মুক্তমত

দুর্নীতির দুরাচার দূরে থাক

ঢাকা , ১৫ মে, (ডেইলি টাইমস ২৪):  

দুর্নীতি আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে আমাদের। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় দুর্নীতি চক্রাকারে ঘুরছে। সাধারণ মানুষের এরকম অভিযোগ প্রায়শই আমরা শুনছি। আরো প্রশ্ন ছোড়েন সাধারণ জনগণ- কেউ কি দেখার নেই! নাকি দেখেও না দেখার ভাণ করে? এরকম এক সময়ে এসে সরকারও নড়েচড়ে বসে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়- দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। দুর্নীতি দমন আইন ২০০৩ এর প্রেক্ষিতে এটি গঠিত হয়। কিন্তু আশা সঞ্চারের মতো তেমন কোন কার্যক্রমই প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি বলে হতাশা ঘনীভূতই হতে থাকে জনমনে।

 ‘স্বাধীন গণমাধ্যম বা দায়িত্বশীল সুশীল সমাজ না থাকা, নেই দুর্নীতি প্রতিরোধে সঠিক ও কার্যকরী আইনের প্রয়োগ- এমন সমাজে দুর্নীতি সহজেই ঢোকে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সমাজের সুবিধাবাদী ও ক্ষতিকর ব্যক্তিদের হাতে অর্থ ও সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়। আর বাধাগ্রস্ত হয় সমাজের সার্বিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি।’ 

২০১৮’তে এসে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আপাতদৃষ্টিতে বেশ সক্রিয়ই দেখা যাচ্ছে। দেশের সবচে বড় ও আত্মঘাতী এই সমস্যা, দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে এবার ব্যাপক সরব দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। খোদ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এক বক্তৃতায় জানিয়েছেন, দুর্নীতি কমাতে তাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা। তাই মনে একটু আশার সঞ্চার হয়েছে যে, এবার হয়তো দুর্নীতি ধীরে ধীরে নির্বাসিত হবে।

এখন প্রশ্ন হলো- দুর্নীতি কি, এটা কি কেবলই এখনকার ইস্যু, নাকি আগে থেকেই এর বিস্তার ছিল সমাজ ব্যবস্থায়? দুর্নীতি যে আগে ছিল না তা নয়। ইতিহাস ঘাটলেও এমন নজির নেহায়েত কম হবে না। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জীবনপণ লড়াইয়ে বাঙালি অর্জন করে স্বাধীন বাংলাদেশ। পেরিয়ে গেলো ৪৬টি বছর। কিন্তু নিজেদের দুর্নীতির ঘূর্ণাবর্তে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, হতাশা আর সামাজিক সংকটে।

এই স্বাধীন বাংলাদেশ যে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটে ২০০৫ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআই এর প্রতিবেদনের মাধ্যমে। টিআই’য়ের তালিকায়, প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সবচে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা পায় বাংলাদেশ। সংবাদ মাধ্যম আর ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুর্নীতি সম্পর্কিত উঠে আসা নানা সংবাদ কম-বেশি আমাদের সবাইকেই বিচলিত করে।

দুর্নীতি নির্মূলে সবাই সোচ্চার সুর তুলে নানা মন্তব্যও করেন। কিন্তু দুর্নীতিটা কি, কোথা থেকে এর উৎপত্তি কিংবা কোথা থেকে এর উৎপাটন করতে হবে- এসবের আলোচনা খুব কমই দেখা যায়। মোটা দাগে বলা যায়, নীতি বিরুদ্ধ কাজই দুর্নীতি। আর এটি যখন সর্বত্র অলিখিতভাবে সিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, মানুষ যখন তার ন্যায়নীতি, আদর্শ আর মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে, আইন অমান্য করে কাজ করে, তখনই তা দুরাচার হিসেবে সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত করে। আর কলুষিত সমাজে ব্যক্তি বা দলগত স্বার্থ হাসিলই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।

