ক্যাম্পাস হোক সুস্থধারার রাজনীতির জায়গা

0
48

ঢাকা , ১৫ মার্চ , (ডেইলি টাইমস২৪):

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূর। দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের চেয়ে দুই হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোটের দিন দুপুরে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি। রাতে ঘোষিত ফলে দেখা যায় ডাকসুর সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এরপরই তিনি চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রে। ছাত্র রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হন তারকা হিসেবে। জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল  রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ক্যাম্পাস নিয়ে চিন্তা ইত্যাদি বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার প্রত্যাশা- ক্যাম্পাস হোক সুস্থধারার রাজনীতির জায়গা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির নিজস্ব প্রতিবেদক আবু বকর ইয়ামিন

রাইজিংবিডি: একজন নির্বাচিত ভিপি হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?
নুরুল হক নূর:
 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। সেখানে নির্বাচিত ভিপি হিসেবে আমার আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল। আমি বরং হতাশ হয়েছি। ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কলঙ্কিত ইতিহাস রচিত হয়েছে। এমন নির্বাচন ছাত্রদের কাছে কাঙ্খিত ছিল না। জাতীয় নির্বাচনে মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল যে, মানুষ ভোট দিতে পারে না কিংবা ক্ষমতাসীনরা জোর করে ক্ষমতা নিয়ে নেয়। সে জায়গা থেকে সবার একটা প্রত্যাশা ছিল যে, ডাকসুর মাধ্যমে হয়তো ভোটের প্রতি মানুষের মনে ইতিবাচক ধারার সূচনা হবে। ছাত্রদের প্রত্যাশা ছিল, ভোটাধিকারের মাধ্যমে তারা তাদের নেতা বেছে নিতে পারবে। কিন্তু ছাত্রদের আশার প্রতিফলন ঘটেনি এ নির্বাচনে। ক্ষমতাসীনদের প্রভাব এ নির্বাচনেও প্রতিফলিত হয়েছে। যার কারণে আমি পুরোপুরি হতাশ।

রাইজিংবিডি: আপনি দায়িত্ব নেবেন কী না?
নুরুল হক নূর:
 আমাকে যারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, যারা আমার জন্য ঘাম ঝরিয়েছে তারা যদি বলে দায়িত্ব নেব। তারা যদি না বলে দায়িত্ব নেব  না। আমি সবারটা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আছে।

রাইজিংবিডি: আপনি বলেছেন যে, স্বচ্ছ নির্বাচন হলে আপনাদের পুরো প্যানেল জিতবে। এ ব্যাপারে আপনার যুক্তি কী?
নুরুল হক নূর:
 আমরা দুটি পদে জয়ী হয়েছি। আপনি একটু খেয়াল করলে দেখবেন যে অন্য পদগুলোতেও দ্বিতীয় পজিশনে আমরাই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আর শিক্ষার্থীরা অন্তত লেজুরভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করে না। তার প্রমাণ অন্তত ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে তা প্রতিফলিত হয়েছে। আর বাকি পদগুলোতে বিভিন্ন কারচুপি করে ফলাফল ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে; তা না হলে আমাদের আরো অনেকে বিজয়ী হতো।

রাইজিংবিডি: ডাকসুতে যেহেতু আপনার প্যানেলের লোক সংখ্যা কম, আপনিসহ মাত্র দুজন। এক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করেন কি না?
নুরুল হক নূর:
 এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য় সভাপতি। সুতরাং তারও একটি বড় ক্ষমতা রয়েছে। আর সাংগঠনিক কাজের জন্য ভিপি হিসেবে প্রধান নির্বাহী আমিই থাকব। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি যে, অন্য যারা দায়িত্বে থাকবেন তারা ভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচিত হলেও আমি আশা করব যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকবে। সেখানে কোনো নির্যাতন নিপীড়ন থাকবে না। সে পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য অথবা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে সবাই একমত হবে বলে আমার প্রত্যাশা। এখানে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হবে না বলে আমার বিশ্বাস।

