সারাদেশ

হামলার নেপথ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা

ঢাকা , জুন , (ডেইলি টাইমস ২৪):

মুন্সীগঞ্জে সন্ত্রাসীদের গুলিতে লেখক-প্রকাশক শাহাজাহান বাচ্চু নিহত হওয়ার ঘটনায় ধর্মীয় উগ্রপন্থীদেরই দায়ী করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিহত বাচ্চুর আর্থিক-পারিবারিক বা এমন কোন বিরোধ ছিল না যে কারণে তাকে কেউ হত্যা করতে পারে। তিনি ফেসবুকে নিয়মিত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতেন। নিজের মতাদর্শ প্রচার ও নানা তথ্য বিশ্লেষণ করতেন। সে কারণে অনেকবার তিনি হুমকিরও সম্মুখীন হয়েছেন। তবে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কোন গ্রুপ তাকে হত্যা করেছে সেটা এখনো নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্টরা।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আনসার আল ইসলাম নামের মৌলবাদি সংগঠনটি ব্লগারদের হত্যা করেছে। তাদের হত্যার ধরণ জবাই করে। যদিও গুলির ব্যবহার তারা করেছে সেটা নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে। আবার নিউ জেএমবি নামের সংগঠনটি হত্যা করে গুলি করে। কিন্তু তাদের টার্গেট বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা হিন্দু পুরোহিত। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সময় হত্যা করা হয়েছে। ফলে কোন গ্রুপটি বাচ্চুকে হত্যা করল সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এদের কেউ এই হত্যাকান্ডে জড়িত।’

অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত চাপের মুখে জঙ্গিরা এখন অনেকটাই কোনঠাসা। ফলে বিচ্ছিন্নভাবে তাদের দু’একজন সক্রিয় থাকলেও আদর্শগতভাবে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন। এই কারণে হয়তো আনসার আল ইসলাম তাদের কিলিং মিশনে পরিবর্তন আনতে পারে। তাই তাদেরকেই মূল সন্দেহে রাখা হয়েছে। এই সংগঠনের কারা বাইরে আছে, কিভাবে আছে, কোথায় কি করছে সে সব বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এদের কয়েকজনকে সন্দেহ করা হচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক, কবি, প্রকাশক ও মুক্তমনা লেখক শাহজাহান বাচ্চুর লেখালেখির মূল বিষয় ছিল ধর্ম। তিনি দুই বিয়ে করলেও তা নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। ঢাকায় যে স্ত্রী থাকেন তিনি তার মতো থাকেন। আর গ্রামের স্ত্রীও নিজের মতো করে থাকেন। তাদের মধ্যে সম্পত্তি বা অন্য কোন বিষয় নিয়ে বিরোধ নেই। এলাকায় কোন শত্রু নেই। তিনি ‘শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র’ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন সেখানে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলতেন। এসব বিষয়ে তার বহু অনুসারীও আছে। সাদামাটা জীবন-যাপনে বিশ্বাসী এই লেখক ছিলেন সাহসী মানুষ। অনেক হুমকিতেও তিনি ভীত হননি। তার অনেক বন্ধু তাকে সতর্ক হওয়ার জন্য বহুবার বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি।

গত সোমবার সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যাপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব কাকালদি গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে চারজন বন্দুকধারী তাকে গুলি করে হত্যা করে ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনাস্থল তার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এএসআই মাসুম জানান, একজন ব্যাগ থেকে একটি ককটেল ছুড়ে তার দিকে তেড়ে এলে সে দৌঁড়ে পিছিয়ে যায়। সে পিস্তল বের করতেই আরেক জন তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। মাসুম নিজেও গুলি করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর রাত ১০টার দিকে ঢাকা থেকে নিহতের প্রথম স্ত্রী কানন ও মেয়ে দূর্বা সিরাজদিখান থানায় যান। তাদের সাথে ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি চৌধূরী আব্দুল্লাহ আল মামুন কথা বলেন। শাজাহান বাচ্চুর প্রথম পক্ষের ছোট মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রী দূর্বা (২০) জানান, লাশ দেখার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারি নাই বাবা মারা গেছে। জানিনা কারা মারতে পারে। আমি কারো কথা বলব না। তদন্ত সাপেক্ষে সেটা হবে। আর দ্বিতীয় পক্ষের বড় মেয়ে আঁচল জানান, আমাদের খবর দেওয়া হয় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই প্রথম ভাবলাম বাবার হাই প্রেশার ছিল। হয়ত প্রেশার বেড়ে গেছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভিড় । আরো কাছে গিয়ে জানতে পারি বাবার গুলি  লেগেছে এবং বাবা মারা গেছেন।

ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আপনাদের সামনে কথা হয়েছে, আলাদাও জিজ্ঞেস করেছি। ঢাকা থেকে কাউন্টার টেররিজম টিম এসেছে। আমরা সবাই মিলে এখানে কাজ করছি। সর্বাত্বক চেষ্টা করছি জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য।

সিরাজদিখান থানার ওসি মো. আবুল কালাম জানান, এ ঘটনায় নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা বাদী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকালে সিরাজদিখান থানায় মামলা করেছেন। আমরা অপরাধীদের ধরার চেষ্টা করছি।

এদিকে এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন পেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সেন্টারের পক্ষ থেকে সেক্রেটারি জেনারেল ড. সৈয়দা আইরিন জামান। তিনি অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি করেন।

আরো সংবাদ...