আমাদের অভিবাদন, আমাদের শ্রদ্ধা

0
36

ঢাকা , ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

খুব অল্প দিনের ব্যবধানে আমাদের দুজন প্রিয় মানুষ চলে গেলেন—কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন এবং চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র সম্পাদক সাইদুল আনাম টুটুল। দুজনই চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ছিলেন। দুজনই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, দুজনের কেউই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হননি এবং কখনো সনদপত্র নেওয়ার চেষ্টা করেননি। প্রিয়জন চলচ্চিত্রকার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাই বলেছেন, টুটুল ভাই সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়ে তৎপর হয়েছিলেন। কিন্তু কাজটি সম্পন্ন করার জন্য তিনি সময় পাননি।

মুক্তিযোদ্ধার সনদ না থাকায় তাঁদের গার্ড অব অনার দেওয়া হয়নি। আনোয়ার ভাইয়ের জন্য এটা নিয়ে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চেষ্টাই ফলপ্রসূ হয়নি। সনদপত্র না থাকলে রাষ্ট্র গার্ড অব অনার দেবে না—এটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। আমরা অবশ্যই আমাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। আইন যেহেতু হয়েছে আর তা সবার জন্যই সমান। আমরা আবেগপ্রবণ মানুষ। আমরা চাই আমাদের প্রিয়জন তাঁদের প্রাপ্য সম্মান নিয়েই সমাহিত হোন। আমাদের এই আবেগ অবশ্যই শুদ্ধ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় আইনগত বাধ্যবাধকতাও আমাদের মেনে নিতেই হবে। আমরা মেনেও নিয়েছি।

তবে আমাদের মতো করে আমরা এর একটি প্রতিবাদও জানাতে চেয়েছি। চেয়েছি আমাদের প্রিয় কীর্তিমান অগ্রজদের সম্মান আর মর্যাদা যেন আমরা প্রদান করতে পারি। এই চিন্তা তৈরি হয়েছিল আনোয়ার হোসেন ভাইয়ের অন্তিম বিদায়ের ক্ষণে। সে সময়ে আমরা জেনেছিলাম, রাষ্ট্রীয় আইনগত বাধ্যবাধকতায় তিনি গার্ড অব অনার পাবেন না। কারণ, তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনো সনদপত্র গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তার প্রমাণ তো দেশে স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরে প্রকাশিত সব সরকারি ক্রোড়পত্রেই থাকে। প্রতিবছর এসব ক্রোড়পত্রে আনোয়ার হোসেনের ধারণকৃত ১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনের আলোকচিত্র প্রকাশিত হয়। যুদ্ধ যখন চলছিল, তখন ক্যামেরা হাতে এসব আলোকচিত্র যিনি ধারণ করেছেন, তিনিও মুক্তিযোদ্ধাই হন। তাঁর যুদ্ধও তো কম সাহসী কাজ ছিল না।

তাহলে আমরা কি তাঁকে সম্মান জানাব না? আমরা ভেবেছি, অবশ্যই জানাব। আর তা সবাই মিলেই জানাব। সম্মিলিতভাবে। সেই ভাবনাতেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে জাতির পক্ষ থেকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের সব আয়োজন শেষে আমরা আমাদের গর্ব জাতীয় পতাকা দিয়ে আনোয়ার হোসেনকে আচ্ছাদিত করে সবাই সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত গেয়ে আমাদের অন্তিম ও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।

জাতীয় পতাকা দিয়ে আনোয়ার হোসেনকে আচ্ছাদিত করেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাইয়ের নেতৃত্বে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এই দায়িত্ব সবচেয়ে মর্যাদার হয়, যখন তা অপর আরেকজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে হয়। সহযোদ্ধার কাছ থেকে সম্মানিত হওয়ার চেয়ে গৌরবের আর কীই–বা হতে পারে। আনোয়ার হোসেন ভাইয়ের মরদেহকে জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করে আমরা সবাই বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে যখন সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত গাইছিলাম, তখন কী এক অসাধারণ অনুভূতি হয়েছিল, তা কেমন করে ভাষায় প্রকাশ করি! দেশের প্রতি গভীর তীব্র আবেগে জাতীয় সংগীতের প্রতিটি শব্দ আমাদের হৃদয়কে আকুল করে তুলেছিল। আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। অশ্রু যেন হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে শান্ত করে দিচ্ছিল সব অনুচ্চারিত দ্রোহ আর শোক।

গত ২০ ডিসেম্বর সাইদুল আনাম টুটুল ভাইকেও আমরা আমাদের অন্তিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় জানিয়েছি। আমরা টুটুল ভাইয়ের সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাই এবং রাইসুল ইসলাম আসাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে টুটুল ভাইয়ের মরদেহ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করে তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জ্ঞাপন করেছি। সেদিন তাঁকেও মাঝখানে রেখে আমরা সবাই বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত গেয়ে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।

এই অন্তিম শ্রদ্ধা ও অভিবাদন আমাদের হৃদয়কে ভারমুক্ত করেছে, যে ভার আমাদের আবেগমুক্ত আইন আমাদের হৃদয়ে চাপিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকারের নানা আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, কিন্তু একজন মানুষ, যিনি তাঁর সারাটা জীবন দেশের জন্য, দেশের সংস্কৃতির শুদ্ধ চর্চার জন্য, দেশের শিল্পভুবনের নবতর সৃষ্টির জন্য উৎসর্গ করে গেছেন, তাঁকে এই অন্তিম অভিবাদনটুকুও যদি আমরা জানাতে না পারি, তবে আমরাই–বা কতখানি শুদ্ধতার দাবি করতে পারি?

আমরা বিশ্বাস করি, দেশের পতাকার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয় হয় না। জাতীয় সংগীতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো অভিবাদন হয় না। আমাদের জাতির কীর্তিমান মানুষের অন্তিম বিদায়ক্ষণে আমরা আমাদের হৃদয় দিয়ে কেবল এটুকুই করতে পারি। এই আমাদের হৃদয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার, যা আমাদের দিয়েছেন আমাদেরই অগ্রজরা। আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা মূর্ত হয় আমাদের জাতীয় পতাকায়, জাতীয় সংগীতে। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য যিনি জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁকে সম্মান জানাতে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় আর কিছুই হতে পারে না। তাই এটাই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, এটাই আমাদের অভিবাদনের স্মারক!