আমেরিকায় না আসা পর্যন্ত টেরই পাইনি আমি কালো : চিমামান্দা এনগোজি আদিচি

0
45
Author Chimamanda Ngozi Adichie photographed at One Aldwych.

ঢাকা , অগাস্ট , (ডেইলি টাইমস ২৪):

[আফ্রিকার সাহিত্যের নয়া বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর হিসেবে খ্যাত চিমামান্দা এনগোজি আদিচির জন্ম ১৯৭৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নাইজেরিয়ার এনুগু শহরে। বেড়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয় নগরী এনসুক্কায়। বাবা-মায়ের ৬ সন্তানের ৫ম তিনি। তার বাবা জেমস নাওয়েই আদিচি ইউনিভাসির্টি অব নাইজেরিয়ার অধ্যাপক ছিলেন। তার মা গ্রেস লিফিওমা ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার।নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর দেড়েক মেডিসিন ও ফার্মেসি বিভাগে পড়াশোনা করার পর ১৯ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ইস্টার্ন কানেকটিকট ইউনিভার্সির্টি থেকে গ্রাজুয়েশন করে জন্স হপকিনস থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংস্-এ মাস্টার্স করেন, ইয়েল থেকে মাস্টার্স করেন আফ্রিকান স্টাডিজ বিষয়ে।

তার প্রথম উপন্যাস পারপল হিবিসকাস (২০০৩) কমনওয়েলথ রাইটার্স পুরস্কার লাভ করে। দ্বিতীয় বই হাফ অব ইওলো সান (২০০৬) পায় অরেঞ্জ প্রাইজ। ছোট গল্প ‘আমেরিকান অ্যাম্বেসির ’ জন্য পান ও’ হেনরি পুরস্কার। তার ছোটগল্প সংকলন থিং অ্যারাউন্ড নেক প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। প্রবন্ধগ্রন্থ উই শুড বি ফেমিনিস্ট বের হয় ২০১৪ সালে। তার সর্বশেষ বই প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে, যার নাম অ্যা ফেমিনিস্ট ম্যানি ফেস্টো ইন ফিপটিন সাজেশন্স।

নাইজেরিয়াতে বেড়ে ওঠার সময় নিজের গাত্রবর্ণ বিষয়ে কোনো মাথা ব্যাথা না থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর বুঝতে পারেন তিনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ। এর মানে যে কী তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন তিনি। এর ফলে যে অভিঘাত তার মনে সৃষ্টি হয় তার প্রকাশ ঘটে ২০১৩ সালে লেখা উপন্যাস আমেরিকানায়। চিমামান্দা বিবাহিত ও এক সন্তানের জননী। তিনি কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিছুদিন নাইজেরিয়াতে বসবাস করেন। একটি ব্রিটিশ পত্রিকার পক্ষ থেকে তার এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুসান ভ্যানজানটেন। -অনুবাদক]

সুসান : আপনি বলেছেন ,‘‘লেখা আমি বেছে নেইনি; লেখাই আমাকে বেছে নিয়েছে।’এটা কী করে হয়েছে? এই আহবানে সাড়া দিয়ে কী করে লেখক হলেন? পেশা হিসেবে কি একে সনাক্ত করেছেন?

চিমামান্দা : আমার অনেক লেখক বন্ধু আছেন, লেখক হয়ে ওঠার পেছনে যাদের দীর্ঘ ও উত্তেজনাময় কাহিনি আছে। আমার বেলায় এ রকম কিছু নেই। ছয় বছর বয়স থেকে আমি লিখছি। তারপরেও মনে হয়, সত্যিই আমার কাছে এর একটা মানে আছে। বয়স যখন আমার দশ, ভেবেছিলাম, বন্ধুবান্ধব তো অনেক আমার; তারপরও স্মরণ করতে পারি, অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতাম কখন বাবার স্ট্যাডিতে গিয়ে ঢুকতে পারব আর নির্জনে লিখতে বসতে পারব। বাইরেটা যখন রোদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে, তখন কিছু করাকে একটুখানি খাপছাড়া বলে মনে হতো। এখন, একজন পরিণত মানুষ হিসেবে বুঝতে পারি ব্যাপারটার গুরুত্ব আমার কাছে আছে। এটা আমার ভেতর এমন এক অনুভূতির জন্ম দেয় যে, এসব করবার জন্যই আমার জন্ম।

সুসান : এই ব্যাপারটা বলতে গিয়ে কি আপনি পেশা শব্দটা ব্যবহার করতে চান?

চিমামান্দা : হ্যাঁ, আমার তো তা-ই মনে হয়। প্রায়ই বলেছি, লেখা প্রকাশের সৌভাগ্য না হলেও আমি লিখেই যেতাম। ছাপা হওয়ার ব্যাপারটা পছন্দই করি। এটাও একটা পছন্দই ছিল- চেষ্টা করব আর লেখা ছাপাব। তবে একথা ঠিক যে, প্রকাশ করার ব্যাপারটা লেখা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ব্যাপার।

অবশ্যই সবাই লেখা প্রকাশ করতে চায়। তা না হলে তো একটা ডায়েরিতে সব লিখে ড্রয়ারে পুরে রাখতাম। প্রকাশ করা মানেই তা সবার সামনে নিয়ে আসা। যে কারণে কোনো বই প্রকাশিত হলে তার থেকে একটা দূরত্ব অনুভব করি আমি। একা যখন কোনো একটা বইয়ের সঙ্গে থাকি তখন একেবারে বোকার মতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কাজ শেষ না করা পর্যন্ত কাউকে দেখাতে পারি না, স্বস্তিও অনুভব করি না। লেখার পর্বটা একান্তই ব্যক্তিগত। যখন তা ঠিক মতো চলে আমাকে একটা চরম শিখরে নিয়ে যায়; কিন্তু কোনো লেখা যখন চূড়ান্তভাবে সম্পাদকের কাছে পাঠাই, অর্থাৎ যখন ব্যবহারিক কাচে চোখ রাখি, কাজটি সম্পর্কে তখন কম অন্তর্জ্ঞান আর অধিক প্রয়োগবাদী পন্থায় ভাবনা-চিন্তা করি।

সুসান : আপনিতো প্রথম দিকে কবিতা আর নাটক লিখতেন, কিন্তু এখন মনে হয় আপনি গল্প-উপন্যাসে আপনার পথ খুঁজে পেয়েছেন। উপন্যাস বা ফিকশনে বিশেষভাবে কী আছে যা আপনাকে আকৃষ্ট করে। গল্প কথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন কেন?

চিমামান্দা : যথার্থই বলেছেন, কেন? কারণ কবিতায় ভাল করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। তাছাড়া, আমার পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে একটি সচেতন ব্যাপার নয়। আমি কেবল কাজটা করি। তবে আমাকে বলতেই হবে যে গল্প উপন্যাস বাস্তব। ওগুলো আমার বন্ধুদের লেখা ‘বিজ্ঞপ্তি জাতীয় ’ একটা কিছু আর এসব নিয়ে সব সময়ই আমি তর্কে লিপ্ত হই। আমার মনে হয় ফিকশন ওই ‘বিজ্ঞপ্তি জাতীয় ’ রচনার চেয়ে বেশি সৎ প্রয়াস। ওগুলো লেখার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশেষ করে স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে- আমি প্রতিনিয়ত আলোচনা করে যাই বিভিন্ন স্তরের স্ব-সেন্সরশিপ আর আত্মতত্ত্বাবধান, জন-রক্ষার যে ব্যাপারটা পছন্দ করি, কখনো জন-রক্ষার যে ব্যাপার পছন্দ করি না, কিন্তু ভাবনায় পড়ি- পাঠকের ভেতর পক্ষপাতমূলক মনোভাব চলে আসতে পারে। ফিকশন লেখার সময় ওটা নিয়ে আর চিন্তা করি না। ফিকশনের ক্ষেত্রে মৌলিক সততা প্রদর্শন সম্ভব। কাল্পনিক চরিত্রের বেলায় কাউকে রক্ষা করবার কথা আমার মনে হয় না।

সুসান : তার মানে নিজের ফিকশনে তাদের দেখে চেনাজানা লোকজনের জন্যে উদ্বিগ্ন হন না?

