অভিনন্দন ফিরলেও শান্তি ফেরেনি

0
27

ঢাকা , ০৩ মার্চ , (ডেইলি টাইমস২৪):

উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান ফিরে এলেও নিয়ন্ত্রণরেখায় শান্তি ফেরেনি। বরং শুক্রবার রাতে লাগাতার গোলাবর্ষণে কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলায় এক পরিবারের মা ও দুই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। পাকিস্তানি গোলায় ধ্বংস হয়েছে তাঁদের ঘরবাড়ি। ঠিক আগের দিন রাজৌরি জেলায় নিহত হয়েছিলেন চার ভারতীয় প্রতিরক্ষা সদস্য। আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, গতকাল শনিবার সীমান্তে ভারতীয়দের গুলিতে নিহত হয়েছেন পাকিস্তানের দুই সেনাসহ চারজন। দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণরেখা অশান্ত।

ভূপাতিত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের চালক যুদ্ধবন্দী উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের মুক্তি ঘোষণা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান ​খান গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, শান্তির বার্তা দিতেই অভিনন্দনকে তাঁরা দ্রুত ছেড়ে দিচ্ছেন। ইমরান সেই কথা রাখলেও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর বিস্তীর্ণ এলাকায় শান্তি দূর অস্ত। লাগাতার গোলাবর্ষণ অব্যাহত। পাকিস্তানের লক্ষ্য ভারতের অসামরিক এলাকা। ১০৫ মিলিমিটার ব্যাসার্ধের হাউইৎ​জার কামান, মর্টার ও ভারী রাইফেলের গোলাগুলিতে বিপর্যস্ত নিয়ন্ত্রণরেখার জনজীবন।

সাবধানতা অবলম্বন করতে পুঞ্চ ও রাজৌরিতে নিয়ন্ত্রণরেখার ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত সব স্কুল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধকালীন তৎ​পরতায় তৈরি হচ্ছে নতুন বাংকার। পুরোনো বাংকারগুলো মেরামত করা হচ্ছে। জনতাকে বলা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজন না হলে তাঁরা যেন সন্ধ্যার পর বাইরে না বের হন। সরকারি সূত্রের দাবি, গত এক সপ্তাহে পুঞ্চ, রাজৌরি, জম্মু ও বারামুলা জেলায় অন্তত ৬০ বার পাকিস্তান সংঘর্ষ বিরতি লঙ্ঘন করেছে। ভারতের অভিযোগ, বেছে বেছে গ্রামীণ ক্ষেত্রগুলোই তাক করছে পাকিস্তানি গোলন্দাজরা।

এই বাস্তবতা সত্ত্বেও অভিনন্দনের মুক্তিদানের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পাকিস্তান যেমন বড় করে দেখাতে চাইছে, তেমনই ভারত তুলে ধরছে তার কূটনৈতিক সাফল্যকে। এই দাবি ও পাল্টা দাবির মধ্যেই অভিনন্দনকে যেতে হচ্ছে বহুবিধ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে, যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হতে যা অবশ্যকর্তব্য। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপরই নির্ভর করে দেশে ফেরা যুদ্ধবন্দী ফের আগের মতো স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে পারবেন কি না।

অভিনন্দনকে ঘিরে তাই তৈরি হয়েছে নিরাপত্তার এক অদ্ভুত ঘেরাটোপ। গত শুক্রবার রাতেই অমৃতসর থেকে তাঁকে বিশেষ বিমানে নিয়ে আসা হয় দিল্লি। স্থান হয় সেনা হাসপাতালে। পাঞ্জাব সীমান্তে পরিবারের লোকজন গেলেও চোখের দেখা ছাড়া বাক্যবিনিময়ের কোনো সুযোগ তাঁদের ছিল না। রাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর রাত পোহালে শুরু হয় যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তনের পর প্রথামাফিক বহুবিধ জরুরি পরীক্ষা যেগুলো ‘অগ্নিপরীক্ষারই’ শামিল। প্রথামাফিক সেই পরীক্ষা শুরু হয় শনিবার সকাল থেকে। এরই মধ্যে হাসপাতালে এসে অভিনন্দনের সঙ্গে দেখা করে যান প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।

