ফিচার

মহিষখোলা গ্রাম

ঢাকা , ০৬ মার্চ , (ডেইলি টাইমস২৪):

প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই একটা শিল্পমন কাজ করে। মানুষ যদি ভেতরের শিল্পিত এ মনকে উপযুক্ত পরিচর্যা করে তবেই তা মোহ ও মাধুর্যের মাদকতায় অন্যকে আকৃষ্ট করে। সাহিত্য শিল্পেরই একটি জৌলুসপূর্ণ ধারা যা মানুষকে মোহিত করে অতি সহজে।

তাই আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু কি হবে মা আবার কানের সামনে ঘ্যানঘ্যান শুরু করলেন। তাড়াতাড়ি ওঠ তুই বুঝি ঘুরতে বের হবি দেরি করে বের হলে তো কিছুই দেখতে পাড়বি না। না পারতে ঘুম থেকে উঠতেই হল আমাকে। উঠে দেখি এর মধ্যে রাজন স্যার কয়েকবার ফোন দিয়েছেন। দ্রুত প্রস্তুতি পর্ব শেষ করে তৈরি হয়ে নিলাম। এদিকে পাইলট মহোদয়ও এসে উপস্থিত- বেরিয়ে পড়লাম আমরা। রাজন স্যারকে তার বাসা থেকে তুললাম। এক স্নিগ্ধ সকালে আমরা এগিয়ে চললাম। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পেড়িয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। মহাসড়কে সূর্যদেবের আভা পড়েছে তির্যকভাবে। আমরা যাচ্ছি সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভারত-সীমান্ত লাগোয়া ধর্মপাশা উপজেলায় মহিষখোলা গ্রামে। প্রকৃতির পালাবদলে চলেছে নতুন ঋতুকে বরণ করে নেয়ার পালা।

আমরা চলছি নতুন গন্তব্যের পানে কিন্তু সেই সকালে বের হয়েছি তাই পেটে দানাপানি পড়েনি। পাগলা বাজারে এসে আমরা নামলাম। ঢুকে পড়লাম দয়াল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। গরম গরম পরটা আর ভাজি দেয়া হল আমাদের। পেটে অনেক আগেই ক্ষুধা লেগেছে তাই পরোটা আর ভাজি খেতে অমৃত লাগছিল। এক নিমিষে সাবার করে নিলাম অসাধারণ স্বাদ। সকালের নাশতা শেষ করে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্যপানে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম সুনামগঞ্জ শহরে।

সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে তাহিরপুর। প্রায় আড়াই ঘণ্টা যাত্রা শেষে পেটে চলছে রামরাবণের যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত হাজির হলাম সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে অবস্থিত রোজ গার্ডেনে। প্রবেশ করতেই ওয়েটার টেবিলের সামনে এসে হাজির কী লাগবে। আমি বললাম, পেটে দানাপানি দ্রুত দিতে হবে তাই দ্রুত যা দিতে পারবে তাই দেও। আমাদের অবস্থা দেখে কয়েক মিনিটের ভেতরেই সাদা রুটি আর সবজি নিয়ে হাজির হল ওয়েটার।

আমরাও কালক্ষেপণ না করে খাওয়া শুরু করে দিলাম। তৃপ্তি ভরে খাওয়া শেষ করে আমরা রওনা দিলাম তাহিরপুরের দিকে। গ্রামীণ পথে চলার মজাই আলাদা। দুই পাশে ধানক্ষেত এর মাঝ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। কোথাও সূর্যদেবের দেখা পাচ্ছি কোথায় আবার সূর্যদেব মুখ কালো করে বসে আছেন। এভাবেই আমরা পথ পাড়ি দিচ্ছি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছলাম তাহিরপুর বাজারে। আমি রাজন স্যারকে বললাম, আর কত পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে। স্যার বললেন, এবার আমাদের পাড়ি দিতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওর, সময় প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগবে। আমি মনে মনে খুশিই হলাম টাঙ্গুয়ার হাওয়ারের রূপ অবলোকন করতে পারব যদিও প্রায় চার ঘণ্টা ধরে যাত্রাপথে আছি। এর পরেও নতুন গন্তব্য পথের যাওয়ার আনন্দে সব কিছু তুচ্ছ মনে হল। রাজন স্যার বললেন, কিভাবে পাড়ি দেবে টাঙ্গুয়ার হাওয়ার ইঞ্জিন নৌকায় নাকি স্প্রিডবোটে। আমি ভাবলাম স্প্রিডবোটে গেলে তো টাঙ্গুয়ার রূপ ভালোভাবে দেখতে পারব না তারচেয়ে ইঞ্জিন নৌকা করে যাওয়া ভালো। যেই ভাবা সেই কাজ- আমরা চেপে বসলাম ইঞ্জিন নৌকায়। টাঙ্গুয়ার ঢেউয়ের তালে তালে আমরা এগিয়ে চলছি। নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন ধারা আমাদের মোহিত করছে। আমি এ সুযোগে প্রাণভরে ছবি তুলতে লাগলাম। দেখতে দেখতে কিভাবে যে আড়াই ঘণ্টা পেড়িয়ে গেল টেরই পেলাম না।