চিমামান্দা : তারা হয়, নিত্যই, কিন্তু না আমি উদ্বিগ্ন হই না। হাস্যকর ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, মানুষের চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে যখন লিখি, তারা জানতেই পারে না। যখন আমি তা করি না, তারা মনে করে আমি তা করে চলেছি।

সুসান : ধর্ম নিরপেক্ষ-উত্তর সংস্কৃতিতে অনেক পশ্চিমা পাঠকই আফ্রিকার জনজীবনে ধর্ম যে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে তা বুঝতে চায় না। আপনার গল্প-উপন্যাসে ধর্মের উপস্থিতি আর এর গুরুত্ব খুব স্পষ্টভাবেই উঠে আসে। থাকে প্রথাগত ক্যাথলিক বিশ্বাস, আফ্রিকার নতুন ধারার ক্রিশ্চিয়ান ধর্ম, ইসলাম, আরও বেশি সহনশীল ও উদারনৈতিক ক্যাথলিক আর বেশি ধর্মীয় আচার আচরণ। আধ্যাত্মিকতার এই প্রবল জোয়ারের বিশ্বে ক্যাথলিক-নাইজেরিয়াতে এর বিস্তার কি রকম?

চিমামান্দা : আধ্যাত্মিকতার জোয়ারই বটে। কিন্তু আমেরিকায় কি সত্যিই একটি ধর্ম নিরেপেক্ষ-উত্তর সমাজ চালু আছে? নিশ্চিত নই আমি। আমার ধারণা ওটা একই সাথে ধর্মীয়ও তবে এর প্রকাশ ঘটে ভিন্নভাবে। কম সরাসরি ভাবে। আমার এটাও মনে হয় যে, ধর্ম বিরোধী আন্দোলন নিজেই একটা ধর্ম  কখনো কখনো তা যে কোনো ধর্মীয় আন্দোলনের চেয়ে তীব্র। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নাইজেরিয়া আর দক্ষিণ সাহারা পাড়ের বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে ধর্মের একটা ভৌগোলিক উপাদান আছে। দক্ষিণ পূর্ব নাইজেরিয়ার ইগবোল্যান্ডের কথাই ধরা যাক, ওখান থেকেই আমার আগমন, ওখানে প্রিসবিটোরিয়ান মিশনারিরা এক দিক থেকে এসেছিল আর অন্যদিক থেকে এসেছিল আইরিশ- ক্যাথলিকগণ। ১৮৮০ কিংবা ১৮৯০ সালের দিকে নিজেদের সুরক্ষার জন্যে একে অপরের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। আমার পিতামহ ১৯২০ সালে ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসে আস্থা স্থাপন করেন আর আমার পিতার জন্ম ১৯৩২ সালে। ক্যাথলিক শিশু হিসেবে দীক্ষা লাভ করেন। মায়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়। আমাদের পরিবার আশপাশের অনেক পরিবারের মতোই নরমপন্থি ক্যাথলিক ছিল। আমাদের আশপাশে যারা থাকত সবাই ছিল ধার্মিক। মানুষ গির্জায় যেত। এ সব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না।…

আমি ওই পরিবেশে বড় হতে থাকি। প্রতি রোববার গির্জায় যেতাম। ধর্মের নিবিড় সান্নিধ্যে ছিলাম বলা যায়। ছোট হলেও একেবারে অন্ধের মতো সবকিছু পালন করিনি। আমার নানা রকমের প্রশ্ন ছিল। সবাই গির্জায় যেত আর চুপচাপ বাড়ি ফিরে আসত। গির্জার যে ঘরে প্রার্থনাকালীন আনুষ্ঠানিক পরিচ্ছদ ও অন্যান্য উপাচার রাখা হতো আমি সেখানে যেতে চাইতাম আর যাজকের সাথে কথা বলতে চাইতাম আমার পিতার নিশ্চিত বিরক্তি সত্ত্বেও বিষয়ে। কিন্তু আমার বাবা-মা ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল। তারা ওভাবেই  চালিয়ে যেতেন। ক্যাথলিক গির্জার নাটকে আমাকে নেওয়া হয়েছিল। ইস্টার সংক্রান্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মোমবাতি ওপরে তুলে ধরার সময় আমি কান্না করতাম। সবাই মোম জ্বালাত আর তা হাতে ধরে রাখত। শপথবাক্য পুনর্পাঠের সময় তারা মোম জ্বালাত; আমি এত অভিভূত হয়ে পড়তাম যে শেষাবধি কান্নায় ভেঙে পড়া ছাড়া গত্যন্তর থাকত না।

আমি আগরবাতির ঘ্রাণ আর লাতিন ভালবাসতাম। এ গুলো নিয়ে লিখবার একটা মানে আমার কাছে আছে। সুখী ক্যাথলিক শিশু হিসেবে বড় হয়েছি আমি।

সুসান : এখনও কি আপনি গির্জার প্রার্থনা সভাতে যান?

