নির্বাচন আমাদের জন্য উৎসব নয়, শঙ্কার : রানা দাশগুপ্ত

0
52

ঢাকা , ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

নির্বাচন পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান নিয়ে প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কী ভাবছে?


রানা দাশগুপ্ত: 
এবারে যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটি যে ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো হবে না, এটাকে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য একটা ইতিবাচক দিক বলে মনে করি। এবার যে নির্বাচনী পরিবেশে উত্তরণ ঘটেছে, এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে। এ জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের প্রাজ্ঞ ভূমিকার কারণে এই পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই পরিবেশ নিশ্চিত রাখার দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের, তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সর্বাধিক। এই পরিবেশে ভোটাররা যদি অবাধে ভোট দিতে পারেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

কিন্তু এই পরিবেশের মধ্যেই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে আপনারা কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

রানা দাশগুপ্ত: আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি নির্বাচনের সময় আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে।

কী উদ্বেগ?

রানা দাশগুপ্ত: স্বৈরাচারী এরশাদের পর আমরা আশা করেছিলাম, দেশ তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়…।

তিন জোটের রূপরেখা বিষয়টা কী? কী ছিল সে রূপরেখায়?

রানা দাশগুপ্ত: স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮–দলীয় জোট, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭–দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫–দলীয় জোট—এই তিন জোট কতগুলো বিষয়ে একমত হয়ে একটা রূপরেখা হাজির করেছিল। রাষ্ট্র ও রাজনীতি কোন পথে পরিচালিত হবে, এ বিষয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে ভাবনা কাজ করেছিল, তিন জোটের রূপরেখায় তা–ই ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই ভাবনাটা কী?

রানা দাশগুপ্ত: বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সব জাতি–গোষ্ঠী–সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে, ধর্মের কারণে কেউ বৈষম্য–বঞ্চনার শিকার হবে না। সংক্ষেপে, একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন কাজ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের মুহূর্তেও আমাদের মনে হয়েছিল, এটা আমাদের দ্বিতীয় বিজয়। তিন জোটের রূপরেখায় সেটাই ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭–দলীয় জোট ভোটের প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক বিষয় টেনে আনল। বিএনপি বলতে লাগল, নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ জেতে তাহলে মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। এ রকম সাম্প্রদায়িক প্রচারণার ফলে যে ক্ষেত্রটি হলো, সেখানে দেখা গেল নির্বাচনের পর একটানা ২৭ দিন ধরে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর টার্গেট করে হামলা চালানো হলো। তারপর ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির এক নেতা টেলিভিশনে শাবাশ বাংলাদেশ নামের এক অনুষ্ঠানে এক হাতে কোরআন আরেক হাতে গীতা নিয়ে জনগণের উদ্দেশে বললেন, আপনারা কোনটা চান? অর্থাৎ নির্বাচনের আগে আমরা একধরনের সাম্প্রদায়িক প্রচারণা লক্ষ করি। ফলে একধরনের সাম্প্রদায়িক বিভেদের পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। তারপর ২০০১ সালের নির্বাচনে যে বিএনপি–জামায়াত সরকার গঠিত হলো, তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে এমন কোনো জেলা ছিল না, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হামলা করা হয়নি।

আর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে?

রানা দাশগুপ্ত: ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর যে সরকারটি গঠিত হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আমরা আশা করেছিলাম, এই সরকারের আমলে আগের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু এই সরকারের আমলেও ধর্মীয়, জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর টার্গেট করে হামলা করা হয়েছে। সেসব হামলা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখিনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও উসকানি দেওয়া হয়েছে। যারা উসকানি দিয়েছে, যারা হামলাগুলো করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর এসব হামলার বিষয়ে আপনাদের প্রতিক্রিয়া কী?

রানা দাশগুপ্ত: আগে আমরা ভেবেছিলাম, স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একতরফাভাবে এসব হামলা চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হ্রাসকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এটা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, যে লক্ষ্যটি আমরা দেখেছিলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু এবারে আমরা লক্ষ করলাম রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পাবনার সাঁথিয়া ইত্যাদি স্থানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের একাংশ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও লুটপাটে অংশ নিয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে দলে অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে, হাইব্রিড ঢুকেছে, এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ‘কাউয়া’ শব্দটি উচ্চারণ করে বলেছেন, দলে কাউয়া ঢুকেছে। কিন্তু এই অনুপ্রবেশকারী কারা, হাইব্রিড কারা, কাউয়া বলতে কাদের বোঝানো হলো, আমরা তা জানতে পারলাম না। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো, তাহলে আমরা স্বস্তি পেতাম।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা তো ফৌজদারি অপরাধ। হামলার ঘটনা অনেক ঘটে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে মামলা, বিচার, শাস্তির কথা সাধারণত শোনা যায় না। এটা কেমন?

