আনন্দে ঢেকে যাক কষ্ট

0
41

ঢাকা , ০৩ জানুয়ারি , (ডেইলি টাইমস২৪):

মেয়েটির মনে অনেক কষ্ট। হারিয়েছে তার প্রথম সন্তান। নাড়িছেঁড়া ধন। ভেবেই পায় না কী নিয়ে বাঁচবে সে? বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে অবশেষে মাস দেড়েক পর ঘরের বাইরে বের হলো সে। সবাই বোঝাল, যাও, মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিয়ে এসো।

কয়েক বছর আগের কথা। দিনটি ছিল ৩১ ডিসেম্বর। কাল থেকে নতুন বছর। মেয়েটি চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিল, মনকে শক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু বেসিনের আয়না ঝাপসা হয়ে যায় বারবার। আবার পানির ঝাপটা। বহুদিন পর চুল বাঁধল, বাইরে যাওয়ার শাড়ি পরল নাকি শাড়ি প্যাঁচাল! ঢাকার ধানমন্ডির সড়ক দিয়ে রিকশায় যাচ্ছে…। হঠাৎ পাশের রিকশায় দেখল এক জোড়া তরুণ–তরুণী উচ্ছল হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। থমকে গেল মেয়েটা। মনে হলো, ঘরের বাইরে এসে ভুল হলো। বাইরেটা বড় স্বার্থপর! আমার মনে এত কষ্ট, আর দেখো ওরা কেমন নির্লজ্জের মতো হাসছে! কী নিষ্ঠুর!

হায় রে অবুঝ, ওই অপরিচিত তরুণ–তরুণী কী করে জানবে তোমার কষ্টের কথা? আর ঘর থেকে বের না হলে কী করে জানতে পৃথিবীতে একই সময়ে সব মানুষ দুখী নয়! সুখ–দুঃখ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, আসে আবার মিলিয়েও যায়। নিজেকে এই কথাটা বোঝাতে সময় লেগেছিল মেয়েটার। আবার মা হয়েছিল মেয়েটি, আশঙ্কা আর আতঙ্কে মাসখানেক ছবি তোলা হয়নি নবজাতকের। ছোট্ট মানুষটি ঘুমিয়ে থাকলে নাকের কাছে বারবার আঙুল নিয়ে দেখত। সব ঠিক আছে তো? অতঃপর সময় বহিয়া গেল, ছোট্ট মানুষটা প্রথম হাসল নাকি হাসাল পরিবারকে! প্রথম মায়ের তর্জনী মুঠো করল, সিলিং পাখার ঘূর্ণি দেখল চোখ ঘুরিয়ে, উপুড় হলো, ঘাড় উঁচু করল…সবটাতেই বিস্ময়, আনন্দ বাবা–মায়ের। একের পর এক ছবি তোলা, বর্ণনা লিখে রাখা।

আমাদের কার জীবনে ভালো–মন্দ নেই? উত্থান–পতন নেই? সফলতা-ব্যর্থতা নেই? তবু জীবন কি থেমে থাকে? একেক সময় মনে হয়, আর তো বইতে পারি না। তবু বড় কোনো বিপদ এলে সবকিছু জেনেও একটা ‘মিরাকেল’–এর অপেক্ষায় থাকি। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফিনিক্স পাখির উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আর যখন রাত পোহালে ভোর হয়, তখন বুঝতে পারি, সময়ই একমাত্র শক্তি। সময়ই পারে দুঃখকে ঢেকে দিয়ে আনন্দে ভাসাতে।

রবীন্দ্রনাথ নাকি বাঙালির মনের আনন্দ-বেদনা, উত্থান-পতনের সব অনুভূতির কথাই লিখে রেখে গেছেন। ঠিক তা–ই।