রাইজিংবিডি: কোটা আন্দোলনের মতো একটি বৃহৎ আন্দোলনে আপনি নেতৃত্বে ছিলেন। অনেক ঝড় ঝাপটা আপনার ওপর দিয়ে গেছে। এগুলোকে আপনি কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
নুরুল হক নূর:
 প্রতিনিয়তই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচনের দিনও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছি রোকেয়া হলে। ভিপি নির্বাচিত হয়ে যখন ক্যাম্পাসে এসেছি তখনো ছাত্রলীগের হাতে হামলার শিকার হয়েছি। তবে আমার বা আমরা যার সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদে আছি আমাদের জীবন শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করেছি। এক্ষেত্রে যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসুক আমরা কাজ করে যাব।

রাইজিংবিডি: আপনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বলছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা চাকরির জন্য পড়াশোনা বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। সব আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ না থাকার কারণ কী?
নুরুল হক নূর:
 আমরা একটি বিষয় দেখেছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী সব আন্দোলনে আসতে পারে না বা অনেক সময় তাদের ক্লাস পরীক্ষা থাকে, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা থাকে। যার কারণে তারা সব আন্দোলনে অংশ নিতে পারে না। কিন্তু যখন একদম জরুরি হয়ে পড়ে যৌক্তিক কোনো বিষয়ে তখন তারা ঠিকই সাড়া দেয়। আপনি প্রশ্ন ফাঁসের আন্দোলনে দেখেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনেও দেখেছেন। আমার বিশ্বাস যে, যদি এখন আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে ডাকি তারা সাড়া দেবে।

রাইজিংবিডি: ডাকসু নিয়ে আপনার কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
নুরুল হক নূর:
 যদিও ডাকসুকে দেখা হয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে। তবুও ডাকসুর নেতাদের দেখা যায় এসবের পাশাপাশি তারা জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। আমরা চাই যে, ৯০ এর দশকের পরে ক্যাম্পাসে যে অপরাজনীতি, সেটা থেকে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি ক্যাম্পাসে ফিরে আসুক।

রাইজিংবিডি: কাজ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করেন কি না?
নুরুল হক নূর:
 আপনারা দেখেছেন, ডাকসু নির্বাচনে আমার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আমার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। তিনি বলেছেন, তার নেতা-কর্মীদের সামনে কথা দিয়েছেন যে, স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বিনির্মাণে তারা আমাকে নেতা মেনে সার্বিক সহযোগিতা করবেন, একযোগে কাজ করবেন। যেহেতু ছাত্রলীগের প্রধান কথা দিয়েছেন, আশা করি তারা সে কথা রাখবেন। এছাড়া যেহেতু পদাধিকার বলে ভিসি স্যার প্রধান হিসেবে রয়েছেন সেহেতু এখানে কাজ করতে কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না বলে আমার বিশ্বাস।

রাইজিংবিডি: দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কোন বিষয়টার প্রতি নজর দেবেন?
নুরুল হক নূর: 
হলে ছাত্ররা যে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তা বন্ধ করা, গেস্টরুম গণরুমের সংস্কৃতি বা নির্যাতনের যে কালচার আছে তা বন্ধ করার জন্য একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, অছাত্র বহিরাগতরা যাতে হলে না থাকতে পারে তা বিবেচনায় থাকবে। যেহেতু নতুন হল নির্মাণ না হলে আবাসন সংকট কাটানো সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে আমাদের নজর থাকবে প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে যাদের বাইরে থাকা খাওয়ার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়, তাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হলে সিটের ব্যবস্থা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রিডিং রুম, লাইব্রেরির উন্নয়ন সাধন করার বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই।

রাইজিংবিডি: খাবারের মান, ছারপোকার সমস্যা এসব বিষয়ে আপনি কী কোনো সমাধান নিয়ে আসতে পারবেন?
নুরুল হক নূর:
 খাবারের মান একটি মৌলিক বিষয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন ক্যাফেটেরিয়াতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক ভর্তুকি দেওয়া হয়। তা যেনো যথাযথভাবে কাজে লাগে সেটা দেখব এবং চাঁদাবাজি ও ফাঁওখোরদের বিতাড়িত করার ব্যবস্থা আমরা করব।