প্রত্যর্পণের পর প্রথমেই দেখা হয় যুদ্ধবন্দীরা শারীরিক দিক থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক কি না। সুস্থতার সেই পরীক্ষায় থাকে শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন বিষয়। যেমন দেখা হয়, শত্রুদেশ যুদ্ধবন্দীর শরীরে কোনো ‘মাইক্রোচিপ’ ঢুকিয়ে দিয়েছে কি না। গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবরের সন্ধানে অনেক সময় এই কাজ করা হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় সাহায্য নেওয়া হয় মনোরোগবিদ বা মনোরোগ চিকিৎ​সকদের। এই সঙ্গে চলে হাজার রকমের জেরা। বন্দী হওয়ার আগে সেনানীর কাছে কী কী তথ্য ছিল, শত্রুপক্ষ যুদ্ধবন্দীর কাছ থেকে কোনো তথ্য জেনে গেছে কি না, জানলে কী কী, বন্দী হওয়ার আগে কী কী তথ্য নষ্ট করা গেছে—সবকিছু খুঁটিয়ে জানতে চাওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা, সেনানী সত্য কথা বলছেন কি না, শত্রুদেশ তাঁর মন জয় করে ফেলেছে কি না, সামরিক পরিভাষায় যাকে ‘ব্রেন ওয়াশ’ বলা হয়, তা করা হয়েছে কি না, সেনার আনুগত্যে কোনো চিড় ধরেছে কি না—এসব বিষয় নিশ্চিত করা হয়। ধরা পড়ার পর শত্রুদেশ কী কী জানার চেষ্টা করেছে, বন্দী সেনানী সেসবের জবাবে কী বলেছেন, জেরায় তাও জানতে চাওয়া হয়। বহু ক্ষেত্রে দিনের পর দিন জেরা চলে। শারীরিক ও মানসিক এসব পরীক্ষার ফলের ওপরই নির্ভর করে বন্দিদশা কাটিয়ে ঘরে ফেরা সেনানী ফের আগের মতো দায়িত্ব গ্রহণের অধিকারী কি না। আবার যুদ্ধবিমান ওড়ানোর আগে অভিনন্দনকেও এ ধরনের প্রতিটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

সেই ফল যা-ই হোক, এই মুহূর্তে অভিনন্দনই সবার চোখের মণি। সীমান্ত শান্ত না অশান্ত, তা ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ভোটের মুখে শাসক দলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল শনিবার সকালে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে উইং কমান্ডারের সাহস ও শৌর্যের প্রশংসা করে বলেন, ভারত যা করে, বিশ্ব তা অনুসরণ করে। অভিনন্দনের আভিধানিক অর্থ এত দিন ছিল শুভেচ্ছা। এবার থেকে সেই অ​র্থ বদলে যাবে।

সীমান্তে নিহত চারজন

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন জানায়, কাশ্মীর সীমান্তের নাকিয়াল সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর গুলিতে গতকাল পাকিস্তানের দুই সেনাসহ চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আরও দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গতকাল এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে। নিহত সেনারা হলেন হাবিলদার আবদুর রব ও নায়েক খুরাম।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখার ওপর থেকে বেসামরিক লোকদের লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি ছুড়তে শুরু করে ভারতীয় বাহিনী। এতে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং এক নারীসহ দুই বেসামরিক নাগরিক হন আহত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এরপর পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে ভারতীয় সেনারাও হতাহত হন এবং ভারতীয় চৌকির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাতা পানি ও জানদ্রোত সেক্টরে ভারতীয় বাহিনী নির্বিচার বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে আইএসপিআর।