ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে শুভংকরের ফাঁকি

ঢাকা , ৭ জুলাই , (ডেইলি টাইমস ২৪):

ঋণের সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো শুভংকরের ফাঁকি দিচ্ছে। সব শ্রেণীর ঋণের সুদের হার গড় করে সিঙ্গেল ডিজিট দেখাতে চায়। এই ফাঁদে শিল্প ঋণকেও গুলিয়ে ফেলছে ব্যাংকগুলো। এতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত থাকছে।

এদিকে এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ব্যাংকে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামেনি। কয়েকটি ব্যাংক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু ঋণের বিপরীতে রয়ে গেছে নানা ধরনের কমিশন, ফি, চার্জ। এসব কারণে ঋণের ঘোষিত সুদ ৯ শতাংশ হলেও বাস্তবে এই হার ১১ থেকে ১২ শতাংশ হবে। বেশিরভাগ ব্যাংকই এখনও ঋণের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেয়নি।

বলা হচ্ছে, পর্যায়ক্রমে তারাও উদ্যোগ নেবে ঋণের সুদের হার কমানোর। এ অবস্থায় উদ্যোক্তাদের অনেকে ঋণের সুদের হার কমানো নিয়ে সংশয়ে আছেন। তবে স্বনামধন্য বৃহৎ শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করেন, যেহেতু বেসরকারি বিনিয়োগের স্বার্থে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজেটে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, তাই এটি কার্যকর বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হবে। বিশেষ করে শিল্প ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট নিশ্চিত করতেই হবে।

এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ চলছে। ধীরে ধীরে কমে যাবে। ১ জুলাই থেকেই নতুন সুদহার কার্যকর হবে।

আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে এবং ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুদহার কমানোর জন্য কম সুদে আমানত পেতে হবে। এটি এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। একটু সময় লাগবে। তবে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ বাড়ানোর পক্ষে সহায়ক শিল্প ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনবে। এ নিয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছি।

সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ব্যাংকই ঋণের সুদের হার কমায়নি। যারা কমিয়েছে, তারাও সিঙ্গেল জিডিটে নামিয়ে আনেনি। বিশেষ করে শিল্প ঋণের সুদের হার তারা ডাবল জিডিটেই রাখছে।

এদিকে সুদের হার সামান্য হারে কমানো হলেও ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো যেসব ফি, কমিশন বা চার্জ আরোপ করে রেখেছে, সেগুলো কমানোর ব্যাপারে কোনো কথা হচ্ছে না। এগুলোর কারণে ঋণের সুদের হার গড়ে ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক ভেদে ঋণ নিতে গেলে ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে ঋণ প্রসেসিং ফি দিতে হয়।

এতে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিলে প্রসেসিং ফি দিতে হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে জালিয়াতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো জামানত রেজিস্ট্রেশন করে নিচ্ছে। এর বিপরীতে কোনো কোনো ব্যাংক ১ শতাংশ ফি নিচ্ছে। আবার ঋণের বিপরীতে কোনো কোনো ব্যাংক সার্ভিসিং ফি নিচ্ছে ১ শতাংশ।

ক্ষুদ্র বা ভোক্তা ঋণের বিপরীতে তদারকি এজেন্সি কমিশন নিচ্ছে ১ থেকে ২ শতাংশ। কোনো ঋণ আগাম পরিশোধ করে দিলে ক্লোজিং চার্জ নিচ্ছে ১ শতাংশ হারে। এছাড়া হিসাব খোলা, হিসাব পরিচালনা, কাগজপত্র তৈরি, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ- সবক্ষেত্রে ফি রয়েছে। এসব খরচ কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

ঋণের সুদ হিসাবের ক্ষেত্রে রয়েছে আরও ফাঁকি। ব্যাংকগুলো এখন তিন মাস পর পর সুদ হিসাব করে তা মূল ঋণের সঙ্গে যোগ করে সুদকেও মূলধন হিসেবে মূল্যায়ন করছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি করা হয়েছে- কোনো ঋণের সুদকে এক বছরের আগে মূল ঋণের সঙ্গে যোগ করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিধি ব্যাংকগুলো মানছে না।

ব্যাংকগুলো এখন ঋণের গড় সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে দেখাতে ব্যস্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে কৃষি, মসলা, রফতানি ঋণ, নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণের সুদের হার ৪ থেকে ৯ শতাংশ। এসব খাতে কম থাকার কারণে অন্যান্য খাতে বেশি থাকলেও গড়ে ঋণের সুদের হার কম দেখানো সম্ভব হচ্ছে। ব্যাংকগুলো এখন এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গড় সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি জুনের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিলে ঋণের গড় সুদের হার ছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর মধ্যে বড় শিল্প খাতে ঋণের সুদের হার ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেবা খাতে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ, এসএমই ঋণের সুদের হার ১০.২৯ শতাংশ। বাস্তবে এসএমই ঋণের সুদের হার ২২ শতাংশ, শিল্প খাতে ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শিল্প ও সেবা খাতে ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাঋণের সুদের হারও কমাতে হবে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। আর শিল্প ঋণের কারণে শিল্প স্থাপন বাড়বে। ব্যাংকগুলো এখন গড় হিসাব করে সুদের হার কম দেখাচ্ছে। বাস্তবে সুদের হার কম নয়।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারি খাতের সোনালী, অগ্রণী, জনতা ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। এর মধ্যে জনতা ও সোনালী ব্যাংক প্রায় সব ধরনের সুদের ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। আমানতের সুদের হারও তারা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত রেখেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই হার ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। সরকারি খাতের কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক অচিরেই ঋণের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেবে, যা কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকেই।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি, আল-আরাফাহ্, সিটি, এশিয়া, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, প্রাইম, মধুমতিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। তবে তারা সবক্ষেত্রে এই হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনেনি।

