মামলা, গ্রেপ্তার, দণ্ড এবং অস্বাভাবিকতা

0
36

ঢাকা , ০৬ ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

১৯৭১ থেকে ২০১৮–এর ডিসেম্বর। বাংলাদেশ ৪৭টি বছর অতিক্রম করে ৪৮-এ পা রাখতে যাচ্ছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বেদনা বুকে করেই বরাবরের মতো আমরা বড় গৌরবে আমাদের বিজয় দিবস পালন করব। এবার ডিসেম্বর জাতির জীবনে এসেছে আরও এক নতুন মাত্রা নিয়ে। ৩০ ডিসেম্বর এবার বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতায় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই, বিশেষত যেখানে গণতন্ত্র মোটামুটি কার্যকর থেকেছে, সেখানকার জনজীবনে নির্বাচন একটি সহজ ও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকে। আমাদের মতো দেশগুলোতে, যেখানে গণতন্ত্র এখনো গভীরভাবে শিকড় গাড়তে পারেনি, সেখানে নির্বাচন ঘিরে যেন অনেক বেশি আশা-নিরাশা, প্রত্যাশা-হতাশা, উৎসাহ আর উত্তেজনার সঙ্গে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত হতেও প্রত্যক্ষ করি।

আমার ব্যক্তিগত ধারণা, নির্বাচন যে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এত ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হয়, তার প্রধান কারণ, মাত্র ওই একটি দিনই তাঁরা তাঁদের নাগরিক পরিচয়টার সন্ধান পান। আর সারাটা সময় নীতিনির্ধারকদের কাছে তেমনভাবে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ পান না। ওই একটি দিন নারী-পুরুষভেদে তাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের মর্যাদার স্বাদ পান। তাঁরা দেশ পরিচালনার জন্য তাঁদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার মহান দায়িত্বটি পালন করে থাকেন। তাই নির্বাচন জনগণের জন্য এক উদ্যাপনের দিন হয়ে আসে। তারপরও প্রশ্ন জাগে, তাহলে নির্বাচন দল-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সবার কাছে অবিমিশ্র উদ্দীপনার কারণ হয়ে ওঠে না কেন? তার একটি স্পষ্ট কারণ হচ্ছে, নির্বাচনে এখনো আমাদের দেশে সবার জন্য সমান সুযোগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তদুপরি বাংলাদেশে একাদশ নির্বাচনে এবার যে অভূতপূর্ব বিষয়টি যুক্ত হয়েছে তা হলো ক্ষমতাসীন জোট যে শুধু সংসদ বজায় রেখে সংসদবহির্ভূত অন্য দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে তা নয়, মন্ত্রিসভাও পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় রেখে দিয়েছে, যাঁরা দৃশ্যত ‘প্রশাসনিক সৌজন্য’র সুবিধা ত্যাগ করেননি।

অন্যদিকে যে ধরপাকড় চলছে অপরাধ দমনের নামে, দেখা যাচ্ছে সেখানে গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই বিরোধী জোটের সদস্য। এটা মেনে নেওয়া কষ্ট যে বিরোধী জোটের এত অধিকসংখ্যক সদস্য বা সমর্থকই সব অপরাধ সংঘটন করে চলেছেন। অথচ তেমনটাই বিশ্বাস করানোর একটা প্রয়াস চলে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে। মামলা দেওয়া, গ্রেপ্তার, অত্যধিক দ্রুততার সঙ্গে দণ্ড প্রদান—সবকিছুতে একটা অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের সময় অকুস্থলে অনুপস্থিত, এমনকি সেই সময় আর জীবিতই ছিলেন না, এমন মানুষের নামেও মামলা দেওয়া হচ্ছে, যা ‘গায়েবি মামলা’ হিসেবে আমাদের শব্দভান্ডারে জায়গা পেয়েছে। অজানা ব্যক্তিদের নামে করা মামলায়ও অবধারিতভাবে বিরোধী জোটের সদস্যরাই অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন। বিরোধী জোটের হিসাবে তফসিল ঘোষণার পর তাদের প্রায় ৭০০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার-আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে, আবার কেউ কেউ দৌড়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন আইন-আদালতে। নির্বাচন কমিশন বা পুলিশ কারও কাছ থেকেই কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না তাঁরা। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা সেই নীতির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানাই। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এহেন অপব্যবহার জনগণের ভোটাধিকারকেই খর্ব করে।

সুলতানা কামাল: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা