যাটেলাইট, লঞ্চার ও লঞ্চিং প্যাড রেডি করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, লঞ্চার আজ রাতে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার দিনে) লঞ্চিং প্যাডে নিয়ে রাখা হবে। বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ হবে। ৩ মিনিটের মধ্যে (১৬২ সেকেন্ড) উৎক্ষেপণ শেষ হবে। এরপর রকেটে করে স্যাটেলাইট মহাকাশের পথে (বাংলাদেশের ভাড়া নেওয়া অরবিটার স্লট ১১৯.৯ ডিগ্রিতে) যাবে।

এ ব্যাপারে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ৩ ক্যাটাগরিতে সেবা দেবে। ব্রডকাস্টিং, টেলিকমিউনিকেশন ও ডাটা কমিউনিকেশন সেবা দিয়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি করবে’।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ৮ দিন পরে স্যাটেলাইট অরবিটাল স্লটে প্রতিস্থাপিত হয়ে সংকেত পাঠাতে শুরু করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের উদ্যোগে আনন্দ সমাবেশসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণ শেষে ১১ মে সকালে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে অরল্যান্ডোর হিলটন হোটেলে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।

কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ রকেটটি মহাকাশে ওঠার মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মর্যাদার আসনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশও। উৎক্ষপণের দিনটি হবে বাংলাদেশের জন্য অন্যরকম একটি দিন। আগামী ১৫ বছরের জন্য মহাকাশের স্থায়ী বাসিন্দা হতে রওনা হবে ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’।

২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। এটার জন্য ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর বিদেশি অর্থায়ন ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট উড়াতে সর্বমোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষপণে অর্থায়নের জন্য হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সঙ্গে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি করেছে বিটিআরসি। বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৫৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরো যা বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ১৪০০ কোটি টাকার এই ঋণের ইন্টারেস্ট রেট এক দশমিক ৫১ শতাংশ। ঋণ শোধের সময় ১২ বছর এবং ২০ কিস্তিতে এ ঋণ শোধ করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নির্মিত হয়েছে ফ্রান্সের থ্যালেস এলিনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটিতে। নির্মাণ, পরীক্ষা, পর্যালোচনা ও হস্তান্তর শেষে বিশেষ কার্গো বিমানে সেটি কেপ ক্যানাভেরালের লঞ্চ সাইটে পাঠানো হয়। এর মধ্যেই তিন দশমিক ৭ টন ওজনের স্যাটেলাইটটি উৎক্ষপণে শুরু হয়ে গেছে ‘লঞ্চ ক্যাম্পেইন’। গত ৩০ মার্চ স্যাটেলাইটটি ফ্লোরিডার লঞ্চিং প্যাডে পৌঁছে। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে থ্যালেস এলিনিয়া স্পেসের সঙ্গে ডিজাইন ও নির্মাণের চুক্তি করে সরকার। এই চুক্তিটি ছিল ১ হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার।

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষপণের কথা থাকলেও হারিকেন আরমায় ফ্লোরিডায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় কেপ ক্যানাভেরাল থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ বন্ধ হয়ে গেলে বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যায়। বাংলাদেশও পড়ে সূচির জটে। এখন সূচির জট না থাকলেও আবহাওয়া একটা বড় কারণ। স্যাটেলাইট বহনকারী রকেটে প্রযুক্তিগত বা যান্ত্রিক সমস্যা দেখা না দিলে আজকের দিনটিই হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

এদিকে, স্যাটেলাইট বহনকারী রকেটে প্রযুক্তিগত বা যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে আগাম ও শেষ মিনিটেও যে কোনো স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের তারিখ এবং সময় পরিবর্তন হতে পারে বলে জানান স্পেসএক্স।

Related Articles

Close