প্রসঙ্গত, বাজেট ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর এক সভায় তিনি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দেন। ওই সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। তাকে উদ্দেশ করেই প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে এই হার কমানোর উদ্যোগ নেয়। এর আলোকে ২০ জুন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভায় সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। সুদের এই হার তারা ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা জানায়। বিএবির সদস্য হচ্ছে ৩৭টি ব্যাংক। এর মধ্যে ওইদিন ২৬টি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা এই হার কমাতে নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়।

এ বিষয়ে বিএবির সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার যুগান্তরকে জানান, অনেক ব্যাংক এরই মধ্যে সুদের হার কমিয়ে এনেছে। যারা এখনও কমায়নি, তারাও পর্যায়ক্রমে কমিয়ে ফেলবে। পরিবর্তিত সুদের হার ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হবে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংক সুদের নতুন হার ৩ জুলাই থেকে কার্যকর করেছে। তারা কৃষিঋণ ছাড়া সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের উপরে রেখেছে। এই হার আগে থেকেই ৯ শতাংশ রয়েছে। তারা মেয়াদি শিল্প ঋণের সুদের হার ভালো গ্রাহকদের জন্য সাড়ে ৯ থেকে ১২ শতাংশ এবং অন্য গ্রাহকদের জন্য ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, চলতি মূলধন বড় শিল্পে ৯ থেকে ১২ শতাংশ, মাঝারি শিল্পে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে। হাউজিং খাতে তারা সুদের হার রেখেছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।

ব্যাংক এশিয়া শিল্প ঋণের সুদের হার সাড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং চলতি মূলধনে ১০ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে। অন্যান্য ঋণে সুদের হার আরও বেশি রেখেছে।

আল-আরাফাহ্ ব্যাংক ২৯ জুন পর্ষদ সভা করে আমানত ও বিনিয়োগের হার পুনর্নির্ধারণ করেছে। এটি তারা ১ জুলাই থেকে কার্যকর করবে। তবে এখনও হিসাব-নিকাশ শেষ না হওয়ায় এটি ঘোষণা দেয়া হয়নি।

ব্র্যাক ব্যাংক ৩ জুলাই থেকে আমানতের নতুন হার কার্যকর করেছে। তারা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ সুদ দেবে ৮ শতাংশ। সুদের হারও কমিয়ে আনবে, তবে এখনও ঘোষণা দেয়া হয়নি। ইস্টার্ন ব্যাংক ২ জুলাই থেকে আমানতের সুদের হার কমিয়ে সর্বনিু ২ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অচিরেই তারা ঋণের সুদের হারও কমানোর ঘোষণা দেবে।

আইএফআইসি ব্যাংক ২৮ জুন ঋণ ও আমানতের নতুন সুদহার নির্ধারণ করে ১ জুলাই থেকে কার্যকর করেছে। তারা কৃষিঋণ ও রফতানি ঋণ ছাড়া বাকি সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের উপরে রেখেছে। এর মধ্যে মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন, বাণিজ্য ঋণ, গৃহঋণের সুদের হার সাড়ে ১০ থেকে ১১ শতাংশ রেখেছে। ভোক্তাঋণের ১৩ শতাংশ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২৪ শতাংশ রেখেছে।

প্রাইম ব্যাংক ৫ জুলাই থেকে নতুন সুদহার কার্যকর করেছে। তারা আমানতের সুদহার সর্বনিু ২ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ করেছে। ঋণের মধ্যে কৃষি, মসলা, রফতানি খাতে সুদহার ৬ থেকে ৯ শতাংশ, যা আগের অবস্থানেই রয়েছে। এছাড়া রফতানিমুখী শিল্প খাতে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ, মধ্যম মানের শিল্প খাতে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে সাড়ে ১৩ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে।

মধুমতি ব্যাংক ১ জুলাই থেকে নতুন সুদহার কার্যকর করেছে। এর মধ্যে কৃষি ঋণে আগের মতোই ৯ শতাংশ, বড় শিল্পে সাড়ে ১১ শতাংশ, মধ্যম শিল্পে ১৪ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র শিল্পে ১৫ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করেছে। ওয়ান ব্যাংক ১ জুলাই থেকে আমানতের সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৩ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ঋণের সুদহার এখনও ঘোষণা করেনি।