আমরা এসে পৌঁছালাম ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর গ্রামে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল রাজন স্যারের সহচর সোহাগ আর মুনিম। আমরা চেপে বসলাম দুই চাকার বাহনে। এখান থেকে মহিষখোলা গ্রামের দূরত্ব দশ মিনিটের রাস্তা। তবে গন্তব্যে পৌঁছার একমাত্র বাহন দুই চাকার যান্ত্রিক বাহন। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের সেই কাক্সিক্ষত গন্তব্যে মহিষখোলা গ্রামে। শান্ত নীরব পরিবেশ যেখানে ঘাস ফড়িং মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আমরা এগিয়ে চললাম মহিষখোলা নদীর পূর্বপাড় ঘেঁষে একখানা প্রায় নিশ্চিহ্ন টিনের ঘর যার অস্তিত্ব সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেও কল্পনায় তার পূর্ণরূপ দেখা কল্পনাবিলাসীদের জন্যও হয়তো দুরূহ হবে এবং তার আশপাশখানা ৪২ বছর ধরে মনুষ্যস্পর্শহীন হওয়ায় প্রকৃতির লীলাক্ষেত্র অর্থাৎ জঙ্গলাক্রীর্ণ। সেই ঘরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতেন। পাক হানাদারদের মাঝেমাঝে ধরে নিয়ে বন্দি করেও রাখতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলটি ছিল ১১নং সেক্টরের ১ নম্বর সাবসেক্টর। পশ্চিমে গা ঘেঁষে মহিষখোলা নদী, উত্তরে ২০০ গজের মধ্যেই ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের পর্বতমালা, পূর্বে সংখ্যাতীত খাল-বিল আর সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরের সঙ্গে রাগে-অনুরাগে জড়িয়ে আছে আরেকটি স্নিন্ধ নদী জাদুকাটা। শ্রী চৈতন্যের জ্যেষ্ঠ পার্ষদ অদ্বৈতাচার্য এ নদীপারেরই সন্তান ছিলেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে পাক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াল সংঘর্ষ হয়। অনেক যোদ্ধা মারা যান। মহিষখোলা নদীর পাড়ঘেঁষা বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় তখনই, শহীদ যোদ্ধাদের গণকবর রচিত হয় তারই এদিক-ওদিক। তারপর ৪২ বছর লতা-গুল্ম-বৃক্ষের চাদরে ঢাকা ছিল এ ইতিহাস। বলছিলেন আমাদের রাজন স্যার। স্যারের কথা চলছে আমরাও ঘুরে দেখছি স্যারের অনন্য স্থাপত্য কর্ম।

এখানেই শায়িত আছেন একাত্তরের শহীদ হওয়া বীর প্রাণ। পূর্ব-পশ্চিম অক্ষ বরাবর সমান্তরাল দুটি সুউচ্চ দেয়াল ‘ন’ ফুট বেদির ওপর এসে দাঁড়ায়, তার ওপর ছায়া হয়ে ছাদ এসে বসে। সিঁড়ি ভেঙে পূর্বদিকের প্রবেশ বিন্দুতে চোখ রাখলে পশ্চিমের নদী আর তার গায়ে এসে পড়া আকাশ দেখা যায়। পূর্ব-পশ্চিম উন্মুক্ত হওয়ায় দুই দেয়ালের ঘর রচিত হয়ে যায়। উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উঁচু দেয়ালে (দেড় ফুট পুরু) ব্যাকরণ ভেঙে অনেকগুলো ছোট-বড় জানালা আড়াল খুলে আলোর উৎস হয়ে উঠে। ঠিক চোখ মেলে তাকানোর মতো। ‘যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’, তারা তো বদ্ধ ঘরে থাকে না, যে ঘরে দোর-জানালায় অর্গল টানা, যে ঘরে আলোর ঝলক নেই, দোলা নেই, সে ঘরে স্বাধীনতা প্রবেশ করে না। সেই ঘর অন্ধকারের অধীন। তাই ‘সব কয়টা জানালা’ই খুলে আছে।

বেদির তিন দিক ঘিরে রয়েছে পানির আধার যা পশ্চিমে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। প্রতি বর্ষাতেই মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল নামলে নদী উপচে বেদির তলায় কিছুক্ষণের জন্য হাঁটুজল জমে যায়। এটা হাওর অঞ্চেলের চেনা দৃশ্য। এভাবেই হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে ‘সব ক’টা জানালা’ খুলে আমাদের ডাকছে ওরা, ‘যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’।

যাবেন কীভাবে

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার সরাসরি বাস রয়েছে। এনা, হানিফ, শ্যামলী, ইউনিকসহ অনেক বাস এই পথে চলে। তবে অবশ্যই অগ্রিম টিকিট কেটে রাখুন। তাহলে ঝামেলা পোহাতে হবে না। সুনামগঞ্জ শহরে এসে এমএ খান সেতু থেকে পাবেন মোটরবাইক অথবা গাড়ি নিয়ে চলে যান তাহিরপুর বাজারে। সেখান থেকে নৌকা করে চলে যান মধ্যনগর গ্রামে। মধ্যনগর থেকে মহিষখোলা গ্রাম দশ মিনিটের রাস্তা। দলবেঁধে ঘুরতে গেলেই বেশি আনন্দ করতে পারবেন।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button