সিইসি-কামালের উত্তপ্ত বিতর্ক, বৈঠক বয়কট

0
32

ঢাকা , ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস২৪):

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে পূর্ব নির্ধারিত এক বৈঠকে তারা তিক্ত-বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। কামাল হোসেন পুলিশের আচরণ নিয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য উপস্থাপন করেন; কিন্তু সিইসি তার বক্তব্যে বিরোধিতা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে দাবি করলে বৈঠক বয়কটে রূপ নেয়।

এরপরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিচে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ভিতরে উচ্চবাক্য বিনিময় হয়েছে। সিইসির তিক্ত বক্তব্য ছিল অবজ্ঞাজনিত, অভদ্রজনিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত নির্বাচন কমিশনার মোঃ রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, সিইসির সঙ্গে বক্তব্যের সময়ে কামাল হোসেন টেবিল চাপড়ে উচ্চস্বর কথা বলেছিলেন। তিনি এত উচ্চস্বরে এবং টেবিল চাপড়ে কথা বলছিলেন যে, তাদের দুজনের মধ্যে কি ধরনের কথা হয়েছিল তা শোনাই যায়নি।

বৈঠকে সূত্র জানা যায়, দুপুর ১২টায় শুরু হওয়া বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আব্দুল মঈন খান এবং গণফোরামের মহাসচিব মোস্তফা মহসিন মন্টু তাদের প্রচারে হামলার বিবরণ দেন। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনও বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। পুলিশকে উদ্দেশে করে বক্তব্য প্রদানের এক সময়ে কামাল হোসেন বলেন, পুলিশ সর্বত্র লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের লোকজন আইসিইউতে, মারধর করা হচ্ছে নেতাকর্মীদের। এক পর্যায়ে সিইসি জানতে চান, কোথায় পুলিশ বাধা দিচ্ছে, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে? তিনি তাকে সেখানে নিয়ে যেতে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বলেন। সিইসি বলেন, পুলিশ স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে; আপনাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তখন ড. কামাল সিইসির উদ্দেশে বলেন, সিইসি হলেন বিচারকের ভূমিকায়। বিচারক সাক্ষ্য নেবে। নিজে সাক্ষী হবে না। কিন্তু সিইসি হিসেবে আপনি পুলিশের পক্ষ নিচ্ছেন। চলেন আপনাকে নিয়ে যাবো।

এক পর্যায়ে ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা রক্ষায় সিইসিকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান। কামাল হোসেন বলেন, প্লিজ দেশটাকে বাঁচান, আপনার হাত ধরি, প্রয়োজনে পা ধরবো। এক পর্যায়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, কিছু পুলিশ সদস্য জানোয়ারের মতো আচরণ করছেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সিইসি নূরুল হুদা। তিনি কামালের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি পুলিশকে জানোয়ার বলছেন কেন? আপনি জানোয়ার বলতে পারেন না।’ এ সময় ড. কামাল হোসেনকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। কামাল হোসেনকে উদ্দেশে করে তিনি বলেন, ‘আপনি নিজেকে কী মনে করেন?’ জবাবে কামাল হোসেন বলেন, তাহলে আপনি কি চান আমরা চলে যাবো? সিইসি বলেন, যান। তখন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বৈঠক ত্যাগ করেন।

বৈঠক শেষে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিইসি কামাল হোসেনকে অ্যাটাক করে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আপনি পুলিশের কিছু সদস্যকে লাঠিয়াল বাহিনী এবং জানোয়ারের মতো ব্যবহার করছেন বলে বলছেন। সিইসি বলেন, আমাকে নিয়ে দেখান কোথায় পুলিশ বাধা দিচ্ছে। এখন কী করে দেখাবো। আমরা বলছি লোক পাঠান। তিনি বলেন, আমাকে নিয়ে চলেন। তিনি শুরুই করলেন, পুলিশ মোটেই লাঠিয়াল না। পুলিশকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে হি ওয়াজ রিয়েলি অ্যাগ্রেসিভ। কামাল হোসেনকে বলেছেন, আপনি নিজেকে কী মনে করেন? কামাল হোসেনকে অ্যাটাক করায় আমরা খুব আপসেট। কমিশনের পক্ষে বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মোঃ রফিকুল ইসলাম, ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বয়কট শেষে ঐক্যফ্রন্টের ব্রিফিং

