উপাচার্যের ধারাবাহিক অনুপস্থিতিতে স্থবির প্রশাসনিক কার্যক্রম

0
17

ঢাকা , ০৭ মার্চ , (ডেইলি টাইমস২৪):

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকছেন প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেইন অফ কমান্ড একেবারে ভেঙে পড়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি উপেক্ষা করে অধিকাংশ সময় ক্যাম্পাসে না থাকায় উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর উপাচার্যের অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা নিচ্ছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১ জুন চার শর্তে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। নিয়োগ প্রাপ্তির ১৩ দিন পর ১৪ জুন যোগদান করেন তিনি। রাষ্ট্রপতির দেওয়া চার শর্তের প্রথমটি ছিল উপাচার্য সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। কিন্তু যোগদানের পর থেকে নিয়োগের এই শর্ত অমান্য করে ধারাবাহিকভাবে ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকছেন তিনি। ১৪ জুন যোগদানের পর ৬২৩ কার্যদিবসের মধ্যে উপাচার্য ক্যাম্পাসে ছিলেন মাত্র ১৫০ দিনের মতো। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ছয়মাসে ৬৯ দিন, ২০১৮ সালের ১২ মাসে ৭১ দিন এবং চলতি বছরের গত দুই মাসে ৭ দিন ক্যাম্পাসে ছিলেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশেষ কারণ ছাড়া ক্যাম্পাসে আসেন না উপাচার্য। সাধারণত, সভা-সেমিনারের উদ্বোধন, দায়িত্ব অর্পণ, আইডি কার্ড বিতরণ ও কিছু জাতীয় কর্মসূচিতে ক্যাম্পাসে আসেন তিনি। এভাবে মাঝে মাঝে এলেও সকালে এসে দুপুরে, অথবা দুপুরে এসে রাতে কিংবা রাতে এতে সকালে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন তিনি। তিনি যোগদানের পর অধিকাংশ সিন্ডিকেট সভা, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড, কর্মকর্তা নিয়োগ বোর্ড ও কর্মচারী নিয়োগ বোর্ড ঢাকা লিয়াজু অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিয়োগ প্রাপ্তির পর তিনি কয়েকটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় জরুরী প্রয়োজনে বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর নিতে অনেক শিক্ষার্থীকে ঢাকায় যেতে হয়েছে। তিনি প্রায় ২৫ টি কোর্সের ক্লাস নিতেন। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ডাকতেন। ওই সব কোর্সের পরীক্ষা গ্রহণ করতেন উপাচার্যের পিএ আবুল কালাম আজাদ। এসব কোর্সের পরীক্ষার খাতা কে মূল্যায়ন করেন তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

এদিকে, যোগদানের পর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যাপক রদবদল করেন উপাচার্য। এতে, অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তা বঞ্চিত হন। আবার অনেকে দুই-তিন এমনকি চারটি পর্যন্ত প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পান। এছাড়া, অনেক কর্মকর্তাকে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া অঘোষিতভাবে ওএসডি করে রেখেছেন উপাচার্য। তারা মাসের পর মাস কোনো কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের নিজেদের দপ্তরের কাজ করছেন উপাচার্যের আনুকূল্যে থাকা ৪/৫ জন কর্মকর্তা।

এতে, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে উপাচার্যের বিরুদ্ধে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। আস্তে আস্তে তাদের অসন্তুষ্টির বিষয়টি প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় উপাচার্যের পিএস আমিনুর রহমানকে অব্যাহতি ও সংস্থাপন শাখার উপ রেজিস্ট্রার খন্দকার গোলাম মোস্তফাকে ওই শাখা থেকে সরানোসহ ১১ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন।

উপাচার্য যোগদানের পর শিক্ষকদের মধ্যে যারা তার আশপাশ ঘিরে ছিলেন তারাও এখন তার অনুপস্থিতির বিষয়টি মানতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, ‘উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। তার নেতৃত্বে শিক্ষক-কর্মকর্তারা কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, উপাচার্য যোগদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে দৃশ্যমাণ কিছু করেননি। তিনি মাসের পর মাস ক্যাম্পাসে না থাকায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন পিছিয়ে পড়বে।’

আর এক শিক্ষক বলেন, ‘উপাচার্য রাষ্ট্রপতির দেয়া নিয়োগের শর্ত মেনেই যোগদান করেছেন। কিন্তু যোগদানের পর থেকে তিনি নিয়োগের শর্ত অমান্য করছেন। তিনি এখানে জাস্ট টাইম পাস করছেন।’

এদিকে উপাচার্যের ধারাবাহিক অনুপস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেইন অফ কমান্ড একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। নিয়মিত অফিস করছেন না কিছু কর্মকর্তা। সপ্তাহে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫ দিন সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে থাকার কথা। কিন্তু, গত ১০ কর্মদিবস সরেজমিনে প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে দেখা যায়, কিছু কর্মকর্তা সঠিক সময়ে এলেও অনেকে আসছেন বেলা ১১টার পর। আবার, বিকেল ৩ টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে অফিস ত্যাগ করছেন। আর, দুই/তিন কর্মকর্তা মাসে ৮/১০ দিন অফিস করছেন। এতে, প্রশাসনিক সুবিধা পেতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’

কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, প্রশাসনিক ভবনে জরুরি কাজে গিয়ে অনেক কর্মকর্তাকে অফিসে পাওয়া যায় না। তাদের স্বাক্ষরের জন্য ফাইল রেখে আসতে হয়। অথবা ফোন দিয়ে ডেকে আনতে হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেরোবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘উপাচার্য ক্যাম্পাসে থাকেন না সে বিষয়টি সবার জানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে সবার আন্তরিকতা দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি প্রফেসর ড. গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে আমরা বিষয়টি প্রত্যক্ষ করছি। শিক্ষক সমিতির সভায় বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আবার কথা বলবো।’

উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ঢাকায় অবস্থান করায় সার্বিক বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।