ধর্ম ও জীবন

মালয়েশিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে যেমন ঈদ দেখেছি

ঢাকা , ১২ জুন , (ডেইলি টাইমস২৪):

ঈদের দিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকেই মাইক দিয়ে তাকবীর পড়া শুরু। একজন মাইকে তাকবীর বলেন, বাকি মুসল্লীগণ সবাই তাকবীর পড়েন। এভাবে পূর্বনির্ধারিত সময় পর্যন্ত তাকবীর শেষে জামাত শুরু হয়। নামাজ শেষে সকলের সাথে মুসাফাহ পর্ব শেষ করে নিচতলায় আসেন মুসল্লীগণ। আরবী বিরিয়ানীসহ নানা আইটেমের খাবার মুসল্লীদের আপ্পায়নের জন্য প্রস্তুত ছিল আগে থেকেই। মিলেমিশে দীর্ঘক্ষণ চললো খাবার পর্ব।

আমরা আমাদের রুমে চলে আসলাম। কিছু সময় ঘুমিয়ে বাইক নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। অনেক ঘুরাঘুরি হয় গ্রামীণ পরিবেশে। সবুজ-শ্যামল ধান ক্ষেত। এ যেন আমি বাংলার বুকে আছি। মনে প্রশান্তি নেমে আসে। তাছাড়া গ্রামীন প্রকৃতি আমার খুওব পছন্দ। তাই ইট পাথরের শহর কুয়ালালামপুর ছেড়ে চলে আসি বন্ধু এইচএম আদিব এর এলাকায়। আমার মতো তিনিও মালয়েশিয়ায় আছেন, আমি পড়ালেখা করতেে এসেছি, তিনি আছেন শিক্ষক হিসেবে। তার ভাইসহ আরেকজন সঙ্গে ঈদের দিনটি পার হয়।

মূল উৎসব
পরের দিন থেকে শুরু হয় মালয়দের ঈদের মূল উৎসব। প্রত্যেকে দলবেধে প্রতিবেশীর বাড়ীতে সাক্ষাৎ পর্ব। প্রায় ৩২টি পরিবারে এভাবে দলবেধে যাওয়া হবে। আমাদেরও সেই সফরে যাওয়ার জন্য দাওয়াত করা হয়। সাকাল বেলা একজন বৃদ্ধ লোক আমাদেরকে নিতে আসেন। আমার সাথে চলে আদীব। তাকে নিয়ে রওনা হয়ে যাই।
লক্ষ্য কুয়ালা সিলাঙ্গর জেলার সাওয়া সিম্পাদান গ্রাম; যা পড়েছে তানজুং কারাং থানায়। অর্ধশতাধিক মোটর বাইকের একসাথে চলার অনুভূতিটা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না।

প্রথমে একজন সরকারী কর্মকর্তার বাসায় গেলাম আমরা। মেহমান ৮০ জনেরও বেশি হবে শিশুসহ। বাসায় পৌছানোর পর সকলের সাথেই ঘুরেঘুরে মুসাফাহ করি। এটা তাদের সংস্কৃতি। বাচ্চাদেরকে প্রত্যেক বাসায় মেজবানের পক্ষ থেকে ঈদের হাদিয়া দেয়া হয় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। এতে বাচ্চারা অনেক আনন্দ অনুভব করে। তারা কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে টাকাগুলো সেখানে জমা করে।

এভাবে ৩২পরিবার থেকে যা হাদিয়া পাবে তাতে বাচ্চাদের কয়েক মাসের টুকিটাকি খরচ হয়ে যাবে। প্রত্যেক বাসায় সকলের জন্য আপ্পায়নের ব্যবস্থাও থাকে। হরেক রকমের খানার আয়োজন। যার যা মন চায় নিজ হাতে খেতে পারে। তাছাড়া মালয়দের রেওয়াজ এটাই। যে কোন অনুষ্ঠানে সবকিছু নিজ হাতে নিয়েই খেতে হয়। এমনকি হোটেলেও।

