জাতীয়

ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হয় যেসব কারণে

ঢাকা , ১১ অক্টোবর, (ডেইলি টাইমস ২৪):

পৃথিবীর দুই অংশের মানুষ এখন তিনটি বড় ঝড়ের মোকাবিলা করছে। ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে ভোরে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’। ঠিক অন্য পাশের উপকূলে, আরব সাগরের তীরে আঘাত করতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন ‘লুবান’। একই সঙ্গে দুটি সাইক্লোন আঘাত হানার ঘটনা দেশটিতে প্রায় ৪০ বছর পর ঘটতে যাচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে হ্যারিকেন ‘মাইকেল’।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বৃষ্টিপাত হলেও বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় তিতলির আসার আশঙ্কা অনেক কম। সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আর নদীবন্দরগুলোকে দেখাতে বলা হয়েছে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত।

বিবিসির খবরে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে হ্যারিকেন ফ্লোরেন্স, হার্ভে, পুয়ের্তো রিকোয় মারিয়া, ফিলিপাইনে সুপার টাইফুন ম্যাঙ্গখুট, হাওয়াই দ্বীপে ঝড় লেন, যুক্তরাষ্ট্রে ঝড় আলবার্তো, সলোমন দ্বীপে লিলুয়া সাইক্লোন, ফিজিতে সাইক্লোন জোসি ছাড়াও অনেকগুলো ভূমিকম্প, বনের আগুন, ভূমিধস ও বন্যার ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে এ বছরের ১০ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ৫০টিরও বেশি ঝড় মোকাবিলা করতে হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরের বাকি সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতেই সাত থেকে ১১টি সাইক্লোন হতে পারে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি হবে বড় ধরনের।

এ বছরের মধ্যে আরও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা পরিবেশবিদের। ছবি: সংগৃহীত
এ বছরের মধ্যে আরও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা পরিবেশবিদদের। ছবি: সংগৃহীত

এত বেশি ঝড় তৈরির কারণ

একই সময়ে এত বেশি ঝড়ের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন পরিবেশবিদরা।

আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর ঝড় বেশি হচ্ছে। এমনকি একই সময়ে বিশ্বে একাধিক ঝড়েরও তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং এল নিনোর নিরপেক্ষতার কারণে সাগরের পরিবেশগুলোও অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। যেমন: ভারত মহাসাগরে স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা এক-দুই ডিগ্রি বেশি উষ্ণ ছিল। এসব কারণে এখানে ঝড়গুলো দ্রুত তৈরি হচ্ছে। তার অনেকগুলো পরবর্তীতে বড় হয়ে যাচ্ছে, অনেকগুলো আর বাড়ছে না।’

‘যতদিন পর্যন্ত এসব সাগরের উষ্ণতা যথেষ্ট মাত্রায় নিচে নেমে না আসবে, ততদিন এসব ঝড়ের দেখা পাওয়া যাবে। সাইক্লোনের পরিবেশ তৈরির একটি বড় কারণ সাগরের উপরের তাপমাত্রা ২৬.৫ বা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকা। এখন বিশ্বের অনেক এলাকার সমুদ্রেই এমনটা দেখা যাচ্ছে।’

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, নভেম্বর মাস থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে দুর্বল এল নিনো তৈরি হতে পারে। এল নিনো তৈরির জন্য তারা ৭৫ শতাংশ আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন।

এ আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, ‘এল নিনো তৈরি হলে বিশ্বের অন্যান্য এলাকায় সাগরের উষ্ণতা কমে যাবে। তখন এসব সাগরে ঝড়ের প্রবণতাও কমবে। তবে সেটি বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আবার প্রভাবিত করবে। গত বছর ঝড় কম হয়েছে। এবার আবার বেশি হচ্ছে। এভাবে আবার একটি মৌসুম আসবে, যখন দেখা যাবে ঝড়ের প্রবণতা অনেক কমে যাবে।’

‘বিশেষ করে এল নিনো (পেরুর উপকূলে সমুদ্রের উপরের পানি গরম হয়ে যাওয়া, যা সেখানে মেঘ সৃষ্টি আর প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, দুই বা সাত বছর পরপর তৈরি হয়) তৈরি হলে বিশ্বের অন্যান্য এলাকায় একযোগে ঝড়ের প্রবণতা অনেক কমে যাবে।’

গবেষকরা বলছেন, ২০১৭ সালের তুলনায় এই বছর ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। ছবি: সংগৃহীত
গবেষকরা বলছেন, ২০১৭ সালের তুলনায় এই বছর ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে ঝড় তৈরি হয়

সমুদ্রের উষ্ণ পানির কারণে বায়ু উত্তপ্ত হয়ে হঠাৎ করে এসব ঝড়ের তৈরি হয়। তখন তুলনামূলক উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে যাওয়ার কারণে উপরে উঠে যায়। আর উপরের ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আসে। এতে নিচের বায়ুমণ্ডলের চাপ কমে যায়। তখন আশপাশের এলাকার বাতাসে তারতম্য তৈরি হয়। সেখানকার বাতাসের চাপ সমান করতে আশপাশের এলাকা থেকে প্রবল বেগে বাতাস ছুটে আসে। আর এ কারণেই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়ের।

এ কারণে প্রবল বাতাস ও স্রোতের তৈরি হয়। যখন ঝড়টি ভূমিতে চলে আসে, তখন বন্যা, ভূমিধস বা জলোচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

সাইক্লোন, হ্যারিকেন আর টাইফুনের মধ্যে পার্থক্য কী

এর সবগুলো ঝড়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন আটলান্টিক, ক্যারিবিয়ান সাগর, মধ্য ও উত্তরপূর্ব মহাসাগরে এসব ঝড়ের নাম হ্যারিকেন। উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সেই ঝড়ের নাম টাইফুন। বঙ্গোপসাগর, আরব সাগরে এসব ঝড়কে ডাকা হয় সাইক্লোন নামে।

যদি কোনো নিম্নচাপ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি আঞ্চলিক ঝড় বলে মনে করা হয় এবং তখন সেটির নাম দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি যদি ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটার (৭৪ মাইল) গতিবেগ অর্জন করে, তখন সেটি হ্যারিকেন, টাইফুন বা সাইক্লোন বলে ডাকা হয়।

এগুলোর পাঁচটি মাত্রা হয়েছে। ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করলে সেটির সর্বোচ্চ ৫ মাত্রার ঝড় বলে মনে করা হয়। তবে অস্ট্রেলিয়া ঝড়ের মাত্রা নির্ধারণে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে।

ঝড়ের নামকরণ কীভাবে হয়

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি একেকটি ঝড়ের নামকরণ করে। যেমন: ভারত মহাসাগরের ঝড়গুলোর নামকরণ করে এই সংস্থার আটটি দেশ। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ওমান।

এসব দেশের প্রস্তাব অনুসারে একটি তালিকা থেকে একটির পর একটি ঝড়ের নামকরণ করা হয়। যেমন: তিতলির নামকরণ করেছে পাকিস্তান। থাইল্যান্ডের প্রস্তাব অনুসারে এর পরের ঝড়টির নাম হবে ‘গাজা’।

আরো সংবাদ...