বৈঠক বর্জন করে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। বিএনপির মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, সারাদেশে নির্বাচনে যে ভয়াবহ তাণ্ডব চলছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, আক্রমণ, আহত করা, হত্যা করা হচ্ছে এবং নির্বাচনের পরিবেশ যে বিনষ্ট করা হচ্ছে সে সব ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানাতে এসেছিলাম। গত সোমবার থেকে সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশের যেভাবে অবনতি হয়েছে তাতে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন এসে গেছে, নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কি না। রিটার্নিং কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও পরিস্থিতি তারা সিইসিকে বলেছেন। কিন্তু সিইসির আচরণ দেখে মনে হয়েছে তিনি এতে গুরুত্ব দেননি।

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর হামলার বর্ণনা দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ড. মঈন খান এখানে আছেন, তার পিএস আইসিইউতে। গাজীপুরে আমাদের মিলন (ফজলুল হক মিলন) সাহেব, তাকে তফসিল ঘোষণার পর জেলে নেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী নির্বাচন পরিচালনা করছিলেন। তিনি হামলায় আহত হয়ে আইসিইউতে আছেন। আমাদের এখানে মির্জা আব্বাস আছেন। কতবার তার ওপর, আফরোজা আব্বাসের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছে। বিষয়টা হচ্ছে, উদ্দেশ্যটা কী? ‘সরকার, নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে এ নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ তারা সৃষ্টি করতে পারছে না। যদি বলি ব্যর্থ হয়েছে, তা হলে ঠিক বলা হবে না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে তারা ব্যর্থ করছে, যেন এটা (নির্বাচন) বানচাল হয়ে যায়। ঢাকা শহরে মনে হয় না কোনও নির্বাচন হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী আছে বলেই তো মনে হয় না। নির্বাচন কমিশন ও সরকার এ নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কী করা দরকার।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, কামাল হোসেন সাহেব প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, পুলিশ সর্বত্র লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। মওদুদ বাড়িতে আছে। বাড়ির সামনে গাড়ি আটকে দেয়া হয়েছে, যাতে বের হতে না পারে। বলা হচ্ছে সিকিউরিটি। এটা কী ধরনের সিকিউরিটি, আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেবেন না।

ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, উনি (সিইসি) ওপরের কারও নির্দেশনায় কাজ করছেন। তারা চাইছে, আমরা যেন বলি এনাফ ইজ এনাফ, আমরা চলে গেলাম। আমাদের বাধ্য করতে চাইছে। এটা কখনও হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের কার্যক্রমকে আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা বাধ্য হয়ে ওয়াকআউট করে চলে এসেছি।’

বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ঐক্যফ্রন্ট সভা করে এ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এবার ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেয়া হবে না। এ সময় জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা থাকবোই।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, তারা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন সিইসি তাদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ইসির নিয়ন্ত্রণে। সেনাবাহিনীকে ক্যাম্পে রেখে, পুলিশ দিয়ে অত্যাচারটা বাড়ানো হয়েছে, এটা আসলে সেনাবাহিনীকে হেয় করার চক্রান্ত কিনা, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

আরও পড়ুনঃ সিইসির পদত্যাগ দাবি ঐক্যফ্রন্টের

ড. মঈন খান অভিযোগ করেন, ১১ তারিখ আমার শান্তিপূর্ণ গণসংযোগে আক্রমণ হয়েছে। ১৬ তারিখ আক্রমণ হয়েছে। এরপর গতকাল (সোমবার) আবার আক্রমণ হয়েছে। আমি প্রধান নির্বাচন কমিশারকে স্পষ্ট করে বলেছি আমার তো ৭২ বছর বয়স। নিজের জীবন গেলেও সমস্যা নেই। যারা মানবঢাল করে আমার জীবন রক্ষা করেছে, এ কয়েক দিনে তিনবার তারা আমাকে রক্ষা করেছেন, আমি কি তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবো? আপনি আমাকে স্পষ্ট বলে দেন, যদি আমাকে বলেন নির্বাচন করতে দেবেন তা হলে আমি করবো। আর যদি না দেন, তা হলে বিকালে প্রেসক্লাবে গিয়ে জানাবো আমার পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব না।