মুক্তমত

জাফর ইকবালের লেখা নিয়ে সমালোচনা থামছে না

ঢাকা , ১৩ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):  

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ১১ মে শুক্রবার জাফর ইকবালের ‘আমি রাজাকার: একটি আলোকচিত্র’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটির সমালোচনা থামছে না।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমালোচনা করতে গিয়ে ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে অভিহিত করেন। মতিয়া চৌধুরীর এ বক্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বুকে ‘আমি রাজাকার’ লিখে রাজপথে অবস্থান নেয়। সে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমেও স্থান পায়। অধ্যাপক জাফর ইকবালের শুক্রবারের লেখার উপজীব্যও ছিল এ ছবিটি। পুরো লেখায় জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের এ আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান এবং রাজাকারদের সঙ্গে একাত্মতা করেছে বলেও দাবি করেন। কিন্তু অধ্যাপক জাফর ইকবালের লেখার কোথাও মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্য ও তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের প্রসঙ্গ আসেননি। যারা জাফর ইকবালের লেখাটির সমালোচনা করছেন, তাদের আপত্তির জায়গাটাও এখানে। সমালোচনাকারীদের দাবি, হয় পুরো বিষয়বস্তু না জেনেই, অথবা সত্য গোপন করে জাফর ইকবাল শিক্ষার্থীদের এমন কঠিন সমালোচনা করেছেন।

অধ্যাপক জাফর ইকবালের কাছে প্রশ্ন রেখে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট রাখাল রাহা লিখেছেন, মন্ত্রীর ‘রাজাকার’ হুঙ্কারের আগে ‘আমি রাজাকার’ দেখেছেন? দেখেননি। কোটা বাতিল চাইতে শুনেছেন? শোনেননি। প্রধানমন্ত্রী বাতিল চেয়েছেন।

অধ্যাপক জাফর ইকবালের লেখার শেষ অংশটি ছিল এরকম–‘কোটাবিরোধী এই আন্দোলনটি ছিল আসলে চাকরি পাওয়ার আন্দোলন। এই সফল আন্দোলনের পর আন্দোলনের নেতা নেত্রীদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই চাকরি পাবে এবং তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই সাভারে ট্রেনিং নিতে যাবে। এটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয় যে হয়তো আমি তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলব।

কথা শেষ হলে কোনো একজন নেতা হয়তো এসে আমাকে পরিচয় দিয়ে বলবে, আমি ২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন করেছিলাম খবরের কাগজে আমার ছবি ছাপা হয়েছিল, আমার বুকে লেখা ছিল, “আমি রাজাকার’’।

তখন আমি অবধারিতভাবে গলায় আঙুল দিয়ে তার উপর হড়হড় করে বমি করে দেবো।’

লেখা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রেজুয়ানুল হক লিখেছেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে জাফর ইকবাল স্যারের লেখাটি পড়লাম। লেখাটি পড়ে আমার কেমন জানি বমি বমি লাগছে।

অথচ এই আমিই জাফর ইকবাল স্যারের পক্ষ নিয়ে অনেকের সাথে অনলাইন-অফলাইনে তর্ক করেছি।

বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত জাফর ইকবাল স্যারের খুবই জনপ্রিয়, যুক্তিপূর্ণ এবং চমৎকার একটি লেখার শিরোনাম ছিল ‘‘তোমরা যারা শিবির করো’’। স্যারের মতো বিখ্যাত কেউ হলে আমিও একটা আর্টিকেল লিখতাম, যার শিরোনাম হতো ‘‘তোমরা যারা জাফর ইকবাল করো’’।’

তবে মতের বিরুদ্ধে গেলেই গালাগালি করা শোভন নয় জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক লিখেছেন, ‘কারো সাথে আমার দ্বিমত থাকতেই পারে, তার মানে এই না যে আমি তাকে যা খুশি তা বলবো আর ইচ্ছেমত গালিগালাজ করব।’

‘কোটা সংস্কার চাই’ শীর্ষক একটি গ্রুপ রয়েছে ফেসবুকে, যেখানে সদস্য রয়েছে প্রায় ২২ লক্ষাধিক। এটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানসহ যোগাযোগের একটি প্লাটফর্ম।

এই গ্রুপে জীবন মাহমুদ হাসান নামের ইঞ্জিনিয়ার লিখেছেন, ‘জাফর ইকবাল স্যার, সামনা-সামনি কথা বলার সুযোগ বন্ধ করেছেন। পত্রও পাঠ করেন না। ফেলে দেন না পড়েই। পত্রিকাও পড়েন না ঠিকমত। আগে তো মনে হয় প্রথম আলো পড়তেন। তারা আপনার লেখা ছাপত। আপনার লেখা ছাপানো বন্ধ করার পর এখন মনে হয় পড়েন না। নিজেকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন আপনি ভেবেছেন? ৭১ থেকে গর্তে থেকে থেকে আপনার চোখ আর আলোতে দেখতে পায় না।

ছাত্রসমাজকে ঘিরেই কিন্তু আপনার আয় রোজগার। আর আজ তাদের খোঁজখবরও রাখেন না। তাও সেটা মার্জনীয় হতো, আপনি তাদের কোনো খোঁজখবর না রেখেই হঠাৎ গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে তাদের ‘রাজাকার রাজাকার’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলেন!’

জীবন লিখেছেন, ‘এত বড় বড় বুলি ছাড়েন দেশপ্রেম আর ৭১ নিয়ে, নিজে কী করেছেন দেশের জন্য? ৭১-এ আপনার বয়স অন্তত ১৯ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক একজন হয়ে যুদ্ধে যাননি। নিজের পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে জাগেনি একবার?’

