জাতীয়

জামায়াতকে নিয়েই পথ চলবে বিএনপি

 ডেইলি টাইমস্২৪: দলের ভেতরের বড় একটি অংশের তুমুল আপত্তি এবং দেশী-বিদেশী চাপ সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়েই আপাতত পথ চলবে বিএনপি। এ লক্ষ্যে বিশদলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী এই দলটি তাদের অন্যতম এই শরিকের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কোন্নয়নেরও উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে জামায়াতের ইফতার পার্টিতে অংশ নিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দেশী-বিদেশীদের মনোভাব উপেক্ষা করে খালেদা জিয়া জামায়াতের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ায় বিএনপির বড় একটি অংশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিএনপি ও জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে বিএনপির নীরব অবস্থান। অন্যদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাসহ নানা কারণে এই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন উভয় দলের একাধিক নেতা। সর্বশেষ তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে এই দূরত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

এ দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির ভেতরের বড় একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য খালেদা জিয়ার ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে যোগ হয় দেশী-বিদেশী নানা মহলের জামায়াতবিরোধী মনোভাব। বিদেশী শক্তিগুলোও চায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করুক।

এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে ৬ জুন ৩৬ ঘণ্টার সফরে ঢাকায় আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরের দ্বিতীয় দিন তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে হোটেল সোনারগাঁওয়ে প্রায় ১৫ মিনিট রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এই বৈঠকেও বিএনপি-জামায়াতের সখ্য নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয় নরেন্দ্র মোদি এবং খালেদা জিয়ার মধ্যে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়বেন বলে নরেন্দ্র মোদিকে আশ্বস্ত করা হয়। কিন্তু সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক কৌশল, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ইফতার রাজনীতিতে।

বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক শীর্ষ নেতার মতে, দুই দলের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যাওয়ার অপেক্ষায় ঠিক সেই মুহূর্তে ইফতার রাজনীতির সুযোগ নিয়ে নতুন করে আবার কাছাকাছি আসার চেষ্টা চলছে তাদের। দীর্ঘদিনের মান-অভিমান ভুলে রাজনীতির মাঠে বিএনপি এবং জামায়াতের নতুন করে একসঙ্গে পথচলার নীতিগত অবস্থান ইফতার পার্টির মধ্য দিয়ে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

জামায়াতের ইফতার পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড ভোগ করেছেন এমন দুই শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লার সন্তানদেরও দেখা গেছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইনের ছেলেসহ যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদেরও দেখা গেছে। এ সময় দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সন্তানরাও উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়া দেরিতে উপস্থিত হওয়ায় বক্তব্য রাখেননি। কিন্তু ইফতার শেষ করে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদেরও কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন তিনি। খালেদা জিয়া ঘাতকদের সন্তানদের সময় দেয়ায় দলের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি নেতাদের মতে, জামায়াত কৌশলে ঘাতকদের সন্তানদের সঙ্গে খালেদা জিয়াকে বসিয়ে দিয়ে নতুন বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে। এই বার্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকতে পারে বলে তারা আশংকা প্রকাশ করেন।

জোটের নেতাদের মতে, ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি জামায়াতের সঙ্গে নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধারই প্রস্তুতি। এ ঘটনা প্রমাণ করে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলতে চায় বিএনপি। মুখে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে যাই বলুক না কেন, বাস্তবে বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলন এবং ভোটের রাজনীতিতে তাদের মাইনাস করতে নারাজ। খালেদা জিয়াও চান না জামায়াতের সঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে।

জামায়াতের ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের শরিকরাও সহজভাবে নেয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শুক্রবার প্রতিবেদককে বলেন, জামায়াতের ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি প্রমাণ করে তিনি এবং জামায়াত এক সুতায় বাঁধা। তিনি (খালেদা জিয়া) আর পাল্টাবেন না।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এই প্রতিবেদককে বলেন, খালেদা জিয়া বিএনপি ছাড়তে পারলেও জামায়াত ছাড়তে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়া জামায়াতের ইফতার পার্টিতে গিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের পাশে গিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, আমি আপনাদের পাশে আছি। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়া মূলত জামায়াতকে সাহস জোগাতে ইফতার পার্টিতে গিয়েছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াতের ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি বিএনপির একটি বড় অংশ ভালো চোখে নেয়নি। দলের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও এতে যোগ দেননি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী ছাড়া দলের আর কোনো শীর্ষ নেতাকে জামায়াতের ইফতার পার্টিতে দেখা যায়নি।

তবে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান শুক্রবার প্রতিবেদককে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে তো আমাদের দলের আদর্শিক কোনো মিল নেই। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের দল। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক। তারা যতক্ষণ ২০ দলীয় জোটে আছে তৎক্ষণ জামায়াতের সঙ্গে জোটগত সম্পর্ক থাকবে। যদি সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে, সেক্ষেত্রে বিএনপি তো আর নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না।

তবে জামায়াতের ইফতার পার্টিতে অংশ নেয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী আত্মপক্ষ সমর্থন করে এই প্রতিবেদককে শুক্রবার বলেন, জামায়াত ছাড়ার বিষয়ে দেশী-বিদেশী কে কি বলল সেটা বড় কথা নয়। বিএনপি বা খালেদা জিয়া কি বলল সেটাই হল বড় কথা। যদি জোট না থাকে তখন দেখতে পারবেন। যেহেতু এখনও বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট রয়েছে, সেহেতু জামায়াতের আমন্ত্রণে যাওয়া কোনো দোষের নয়।

সূত্র জানায়, এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. অলি আহমদ, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মো. ইবরাহিম, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ভাসানী ন্যাপের চেয়ারম্যান মো. আজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গণি, মুসলিম লীগের সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান, সাম্যবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাঈদ আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তফিজুর রহমান ইরান, এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোস্তফা, ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব সাইফুদ্দিন আহমদ মনি, পিপলস লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাহবুব হোসেনসহ বিশদলীয় জোটের নেতারা ইফতার পার্টিতে অংশ নিলেও তাদের বেশির ভাগই গেছেন মুখরক্ষায়।

জামায়াতের ইফতার পার্টিতে সভাপতিত্ব করেন দলটির নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার বক্তব্যে ইফতার পার্টিতে উপস্থিত বিএনপিসহ বিশদলীয় জোটের বেশির ভাগ নেতা তার এ বক্তব্যে নাখোশ হন। তাদের অনেকেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ ধরনের বক্তব্য শুনে উষ্মা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের বক্তব্য শুনে অনেকেই হতবাক হন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশদলীয় জোটের শরিক একটি দলের একজন শীর্ষ নেতা এ প্রসঙ্গে শুক্রবার প্রতিবেদককে বলেন, তারা মুখরক্ষায় গিয়েছিলেন। ওই নেতা আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা জামায়াতের ভুল ছিল। এখনও তারা এই ভুল স্বীকার না করে উল্টো আরও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলছে। রাজনৈতিকভাবে যা ২০ দলীয় জোটকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এ প্রসঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ এই প্রতিবেদককে বলেন, বিএনপির সঙ্গে তারা জোটবদ্ধ আছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন এই জোটের শীর্ষ নেতা। আমরা তাকে দাওয়াত দিয়েছি। তিনি তা রক্ষা করেছেন। এখানে সম্পর্কের অবনতি কিংবা উন্নতির কিছু নেই।-যুগান্তর

[icon name=”*”]
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button