মুক্তমত

নির্বাচনী সংলাপ

ঢাকা , নভেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

গত বৃহস্পতিবার গণভবনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলের ২৩ নেতার সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২০ নেতার যে সংলাপ হলো সেটি শুরুর শেষ, না শেষের শুরু, এখনই  বলা যাবে না। অন্যান্য দলের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসতে রাজি হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার যুক্তফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে তাঁর সংলাপ হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এই সংলাপ চলবে আরও কয়েক দিন।

যেকোনো সমস্যা বা সংকট উত্তরণে আলোচনাই উত্তম পথ। সংলাপের বিকল্প হলো সংঘাত, হানাহানি; যা দেশবাসী ২০১৪-১৫ সালে প্রত্যক্ষ করেছে এবং এর পুনরাবৃত্তি কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে চলমান সংলাপকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতে চাই। প্রথম দিনের সংলাপে দুই পক্ষের মধ্যে যতই ব্যবধান থাকুক না কেন, তারা উভয়ই  একাদশ সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা প্রস্তাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে, সেগুলো তুলে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে বিরোধীদের আশ্বস্ত করেছেন।

আইনানুগভাবে নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের হাতে যথেষ্ট লোকবল নেই যে ৩০০ আসনে নির্বাচন করতে পারবে। এ কারণেই ইসিকে জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয়। নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ দেখেছি, কমিশন সবকিছু দেখেশুনেও কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

স্বৈরাচারী আমলে ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এ কারণে যে তখন যাঁর ভোট তিনি দিতে পারতেন না। এখন গণতান্ত্রিক শাসনামলে যদি সেই স্লোগান ফিরে আসে, সেটি ক্ষমতাসীনদের জন্য মোটেই গৌরবের কথা নয়। সংলাপে সর্বোচ্চ মহল থেকে যখন আশ্বস্ত করা হলো যে রাজনৈতিকভাবে কাউকে হয়রানি করা হবে না, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে না, সেদিনই বিরোধী দলের ১৮৪ জন নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন ব্যক্তিকেও নাশকতার মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি কীভাবে নাশকতা ঘটান?

নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কী হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা। যেখানে সরকারি দলের নেতারা যেকোনো সরকারি ও দলীয় অনুষ্ঠানে সরকারি প্রচারযন্ত্রে ইচ্ছেমতো নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন, সেখানে বিরোধী দল রাস্তায় নামলেই গ্রেপ্তার–হয়রানির শিকার হওয়া শুধু নির্বাচনী পরিবেশের অন্তরায় নয়; গণতান্ত্রিক রীতিরও পরিপন্থী। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে হলে সবার জন্য মাঠ সমতল রাখা জরুরি এবং সেটি করতে হবে তফসিল ঘোষণার আগেই।

 বাংলাদেশে একটি সংসদ রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ২০১৪ সালেই ঘটেছে। আগের সব নির্বাচন হয়েছে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর। সরকারের দাবি, তারা দেশে প্রভূত উন্নয়ন করেছে এবং সেই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা চায়। নিজের প্রতি সরকার যদি এতই আস্থাশীল হয়, তাহলে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে আপত্তি কোথায়? সরকার বলেছে, সংবিধানের বাইরে তারা যাবে না। সংবিধানের ভেতরে থেকেই যে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা সম্ভব, তা সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও বলছেন। বিরোধী দলের অনেক ছাড়ের পর সরকারের কাছে এটুকু ছাড় আশা করা নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না।

আরো সংবাদ...