তাদের আচার আচরণ দেখে আমাদের দেশের ১৫/২০বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। কত মিল-মুহাব্বাত ছিল প্রতিবেশীর প্রতি একে অপরে। এক বাসায় তরকারি না থাকলে পাশের বাসায় লজ্জা ছাড়াই খানার প্লেট নিয়ে চলে যাওয়া। এছাড়াও আর কত মধুর সম্পর্ক আমরা দেখেছি- যা এখন অতীত এবং মানুষের কাছে ঘৃণার কাজ মনে হবে। বর্তমানের আধুনিক ছেলেরা এসবকে কল্পনা বা গল্পের বইয়ের কিসসা মনে করবে। যাহোক, যতক্ষণ মালয়দের মিলনমেলা অনুষ্ঠানে ছিলাম ততক্ষণ এসবই আমার মনে ভাসছে। কী ছিল আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধ, আর কী হয়ে গেল!

এখানে প্রতিটি পরিবার থেকে বিদায়ের সময় দরূদ শরীফ পাঠ করা হয়। সহীহ শুদ্ধ দরূদ পাঠ করা হয়। আর মাশাআল্লাহ- এখানে তাদের শিশু-বৃদ্ধ সকলের তেলাওয়াতই শুদ্ধ। এটাই মালয়দের অনেক বড় সফলতা।

অনেকে মালয়দের ঈদ /সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে তাই লিখলাম। আজ এতোটুকুই… আবার আরেক দিন লিখবো।

জান্নাত আল ফাতেহ
(শিক্ষার্থী, সায়েন্স ইসলাম, মালয়েশিয়া)

তারা এই সময়টাকে বিভিন্নভাবে উদযাপন করে। আমরা বাংলাদেশিরা যেমন ঈদে নাড়ির টানে গ্রামে ফিরি তারাও ঈদে গ্রামে চলে আসে।

ঈদের দ্বিতীয় দিন সকাল ৮টায় গ্রামবাসী সকলে একত্রিত হয়। সবাই নিজেদের মোটর সাইকেল নিয়ে আসে। তারপর একেক করে গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে যায়৷ সেখানে তারা কুশলাদি বিনিময় করে। হালকা নাস্তারও ব্যবস্থা থাকে। তারপরে ঘরের মালিকের কল্যাণকামনা করে সংক্ষিপ্ত দোয়া করে নেয় সকলে।

সেখানের আরেকটা বিষয় চোখে পরার মতো, সেটা হলো সকল বাঁচ্চা শিশুদেরকে ঈদ-বোনাস হিসেবে টাকা দেওয়া হয়। শিশুরাও বড় বড় মানিব্যাগ নিয়ে খুশিতে বড়দের সাথে সাথে প্রত্যেকটা ঘরে যায়। প্রত্যেক বাড়িতেই সকল শিশুকে ঈদ বোনাস হিসাবে টাকা দেওয়া হয়। শিশুদের এই আনন্দের বিষয়টা অতুলনীয়।

আগের দিন ঈদের নামাজের সময় মাইকে ইমাম সাহেব আমার নাম উল্লেখ করে স্পেশাল দাওয়াত দিয়েছিলেন যেন এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। পরদিন সকাল ৮টা বাজতেই দেখি মোটরসাইকেল নিয়ে আমাদেরকে নিয়ে যেতে লোকও চলে এসেছেন। তারপরে আমরাও অংশগ্রহণ করি এই অনুষ্ঠানে তাদের সাথে।

আমার সাথে ছিলেন আমার বড় ভাই রবিউল্লাহ মাসউদ। আমার হিফজ খানার সাথী জান্নাত আল ফাতেহ্ ও আমার প্রিয় একজন বন্ধু সিয়াম- যিনি ইউনিভার্সিটি উতারা মালয়েশিয়াতে অধ্যায়নরত আছেন।

এই অনুষ্ঠানের সাথে সাথে সবার সাথে এবারের ঈদটাও বেশ সুন্দর কেটেছে। আলহামদুলিল্লাহ।

এইচ এম আদিব
(শিক্ষক, পুন্ডক মোটিভাসি হামলাতুল কুরআন মাদরাসা, মালয়েশিয়া)

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button