‘যে লঙ্কায় যায়, সেই রাবণ হয়’ – পৌরাণিক এই প্রবাদের মতোই আমাদের সমাজেও কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তি বা ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের হাত ধরে বা ছত্রছায়ায়ই মূলত দুর্নীতির শুরু। এরপর ক্ষমতাধররা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে তা ছড়িয়ে দেয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মাঝে। আবার ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দুর্নীতির বাইরে, বেসরকারি খাতে যে দুর্নীতি হয় না – তা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়।

সমাজবিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞানে দেখা যায়, এসব দুর্নীতিগুলো তখনই হয় বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, যখন কোনো রাষ্ট্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার অভাব হয়। সেইসাথে এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা কিংবা ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সমাজে জবাবদিহিতার অভাব এবং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতায় দুর্নীতি বিস্তার হয়।

আবার স্বাধীন গণমাধ্যম বা দায়িত্বশীল সুশীল সমাজ না থাকা, নেই দুর্নীতি প্রতিরোধে সঠিক ও কার্যকরী আইনের প্রয়োগ- এমন সমাজে দুর্নীতি সহজেই ঢোকে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সমাজের সুবিধাবাদী ও ক্ষতিকর ব্যক্তিদের হাতে অর্থ ও সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়। আর বাধাগ্রস্ত হয় সমাজের সার্বিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি।

এখন প্রশ্ন হলো- আমরা কি আমাদের দেশে দুর্নীতিকে এভাবেই জিইয়ে রাখবো, নাকি সত্যি তা দূর করতে সচেষ্ট হবো। এক বাক্যে সবাই বলবেন, অবশ্যই দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। তাহলে আবারও আমার শুরুর সেই প্রশ্নে ফিরতে হবে। কিভাবে দুর্নীতি নির্মূল করবো, কিংবা কোথা থেকে করবো?

দুর্নীতির খবর সাধারণ মানুষ যেনো সরাসরি জানাতে পারে সেজন্য গত বছরের জুলাই মাসে দুদক হটলাইন “১০৬” চালু করেছিল। যার উদ্বোধনীতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, পরোক্ষভাবে দেশের সব মানুষ দুর্নীতিবাজ। সেসময় অর্থমন্ত্রী আরো বলেছিলেন, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আছে। সেবা দেয়ার নামে দুর্নীতি করছে ক্ষমতাবানরা, অতিরঞ্জিত কোন কিছু না করে দুর্নীতির তদন্ত ভালোভাবে করতে হবে। একই অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, রক্ষকরা ভক্ষক হওয়াতেই সমাজে দুর্নীতির বিস্তার হচ্ছে। তবে আশার বাণী দিয়েছিলেন প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব।

দুর্নীতি প্রতিরোধে দু’টো আইন আছে আমাদের দেশে। একটি হলো – ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭’। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে- ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৫৭’। এসব আইনের সংশোধনও আনা হয়েছে বিভিন্ন সময়। দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়- দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। ২০০৭ সালে দুদকের পুনর্বিন্যাস করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে আশান্বিত কোন ভূমিকা দুদক দেখাতে পারেনি- বিশিষ্টজনরা তো মনে করেনই, সাধারণ মানুষও তাই ভাবেন। তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সরব ভূমিকায়, চোখে পড়ার মতো সক্রিয় দুদক।

দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ ঘটা করে পালন করেছে দুদক। প্রতিদিনই এ সম্পর্কিত সেমিনার, সভা চলছে। এসময় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির শক্ত অবস্থানের কথা জানান। তবে এ-ও বলেন যে, দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী, তাই দুদক একা তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান হুঁশিয়ারি দেন, দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ শান্তিতে ভোগ করতে দেয়া হবে না। অনেক বছর পর প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের এরকম তোড়জোড়ে, নড়ে-চড়ে বসেছে সবাই। তাহলে এবার দুর্নীতি দূর হোক, নিজেদের স্বার্থে, ভবিষ্যত প্রজন্মের সুন্দর আগামীর জন্যে, দুর্নীতির বিপক্ষে জনগণকে সম্পৃক্ত করেই রুখতে হবে দুর্নীতি।

লেখক : সিনিয়র নিউজরুম এডিটর, বাংলাভিশন।

Related Articles

Close