রাইজিংবিডির প্রতিবেদকের সঙ্গে নুরুল হক নূর
রাইজিংবিডি: আপনাকে অনেকে শিবির বলে অপবাদ দেয়। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
নুরুল হক নূর:
 আমি অকপটে স্বীকার করি আমি মহসিন হল ছাত্রলীগের উপ-মানব উন্নয়ন সম্পাদক ছিলাম। ওই হলের ছাত্রলীগ সভাপতি মাকসুদ রানা মিঠুর সঙ্গে রাজনীতি করেছি। আর আমার বিরুদ্ধে যে শিবির ট্যাগ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু আমাকে না, আমার সংগঠনের অনেকের বিরুদ্ধেই দেওয়া হয়েছে। স্পেসিফিকেলি এই ট্যাগটি দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। কারণ, তারা যখন দেখলো কোটা সংস্কার আন্দোলন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং এটি একটি জনপ্রিয় ইস্যু হয়ে উঠেছিল, তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারা ধারণা করেছিল এটি তাদের দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। তাই তারা আন্দোলনকে দমন করার জন্য এই অপপ্রচার করেছিল৷ আমি ছাত্রলীগের ২০১৫ সালের কমিটিতে ছিলাম। তারপর মাস্টার্সে উঠে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলাম না।

রাইজিংবিডি: ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকার কারণ কী?
নুরুল হক নূর:
 কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে হল থেকে জোর করে প্রোগ্রাম এ নিয়ে যাওয়া, মিছিল মিটিং করানো এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার নৈতিকতার সাথে যায় না। আর যখন আমরা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী তখন সারা দেশের সকল ছাত্র ছাত্রী, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও অনন্য ছাত্র সংগঠনও এতে যুক্ত ছিল। কিন্তু ছাত্রলীগই এই শিবির অপপ্রচারটি চালিয়েছিল। এখনো অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

রাইজিংবিডি: আপনি কী মনে করেন ডাকসুর হারানো ঐতিহ্য আপনি ফিরিয়ে আনতে পারবেন?
নুরুল হক নূর:
 হ্যাঁ, আমি চেষ্টা করব।

রাইজিংবিডি: সভাপতি পদে উপাচার্যের বদলে ছাত্র থাকবে, এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
নুরুল হক নূর:
 ডাকসুর গঠনতন্ত্র মোতাবেক সভাপতি উপাচার্য থাকেন যা একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমি মনে করি এই পদটি ছাত্রদের মধ্য থেকেই আসা উচিত। শিক্ষক সমিতির, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির সভাপতি কিন্তু উপাচার্য হোন না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গা যাকে গণতন্ত্র চর্চার সূতিকাগার বলা হয়, সেখানে এমন একটি অগণতান্ত্রিক বিষয় থাকবে কোন যুক্তিতে তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

রাইজিংবিডি: আপনি ওপেন চ্যালেঞ্জ করেছেন যে, পুননির্বাচন হলে ছাত্রলীগ একটি সদস্য পদও পাবে না। এটি কী আপনি রাগের মাথায় বলেছেন?
নুরুল হক নূর:
 কখনো না। আমি এখনো বলছি যে, যদি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় ছাত্রলীগ একটি সদস্য পদও পাবে না। আর যদি পায় তাহলে আমি শুধু ভিপি পদই না, ছাত্রত্ব ত্যাগ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাব।

রাইজিংবিডি: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
নুরুল হক নূর:
 ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে ছাত্র অবস্থায় এখন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাব। বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়াব। তার পরের জীবনে চেষ্টা করব সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করার জন্য।

রাইজিংবিডি: জাতীয় রাজনীতি নিয়ে কোনো চিন্তা আছে কি না?
নুরুল হক নূর:
 যেহেতু এখনো ছাত্র। সেটা অনেক পরের বিষয়। পরে দেখা যাবে।

রাইজিংবিডি: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
নুরুল হক নূর:
 রাইজিংবিডির পাঠকদেরকে ও আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনারা সবাই দোয়া করবেন আমার জন্য।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি ডটকম