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।

তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।

তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,

বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।।

তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,

কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।

নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ—

সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।।

জীবনে থাকবে হাসি, থাকবে কষ্টজীবনে থাকবে হাসি, থাকবে কষ্ট

ক্রিকেট–বোদ্ধা বন্ধু একবার আমার লাগাতার বিপদের সময় বলেছিল, উইকেট বাঁচিয়ে ক্রিজে টিকে থাকাটাই এখন বড় ব্যাপার। শতরানের আশা এখনই কোরো না। ভুল শট খেলে আউট হয়ে যেতে পারো। বরং ছোট ছোট শট খেলে মধ্যাহ্নভোজের আগে অর্ধশত রান করো। দেখবে, দিন শেষে শতরান হয়ে যাবে! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, জীবনের সঙ্গে ক্রিকেটের এত মিল! তাই তো এক রানের আনন্দও তো অনেক সময় শতরানের মতো। আমরা অনেক সময় তা ভুলেই যাই।

আবার এক রান না পেলে অহেতুক মুষড়ে পড়ি। জীবনে বড় বিপদ এসেই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত অল্পে আমরা অহেতুক মন খারাপ করি। আনন্দ উদ্‌যাপন করাটাও যে জীবনের অংশ, বড় ঝড় থেকে না ফিরলে মনেই থাকে না।

কেউ হয়তো ভর্তি হতে চেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে, হলো না। মন তো ভাঙবেই। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ারও তো কিছু নেই। মনোবিদেরা বলেন, জীবনে বিকল্প পথও ধরতে হয়। একটা হলো না তো আরেকটা হবে, হয়তো তাতেই হবে বাজিমাত। শিক্ষার্থীরা তো বটেই, অভিভাবকেরাও অনেক সময় ভুলে যান লেখাপড়াটাই আসল কথা। অমুক স্কুলে ভর্তি না হতে পারলে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রথম আলোরদেশজুড়ে থাকা প্রতিনিধি আর ট্রাস্টের কল্যাণে জানতে পারি, কত নাম না জানা বিদ্যালয় থেকে কত অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ঈর্ষাজাগানিয়া ফলাফল করছে অদম্য মেধাবীরা।

জীবন তো খেলাই। একবার আউট হলেইবা কী? আরেকবার ছক্কা হবেই। হোক বা না হোক, ছক্কার স্বপ্ন তো দেখতে হবে। যে ‘শচীন শচীন’ নির্ভরতার ধ্বনিতে স্টেডিয়াম মুখরিত থাকত, সেই শচীন টেন্ডুলকার কি হাঁস (ডাক) মারেননি? তাই বলে কি থেমেছে তাঁর অর্জন? প্রথম আলোর কিশোরদের ম্যাগাজিন কিশোর আলোর জন্মদিনে এসে তাই বিশ্বখ্যাত অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান স্বপ্ন দেখালেন বিশ্বকাপ জয়ের। বললেন, ‘স্বপ্ন তো তা–ই, যা অন্যে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি।’

আরেকটা নতুন বছর এল। নতুনের শক্তি অনেক। এটা শুধু দেয়াল পঞ্জিকা বা মোবাইলের ক্যালেন্ডারের নতুন মাস নয়। নিজেকে জয় করার প্রত্যয়ও বটে। আর কোথাও কিছু না থাক, বুকের ভেতরে প্রত্যয় থাকলেই যথেষ্ট। তবেই গাইতে পারেন, ‘আমরা করব জয় একদিন।’

মনে পড়ে স্কুলজীবনের কথা। অগ্রণী স্কুলের গানের শিক্ষক মামুন স্যার শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতটি—

ওরে, নূতন যুগের ভোরে

দিস নে সময় কাটিয়ে বৃথা সময় বিচার করে।।

কী রবে আর কী রবে না, কী হবে আর কী হবে না

ওরে হিসাবি,

এ সংশয়ের মাঝে কি তোর ভাবনা মিশাবি?।…

কর্মক্ষেত্রই বলুন, পরিবার বলুন, কিংবা বন্ধুত্ব—আনন্দ–বেদনার নকশিকাঁথার ফোঁড়েই জীবন হয় পূর্ণ। তবে দিনশেষে আনন্দের পাল্লা যেন হারিয়ে দেয় কষ্টকে। ব্যর্থতা যেন সফলতার কাছে হয় পরাজিত। নয়তো জীবন জিতবে কী করে বলুন? নতুন বছরে এই তো চাওয়া।