চিমামান্দা : যাই মাঝে মধ্যে, আবার গিয়ে ফিরেও আসি যখন যাজক সাহেবের কথাবার্তা হাস্যকর বলে মনে হয়। বছর খানেক আগে নাইজেরিয়াতে এক যাজকের সঙ্গে আমার সর্বশেষ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। অনুষ্ঠানের শেষে আমি তার সঙ্গে আলাপ করতে যাই যাজক সাহেবের কথাবর্তায় নারী-বিদ্বেষ অনুধাবন করে। তার পুরো বক্তৃতাটা জুড়েই ছিল নারীদের পোশাকের বিরুদ্ধে আক্রমণ। ছোট হাতার জামা গায়ে দিয়ে এলে তিনি কোনো মহিলাকে গির্জায় ঢুকতে দেন না। বলেন, ‘অনাবৃত হাত দেখিয়ে পুরুষদের উদ্দীপ্ত করতে চাও।’গেলাম তাকে ধরতে। বিষয়টা প্রীতিকর ছিল না। খুব রেগে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, সামগ্রিকভাবে ধর্ম নিয়ে এই এক সমস্যা। ওই লোককে এত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।…

সুসান : আপনাকে আফ্রিকার লেখক, নাইজেরিয় লেখক, নারীবাদী লেখক ও উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্যিক হিসেবে অভিহিত করা হলেও  ক্যাথলিক লেখক বলা হয়নি কখনোই। ব্যাপারটা বিস্ময়কর। এ ধরনের পরিচিতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

চিমামান্দা : ক্যাথলিক লেখক একটা প্রশ্নের জন্ম দেয়, ক্যাথলিক লেখক কী? গ্রাহাম গ্রীণ এক সময় বলেছিলেন, তিনি একজন লেখক, ঘটনাচক্রে তিনি একজন ক্যাথলিক। একটা সময় গেছে যখন আমি এই ধরনের মার্কা মেরে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলাম। কোনো নামেই পরিচিত হতে চাই না আমি। আমি একজন লেখক। শুধু এই। আমি গল্প বলি। আমি এমন একটা পৃথিবীতে বাস করতে চাই যেখানে বিশেষ পরিচিতি কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এমনটা নেই, এখনও নেই। উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়, যখন আমি ‘অরেঞ্জ পুরস্কার’পাই তখন খুবই বিরক্ত হয়েছিলাম যখন বলা হলো ‘এই প্রথম কোনো আফ্রিকান ’ এ পুরস্কার পেলেন।

সুসান : লিঙ্গ এই পরিচয়ের বিষয়টিকে কতখানি প্রভাবিত করে? এই প্রশ্নগুলি কি আরও বেশি জবরদস্তিমূলক, না নারীর জন্যে তা অপূর্ব এক রূপ সৃষ্টি করে?

চিমামান্দা : সম্প্রতি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমার পুরুষ চরিত্রগুলো অভিবাসন বিষয়ে ভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কেন; কখনো তারা অতিমাত্রায় উৎসাহী, কখনো তারা নির্বোধ। আমি চাইনি চরিত্রগুলো এ ভাবে চিত্রিত করতে।  পুরুষরাও সংগ্রাম করে। প্রাথমিকভাবে আমি নারীদের অভিজ্ঞতার অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিলাম। আমার মনে হয়েছিল তাদের ব্যাপারগুলো আমার জানা। ওটা আমার নিজের কোনো কাহিনি নয়। ওসব আমার বোন আর তাদের বান্ধবীদের, আমার মামাতো, খালাত, চাচাতো ফুপাতো বোন আর তার বান্ধবীদের গল্প। আমার মনে হয়, পরিচয় হচ্ছে যে কারও কাজের কেন্দ্র, কে কোথায় আছে তার ওপর ভিত্তি করেই স্থানের পরিবর্তন ঘটে।

