স্বাধীনতার পর সরকার সমর্থিত কেউ ডাকসুর শীর্ষ পদে আসেননি

0
57

ঢাকা , ০৮ মার্চ , (ডেইলি টাইমস২৪):

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালে। শুরুতে এর নাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাসু)। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে সাতবার। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা ডাকসুর শীর্ষ পদে জায়গা পাননি। বরাবরই জয়ী হয়েছেন বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা।

এ প্রসঙ্গে ১৯৯০ সালের ডাকসুর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) খায়রুল কবির খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার সমর্থিত কোনও ছাত্র সংগঠন ডাকসুতে নির্বাচিত হয়েছে– এমন ইতিহাস আমার জানা নেই। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তো ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে যেতেই পারেনি।’

১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মনোনীত করা হয়। ১৯২৫ সালে ভিপি হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। ১৯৫৩ সালে ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এর ডাসু নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ডাকসু। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সভাপতি এবং ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি থেকে ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। কোষাধ্যক্ষ থাকতেন একজন শিক্ষক। ১৯৫৩ সালে ডাকসুতে পরোক্ষ নির্বাচনের বদলে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে প্রথম নির্বাচন হয়। এতে প্রথম ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন এসএ বারী এটি ও জুলমত আলী খান।

এরপর ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছেন যথাক্রমে– নিরোদ বিহারী নাগ ও আবদুর রব চৌধুরী, একরামুল হক ও শাহ আলী হোসেন, বদরুল আলম ও মো. ফজলী হোসেন, আবুল হোসেন ও এটিএম মেহেদী, আমিনুল ইসলাম তুলা ও আশরাফ উদ্দিন মকবুল, বেগম জাহানারা আখতার ও অমূল্য কুমার, এসএম রফিকুল হক ও এনায়েতুর রহমান, শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও কেএম ওবায়েদুর রহমান, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন ও আসাফুদ্দৌলা, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ও শফি আহমেদ, মাহফুজা খানম ও মোরশেদ আলী, তোফায়েল আহমেদ ও নাজিম কামরান চৌধুরী, আসম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। এরপর প্রায় ৭ বছর পর ১৯৭৯ সালে জাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেলে ভিপি হয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জিএস হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। ১৯৮০ সালে মাহমুদুর রহমান মান্না দ্বিতীয়বারের মতো ভিপি নির্বাচিত হন বাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান। এরপর ১৯৮২ সালে আখতারুজ্জামান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন বাসদ-ছাত্রলীগের জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।

১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ডাকসু নির্বাচনে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ভিপি এবং মুশতাক আহমেদ জিএস নির্বাচিত হন। এই প্যানেলটি ছিল ছাত্রলীগসহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি যৌথ প্যানেল। ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৮ বছর আগে ১৯৯০ সালে। ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসুর ও ১৮টি আবাসিক হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।  এই নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল জয় লাভ করে। এ সময় আমান উল্লাহ আমান ভিপি নির্বাচিত হন এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন। এরপর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর ২৮ বছরে শুধু ডাকসু নয়, কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি।

১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার সমর্থিতরা না আসা ডাকসুর একটি বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতার পরে প্রথমে ’৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন জিতলো। সরকারবিরোধী ছিল জাসদ-ছাত্রলীগ, তারা জয়লাভ করবে এই আশঙ্কাতেই ব্যালট ছিনতাই হয়ে গেল। এই অভিযোগটি আছে তখনকার সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনে যারা ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে। সেবার শুধুমাত্র শামসুন্নাহার হলের ব্যালট ছিনতাই করার আগে ফলাফল হয়ে গিয়েছিল। তারা জগন্নাথ হলেও ভিড়ছিল এটা বলার জন্য যে,  ব্যালট ছিনতাইয়ের সঙ্গে তারা জড়িত না। তবে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, কারা ব্যালট ছিনতাই করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপরে জিয়াউর রহমানের আমলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিটি ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। প্রথম ডাকসু নির্বাচনে তাদের ফলাফল তেমন ভালো ছিল না। দ্বিতীয় ডাকসু নির্বাচনে জয়ী জাসদ-ছাত্রলীগের মূল দল জাসদ বিভক্ত হয়ে বাসদ সৃষ্টি হওয়ায় তারা (জাসদ-ছাত্রলীগ) দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণে হলগুলোতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ভালো করা শুরু করে। পরে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় ডাকসুতে বেশ কিছু পদ পায় এবং হল সংসদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ পায়। কিন্তু সর্বসাকুল্যে জয়লাভ করেছিল বাসদ-ছাত্রলীগ। এরশাদের সময় তো সব ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ’৮৯ সালের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অংশগ্রহণ করেনি। সেবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্যানেল জয়লাভ করে। পরে ’৯০-এর নির্বাচনে ছাত্রদল জয়লাভ করে। এরপর তো আর নির্বাচন হয়নি।’