ফেসবুকে জাফর ইকবালের লেখার নিচেও বহু মন্তব্য এসেছে।  আর. এম. মামুন নামের একজন লিখেছেন, ‘আমি হলফ করে বলতে পারি আপনি আন্দোলনের নিয়মিত খোঁজ রাখেননি। মতিয়া চৌধুরীর ভিডিওটিও দেখেননি! যদি ভিডিওটা দেখতেন তাহলে আসল ব্যাপারটা জানতে পারতেন, বুঝতে পারতেন। যদি আপনি আন্দোলনের সঠিক খবর রাখতেন তাহলে এমন বিভ্রান্তিকর লেখা প্রকাশ করতেন না।’

অবশ্য অধ্যাপক জাফর ইকবাল ওই লেখায় উল্লেখ করেছেন, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না, নিয়মিত একটি ইংরেজি দৈনিক ছাড়া অন্য পত্রিকা পড়েন না। অথচ লেখায় তিনি দাবি করেছেন, তরুণরা গর্বভরে রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত ওই লেখার নিচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। তাদের মধ্যে সরকার জাবেদ ইকবাল নামে একজন লিখেছেন, ‘আমি বিব্রত। ব্যক্তি জাফর ইকবালের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি–আমি ভাষা খুঁজে পাই না, এটাকে কি বলব? বুদ্ধি-বিভ্র্রম? বুদ্ধি-ভ্রষ্টতা? বুদ্ধি-প্রতিবন্ধিতা? বুদ্ধিনাশ? বুদ্ধি-আপস? বুদ্ধি-সন্ধি? রাজনীতির কাছে বুদ্ধিবৃত্তির পরাজয়? নাকি আলোর কাছে পতঙ্গের আত্ম-বলিদান? শুভবুদ্ধির জয় হোক!’

বিষয়টিকে ‘তরুণ রাজাকার প্রজন্ম’ উল্লেখ করে তানভির নামে একজন ওই লেখার নিচে মন্তব্যে লিখেছেন, ‘বিগত দশকগুলোতে বিএনপি-জামাত-জাতীয় পার্টির শাসনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে ইসলামিকরণ হয়েছিল, তার ফল এই তরুণ রাজাকার প্রজন্ম। এই মন্তব্যগুলোতে চোখ বুলালে বোঝা যায় কি বিশাল সংখ্যক নীতিহীন তরুণ তৈরি করেছি আমরা। একটা শুদ্ধ প্রজন্ম তৈরি করতে হলে আরও বহু বছর স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সরকারে থাকতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ পেলেই এই নীতিহীন প্রজন্ম বিএনপি তথা জামাতকে নির্বাচিত করে আনবে।

এর জবাবে দিদারুল ইসলাম লিখেছেন, ‘আপনাদের মতো so called মুক্তমনা (!) লোকের জন্য তরুণরা বুকে রাজাকার লেখে। রাজাকার শব্দটা আপনার সস্তা করে ফেলেছেন। এখন মানুষ রাজাকার শব্দ শুনলে হাসে। কথায় কথায় রাজাকার বা পাকি দেশটাকে শুধু বিভক্তি আর বিদ্বেষী করল। নোংরামির চূড়ান্ত। বিভক্ত দেশ কখনো এগোতে পারে না। প্রশ্নপত্র পেয়ে পাশ করা জাতির কাছে আর কি বা আশা করা যায়!’

প্রিন্স নামের একজন মন্তব্যে লিখেছেন, “স্যার একটি জায়গায় লিখেছেন তিনি জীবন বাঁচাতে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির পর ঢাকা এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তার জন্ম ১৯৫২ সালে। মানে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ১৯। যে ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়ান তার এসব লেখা মানায় না। দেশপ্রেমে এতো হাবাডুবু খেলে তিনি কেন মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না বুঝলাম না।
তবে এই লেখাটি পড়ে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর একটি কবিতার লাইন মনে পড়ছে। বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ।”

লেখাটার কিছু শব্দ ও অংশ পছন্দ না হলেও স্যারের সমালোচনার ভাষা নিয়ে আপত্তি করেছেন সাংবাদিক আফসার আহমেদ। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘জাফর ইকবাল স্যারের শুক্রবারের লেখায় যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তাতে উনার লেখার স্বার্থকতা প্রমাণিত হচ্ছে। ভারসাম্যমূলক প্রতিক্রিয়া হতেই পারে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় যে ভাষা ব্যবহার হচ্ছে, তাতে মনে হয় আঘাতটা জায়গা মতোই দিতে পারছেন জাফর ইকবাল স্যার। আমি তো লেখাটায় কোনো সমস্যা দেখি না। উনার লেখার মূল বক্তব্যটা হচ্ছে, রাজাকারকে গৌরবান্বিত করার বিরুদ্ধে উনার ঘৃণা প্রকাশ। যদিও লেখাটায় কিছু শব্দ, বাক্য এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনকে খাটো করা-আমারও পছন্দ হয় নাই। সব সময় আমার মতো করে উনি লিখবেন-এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে উনারও গৌরব ও কষ্টের জায়গা আছে।’

লেখাটির নানা দিক নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকি ভট্টাচার্য। জাফর ইকবাল তার লেখায় এই আন্দোলনকে প্রতিবার ‘কোটাবিরোধী আন্দোলন’ ও চাকরি পাওয়ার আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে পিনাকি ভট্টাচার্য ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্যার জাফর ইকবাল, ছাত্ররা কোটাবিরোধী আন্দোলন করছে না, করছে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। আর ছাত্ররা চাকরির জন্যও এই আন্দোলন করছে না, করছে সাম্য আর ইনসাফের জন্য আন্দোলন। অথচ আপনি এটাকে চাকরির জন্য কোটাবিরোধী আন্দোলন বলে ট্যাগ দিয়েছেন।’

আরো সংবাদ...