মুক্তমত

উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ ও বায়ুদূষণ

ঢাকা , নভেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

মাটি, বায়ু, পানি— জীবনধারণের এ তিন মূল্যবান উপাদানকে কেন্দ্র করেই আমাদের জীবনচক্র চলতে থাকে। খাদ্য, সুপেয় পানি এবং নির্মল বাতাস জীবনে প্রশান্তি এনে দেয়। সুন্দর, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য এ তিনটির বিকল্প নেই।

ফলে, এ তিনটি উপাদানের একটিও যদি দূষণের শিকার হয় তাহলে তা জনস্বাস্থ্যের উপরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে। পরিবেশের সাথে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি একেবারে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত হওয়ায় এ দূষণের হাত থেকে বাঁচতে তাই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা কি বাস্তবে সেভাবে সতর্ক আছি?

 উন্নয়ন যজ্ঞ মানুষ এখন আর উপভোগ করতে পারছে না। কোনো একটা ভালো কাজও শুরু হলে মানুষ আশায় দিন গুণতে থাকে কবে এ কাজ শেষ হবে! তার মানে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলাকালীন সময়ে মানুষকে যে আরাম দেয়া যেতে পারে যেন সে এ কাজটা উপভোগ করতে পারে সেখানে আমাদের সদিচ্ছার ঘাটতি আছে 

দখলে আর দূষণে আমাদের জীবন এখন অসহায়। শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, পুরো পরিবেশের উপরেই এ দখল আর দূষণ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে প্রতিনিয়তই। শহরাঞ্চলে এ দূষণের মাত্রা ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, শুধুমাত্র বায়ুদূষণের শিকার হয়ে ২০১৫ সালে আমাদের দেশে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আর এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই প্রাণ হারিয়েছে প্রায় এক চতুর্থাংশের বেশি (১৮ হাজার) মানুষ। অভিজ্ঞতা বলছে, এতদিনে তা হয়ত আরো ভয়াবহ হয়েছে।

বায়ুদূষণের মাত্রা সারা দেশব্যাপী বাড়ছে। তবে রাজধানীতে তা ব্যাপক। অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ গাছপালাহীন ইট-পাথরের এ নগরীকে রীতিমতো বিষাক্ত নগরীতে পরিণত করেছে। বাতাসে এখন ধুলার পরিমাণ এতই বেশি যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে- এই যে আমাদের দেশে এখন তরুণ প্রজন্ম হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের শিকার হচ্ছে- এর জন্যও নাকি বায়ুদূষণ অনেকাংশে দায়ী। শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ক্যান্সার, ফুসফুসের নানাবিধ রোগের জন্য তা দায়ী তো বটেই। তরুণ সমাজের পাশাপাশি বৃদ্ধ এবং বাচ্চারা এ বায়ুদূষণের নির্মততার শিকার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

অল্পতেই এখন আমরা হাঁপিয়ে উঠছি। আমাদের জীবনশক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। মাথাব্যথা, পড়ালেখায় অমনোযোগিতার জন্য শব্দদূষণের সাথে সাথে বায়ুদূষণও দায়ী। একদম নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে যাচ্ছে আগ্রাসী এ দূষণ।

ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, যতটা আগ্রাসী এ দূষণের যাত্রা ততটা আগ্রাসী নয় আমাদের প্রতিরক্ষা এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থা। দিনকে দিন গাছপালা উজাড় হচ্ছে। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা হওয়ায় বাতাসে ধুলোবালু মিশে যাচ্ছে। পুরো দেশ জুড়ে বিশেষ করে ঢাকা শহরকে ঘিরে এই যে এত এত ইট ভাটা তার থেকে প্রতিদিন বের হওয়া ধোঁয়া বাতাসে মিশছে টন কে টন। বাতাসকে করে তুলছে বিষাক্ত।

আর আমাদের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সেটাও যেন এখন আমাদের গলার কাটা। উন্নয়ন যজ্ঞ মানুষ এখন আর উপভোগ করতে পারছে না। কোনো একটা ভালো কাজও শুরু হলে মানুষ আশায় দিন গুণতে থাকে কবে এ কাজ শেষ হবে! তার মানে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলাকালীন সময়ে মানুষকে যে আরাম দেয়া যেতে পারে যেন সে এ কাজটা উপভোগ করতে পারে সেখানে আমাদের সদিচ্ছার ঘাটতি আছে। ভাবখানা এমন যেন উন্নয়নের এ সুফল পেতে হলে মুখ বুজে যা হচ্ছে তা সয়ে যেতে হবে।

একটা উদাহরণ দিই তাহলে আমার কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই যে ধরুন মেট্রোরেল প্রকল্প। কী সুন্দর একটা কাজ হচ্ছে, তাই না? এ কাজ শেষ হলে ঢাকা নগরীতে চলাচল করা মানুষের জীবন অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। যানজট কমবে। ফলে মানুষের যাতায়াতে একটা স্বস্তি আসবে। দিনরাত এ কর্মযজ্ঞ চলছে দ্রুতগতিতে।

কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের মিরপুর অংশে যে ধূলিঝড় প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে তা এক কথায় ভয়াবহ! এখানকার বাতাসে ধুলা আর ধুলা। এই হারে ধুলা যদি প্রতিনিয়ত আমাদের শ্বাসনালীতে ঢুকতে থাকে তাহলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট হতে কি খুব বেশি সময় লাগবে? অথচ, গাড়ি চলাচলের রাস্তা যদি কার্পেটিং করে সুন্দর রাখা যেতো তাহলে এ পথের যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের কতই না সুবিধা হতো! এ প্রকল্প শেষ হতে সময় বেশি লাগলেও মানুষ তা হাসিমুখে মেনে নিতো।

আর এখন দ্রুতগতিতে কাজ চলছে তবুও পথচলতি মানুষসহ প্রকল্প এলাকার মানুষের ভেতরে একটা বিরক্তি তৈরি হচ্ছে। তারা এ উন্নয়ন যজ্ঞে মানসিকভাবে নিজেদেরকে সামিল করতে পারছে না শুধুমাত্র ভয়াবহ বায়ুদূষণের কারণে। এত একটা ভালো প্রকল্প, এত এত টাকার প্রজেক্ট অথচ কাজ চলাকালীন সময়ে সংকুচিত হয়ে পড়া যানচলাচলকারী রাস্তাটা ঠিক রাখতে স্বল্প পরিমাণ টাকা ব্যয় করা কি খুব অসাধ্য কাজ? এ কাজের দায়ভার কার সেটা নিয়েও চলে ঠেলাঠেলি। কোনো কর্তৃপক্ষ এককভাবে স্বীকার করে না যে এ দায় তাদের। এই হচ্ছে অবস্থা।

বায়ুদূষণের কবল থেকে দেশবাসী বিশেষ করে শহরের মানুষকে মুক্ত করতে না পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য তা মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে। নানা ধরনের প্রাণঘাতি রোগের উপদ্রব বাড়বে। মানুষ হয় মারা যাবে ধুকে ধুকে; না হয় নানা ধরনের রোগব্যাধির শিকার হয়ে তা সারাতে চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবে।

আর্থিক ব্যয় বাড়বে। ফলে সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বায়ুদূষণের কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সরকারকেই সবার আগে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ মানুষ যেন উপভোগ করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এ দূষণ দিনকে দিন আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

আরো সংবাদ...