রানা দাশগুপ্ত: এসব ঘটনায় সাধারণত মামলা নেওয়া হয় না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর যেসব হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো মামলা নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই হামলার ঘটনাগুলো তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। শাহাবুদ্দিন কমিশন নামের সেই কমিশনের কাছে প্রায় ১৫ হাজার ঘটনার তথ্য–উপাত্ত দেওয়া হয়েছিল। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ঘাতক–দালাল নির্মূল কমিটি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নারী প্রগতি সংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন তথ্য–উপাত্ত দিয়েছিল। ১৫ হাজার ঘটনার মধ্যে ৫ হাজার ঘটনার তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে শাহাবুদ্দিন কমিশন ২০১২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের কাছে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। আমরা খুশি হতে পারতাম, যদি সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো এবং সেটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হতো। তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে জাতি উদ্ধার পেত।

হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছিল বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের আমলে, আর তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে তাদের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এই সরকার সেটি প্রকাশ করেনি কেন?

রানা দাশগুপ্ত: সেটা তো আমাদেরও প্রশ্ন। এই সরকার তো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের সরকার, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সরকার। এই সরকার কেন বিএনপি–জামায়াত সরকারের আমলের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি, এটা ভেবে আমরা বিস্ময়ে হতবাক হই। আমরা মনে করি, যদি তা করা হতো তাহলে পরবর্তী কালে, অর্থাৎ ২০১১ সাল থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর যেসব হামলা–নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অনেকটাই হয়তো এড়ানো যেত। জনগণ জানতে পারত ওই দুর্বৃত্তরা কারা। যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়, তাদের বিরুদ্ধে যদি আইন প্রয়োগ করা না হয়, তারা যদি আইনের বাইরে থেকে যায়, তাহলে তাদের দুর্বৃত্তপনা আরও বেড়ে যায়। তারা দেশের পরিস্থিতি অশান্ত করার উদ্দেশ্যেও এসব করতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে বলুন।

রানা দাশগুপ্ত: নির্বাচন অনেকের কাছে উৎসব, কিন্তু আমাদের কাছে শঙ্কা, উদ্বেগ ও হাহাকারের সময়। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এটা বলছি। প্রতিটি নির্বাচনের পর এই দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যায়। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে জনসংখ্যার পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে সেটাই দেখা যায়। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ছিল ১৯–২০ শতাংশ, কমতে কমতে ২০১১ সালে নেমে আসে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে।

এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক কোনো প্রচারণা এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। কিন্তু আপনারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আপনাদের উদ্বেগ কি তথ্যভিত্তিক?

রানা দাশগুপ্ত: আমরা তো ঘরপোড়া গরু। তাই এই উদ্বেগ। তা ছাড়া, আমরা খবর পেয়েছি, প্রায় ২০টি পরিবার দেশ ছেড়েছে। তারা যে স্থায়ীভাবে চলে গেছে, তা নয়। নির্বাচনের সময় বিপদ হতে পারে—এই শঙ্কায় গেছে এবং তারা নির্বাচনের ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেবে, তারা আর ফিরে আসবে কি না।

নির্বাচনের আগে–পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আপনারা কোনো দাবি পেশ করেছেন?

রানা দাশগুপ্ত: আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘুর ক্ষমতায়ন, সাংবিধানিক বৈষম্য বিলোপকরণ, দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছি। আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম, কমিশন আমাদের বলেছে, এবারে অতীতের ঘটনা ঘটবে না। আমরা বলেছি, নির্বাচন কমিশন তো অতীতেও একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তারা তো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তবে এবারে নির্বাচন কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা জারি করেছে, যাতে নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। র‍্যাব, থানা–পুলিশ কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছে। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কিছু কমিটি গঠন করছে। অতীতের নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে আমরা এই পদক্ষেপগুলো দেখিনি। এটা ইতিবাচক। তবে কাগজে–কলমে করলেই হবে না, পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেদিকে এখন থেকেই লক্ষ রাখতে হবে।

সূত্রঃ প্রথম আলো