আমি প্রায়ই বলি, আমেরিকায় না আসা পর্যন্ত আমি টেরই পাইনি আমি কালো। আগে কখনো এ রকম ঘটেনি। ‘রুটস’বইটা আমি পড়েছি। কুন্তা কিন্তে আমাকে দারুনভাবে নাড়া দিয়েছিল। কিন্ত কখনোই আমি নিজেকে কালো বলে ভাবিনি। আমেরিকায় আসার মাস খানেকের মধ্যে, আমার মনে পড়ে, একজন আফ্রো-আমেরিকান ভদ্রলোক আমাকে ‘ভগ্নি’উল্লেখ করে; আমার মনে হয়েছিল কী অশোভন ব্যাপার! আমি ওটা চাইনি। টিভি দেখে জেনেছিলাম কালো হওয়াটা ভাল ব্যাপার নয়। তখন আমি ভেবেছিলাম, তোমাদের দলে আমাকে অন্তর্ভূক্ত করো না। আমি তোমাদের অংশ নই। ওই পরিচিতি গ্রহণ করতে আমাকে জিজ্ঞাসা আর পড়াশোনার মাধ্যমে আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাস জানতে হয়। এসব বিষয়ে আগে আমার ধারণা ছিল না। ওই ব্যাপারে এখন আমি সুখী।

সুসান : আফ্রিকার সাহিত্যের জনক বলে খ্যাত ‘থিংস্ ফল অ্যাপার্ট’গ্রন্থের রচয়িতা চিনুয়া আচেবের প্রভাব আপনার ওপর আছে বলে উল্লেখ করা হয়। পারপল হিবিসকাস শুরুই হয়েছে ওই বইয়ের অনুসরণ দিয়ে। আর দ্য থিং অ্যারাউন্ড ইয়োর নেক-এর শেষ গল্পে থিংস্ ফল অ্যাপার্ট-এর শেষ অধ্যায়ের বিকল্প নারীবাদেরই একটি পরিবেশনা। আচেবের দ্বারা আপনি কীভাবে প্রভাবিত? কী পন্থায় বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেন আর তার উদাহরণের বাইরে যেতে চাইলেন?

চিমামান্দা : চিনুয়া আচেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অপরিসীম, তাই বলে আমি দ্বিতীয় বা তৃতীয় আচেবে হতে চাইনে। আমি চিমামান্দা আদিচি-ই থাকতে চাই।

চিনুয়া দারুন সৎ একজন মানুষ। তার প্রতি আমার বিশ্বাস অগাধ। এমন কিছু লেখক আছেন যাদের লেখা আপনি পড়েন ও ভাবেন- এটা একটা কাজ বটে। আমার তো মনে হয় না আপনি বিশ্বাস করেন ব্যাপারটা। আর আমার মতে ফিকশন সত্য হওয়া উচিত। একটা সময় ছিল যখন ভাবতাম, এই গল্পটা লিখছি কারণ দেখাতে চাই যে, আমি পারি। কিন্তু তখনই আমার মনে হলো- এটা একটা মিথ্যে, আমি পারি না, কারণ জীবন অতি ক্ষুদ্র আর আমি তা-ই করতে চাই যা বিশ্বাস করি। ইগবো এলাকায় বেড়ে ওঠায় ছোটবেলায় ভাল শিক্ষা লাভের সুযোগ আমার  ঘটে; কিন্তু আমার শিক্ষা আমার অতীত সম্পর্কে কিছুই শোখাতে পারেনি। থিংস্ ফল অ্যাপার্ট পড়ে সেখানে আমার দাদা কিংবা পর দাদাদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পাই। ওটা তখন আমার কাছে সাহিত্যের চেয়েও বেশি কিছু একটায় পরিণত হয়। ওটা আমার নিজের গল্প হয়ে দাঁড়ায়। আচেবের উপন্যাসগুলোর দ্বারা আমি দারুণভাবে সুরক্ষিত, অন্য যে সব বই আমি ভালবাসি তার একটি দ্বারাও আমি এভাবে সুরক্ষিত নই।

সুসান : আর কোন কোন লেখক আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কোন বই বা কোন লেখককে আপনি পছন্দ করেন?

চিমামান্দা : আমি প্রেমে পড়ি আর প্রায়ই এর বাইরে থাকি। এক সময় আমার ভেতর এডিথ হোয়ারটন পড়ার প্রবল ঝোঁক ছিল, তার সব লেখাই পড়তে চেয়েছি। পড়তে পড়তে এক সময় আমার মনে হলো, তার আর একটা বইও যদি পড়ি তাহলে আমি মারা যাব।

ফিলিপ রথকে আমি খুবই পছন্দ করি, আমার নারীবাদী বন্ধুদের উদ্বেগ সত্ত্বেও। পছন্দ করি তার কৌশল আর পদ্ধতি, আর যে পন্থায় তিনি সব কিছু লুকাতে অস্বীকৃতি জানান। আমি পছন্দ করি সেই সব লেখক যারা সাহসী। লেখালেখির জন্যে সাহসের প্রয়োজন- কেন? সামাজিক বাস্তবতাগুলোকে সামনে নিয়ে আমার জন্যে। ফিকশনের নামে শিল্পের আড়ালে লুকানো খুব সহজ, কেননা আপনি হয়ত কাউকে ভয় পান, কেউ বলতে পারে আপনার মধ্যে একটুখানি রাজনীতি আছে, অথবা বলতে পারে রাজনীতি গল্প-উপন্যাস লেখকের কাজ নয়। কিন্তু রথ ছিলেন নির্ভীক, আমি তার ওই বিষয়টাকে শ্রদ্ধা করি।

সুসান : চিনুয়া আচেবের পর্যায়ের আর কেউ আছেন, যিনি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

চিমামান্দা : না, চিনুয়ার দুর্ভাগ্য যে তিনি একাই দাঁড়িয়ে আছেন স্বমহিমায়। ইংরেজি আর রুশ উপন্যাস পড়ে আমি বড় হয়েছি। ওগুলো আমার বেশ ভাল লাগত, বিশেষ করে ইংরেজিতে লেখাগুলো; কিন্তু আচেবের আগে আর কাউকে নিজের বা একান্ত আপন বলে মনে হয়নি। অন্য যে বইটি পড়ে আমার অনুরূপ অনুভূতি হয়েছিল সেটি কামারা লেইর লেখা ছোট একটি উপন্যাস দ্য আফ্রিকান চাইল্ড। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী থাকা কালে বইটা পড়া হয়, সেই সময়ই প্রথম পড়েছিলাম থিংস্ ফল অ্যাপার্ট; মনে আছে ওটাতে এক ধরনের জাদু ছিল। গিনিতে কীভাবে তার বাল্যকাল কেটেছে তারই বয়ান, ওখনকার অনেক জিনিস ছিল আমার অপরিচিত। অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল ওখানে, তবে আশ্চর্যজনক একটা ঘনিষ্ঠতা খুঁজে পাওয়া যায়। বইটির প্রেমে পড়েছিলাম মনে আছে, যেখানে ছিল এক চমৎকার বিষাদ-কাতরতা। আমি অতীতে ফিরে যেতে চাই, আবার পড়তে চাই বইটি, নাড়াচাড়া করে দেখতে চাই।

সুসান : আপনি তো ক্রিয়েটিভ রাইটিং ওয়ার্কশপে পড়ান। সৃজনশীল লেখক হতে চায় যেসব তরুণ তাদের কাছে কী বলেন?

চিমামান্দা : তাদের বলি, পড় এবং পড়। পড়ায় বিশ্বাসী আমি, কোথায় কী লেখা হয়েছে, ব্যাপকভাবে দেখতে চাই। সেই সমস্ত জিনিস পাঠ করতেও আমি আগ্রহী যেগুলো একবার হলেও আপনার অপছন্দের ছিল। শুধু জানবার জন্য পড়তে চাই। প্রায়ই আমার ছাত্র ছাত্রীদের বলি, এখন তোমাদের এমন কিছু পড়ে শোনাতে চাই যা আমার ভাল লাগেনি। শীতল ধরনের ফিকশন পছন্দ করি না আমি। ওই সব গল্প  উপন্যাসও আমার ভাল লাগে না যা শুধু নিরীক্ষা। ক্লাশে ছাত্রদের হাতে প্রায়ই ওই ধরনের বই দেখি। তারা পছন্দ করে। আমি তাদেরকে বলি, কেন ওগুলো আমি পছন্দ করি না। তারপরও আমাকে জানিও কেন তোমরা ওসব পছন্দ কর।

আমি পড়াশোনা থেকে শুধু মাত্র শিল্প কৌশল ও কায়দা কানুন শিখতে চাই না, শিখতে চাই বিশ্ববীক্ষা।

বাক্য গঠনের বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, নজর দেওয়া উচিত কেমন করে একজন লেখক তার চরিত্র নির্মাণ করেন তার ওপর। আমি গল্পের বিষয়টা নিয়েও ভাবি। ওটিও একটা বড় ব্যাপার। তবে ওয়ার্কশপে আমরা সবাই খুব মজা করি। আমার কাছে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, হাসবার কারণ আমরা খুঁজে পাই; আমরা হাসিও। (সংক্ষেপিত)