জাতীয়

দলীয় পরিচয় থেকেই বাংলা কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগের প্রেমে পড়ে বৃষ্টি : অতপর শারীরিক সম্পর্ক, সবশেষে আত্মহত্যা

ডেইলি টাইমস্২৪:   বাংলা কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম জাহিদ সোহাগের প্রেমের নামে প্রতারণার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া সেই ফাতেমা-তুজ-জোহরা বৃষ্টি নিজেও কাফরুল থানা ছাত্রলীগের ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন তিনি। আর পড়তেন সরকারি বাংলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষে।
তা প্রেমিক সোহাগ একই কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। একই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সুবোধে দু’জনের মধ্যে পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম ও পরে তার শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়।
এক পর্যায়ে বৃষ্টি অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে আসল চেহারা বেরিয়ে আসে সোহাগের। বৃষ্টি বারবার তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলেও সোহাগ এতে রাজি না হয়ে উল্টো গর্ভপাতের জন্য চাপ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগই বন্ধ করে দেয়।
অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবি নিয়ে লোকলজ্জা উপেক্ষা করে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় বৃষ্টি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতার কাছেও গিয়েছিলেন তিনি। বৃষ্টির চোখের পানি কারো মনই গলাতে পারেনি। সবাই ‘দেখব’ ‘দেখছি’ বলে লোক দেখানো সান্ত্বনার বাণী শোনান। এমনকি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরাও বিষয়টি জানতেন। তারাও কেউ বিষয়টি সুরাহা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এমনকি বৃষ্টির মৃত্যুর পরও তার পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি।

হ্যাঁ, সব হারিয়ে শেষ পর্যান্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বৃষ্টি। ১৩ই জুন নিজ বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে নিয়ে যান হাসপাতালে। সেখানে ৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর মৃত্যুর কাছে হার মানে। ১৯ শে জুন তার মৃত্যু হয় হাসপাতালে।
শুক্রবার বৃষ্টির পরিবারের সদস্যরা জাহিদের বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু খবর পেয়ে জাহিদ ও তার সহযোগীরা থানায় গিয়ে বৃষ্টির পরিবারের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। মামলা না নিতে চাপ দেয় পুলিশকেও। কিন্তু শেষে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশ মামলা নিয়ে গ্রেফতার করে জাহিদকে।

তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের মিরপুর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) কায়েমুজ্জামান বলেন, জাহিদকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। যদি প্রয়োজন হয় তবে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

নিহত বৃষ্টির স্বজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃষ্টি ও জাহিদ দুইজনই ছাত্রলীগের কলেজ শাখার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর সূত্র ধরেই দুইজনের পরিচয়। পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ তার সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করেন। কয়েক মাস আগে বৃষ্টি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই জাহিদ বৃষ্টিকে এড়িয়ে চলা শুরু করে।

একপর্যায়ে বৃষ্টিকে বুঝিয়ে অ্যাবরশন করানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বৃষ্টি অ্যাবরশন করতে রাজী হয়নি। এরপর থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয় জাহিদ। কিন্তু মাঝেমধ্যেই জাহিদ তার কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান অনিক, জাহিদ মুন্সি, আবদুল আজিজ ওরফে তানভীর, শাকিল আহমেদ ও চঞ্চল দাসসহ বৃষ্টি ও তার পরিবারকে নানারকম ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করতে নিষেধ করা হয়।

এ বিষয়ে গত ২রা মে কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে বৃষ্টি। জিডি নং ৭২। কিন্তু আসামিরা ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি। নিজে ছাত্রলীগের পদধারী নেত্রী হলেও অন্যায়ের কোনও বিচার না পেয়ে ক্রমেই বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছিলেন বৃষ্টি।

বৃষ্টির পরিবারের সদস্যরা জানান, পূর্ব শেওড়াপাড়ার ১৩২০ নম্বর বাড়ির ৫ম তলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন বৃষ্টি। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী।

১৩ই জুন জাহিদ ও অনিকসহ অন্যরা বৃষ্টির বাসায় যায়। এ সময় তারা বৃষ্টিকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে। এই অপমান সইতে না পেরে সেদিনই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখান থেকে নেয়া হয় কেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে। সেখানেই ৬ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু হয় তার।

পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই মেয়েকে গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় নিয়ে দাফন করেন। পরে বিস্তারিত জানতে পেরে গত শুক্রবার মামলা করেন। মামলা নম্বর ৮২। মামলায় সরকারি বাংলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান অনিককেও আসামি করা হয়েছে।

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জাহিদ সরকারি দলের এক এমপির ঘনিষ্ঠ। তার রাজনীতি করার কারণেই এত বড় অন্যায় করেও বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রভাবশালী একজনের বাড়িও জাহিদের এলাকায়। তারও নেপথ্য সহযোগিতা রয়েছে। এদের কারণে পুলিশ প্রথমে মামলাও নিতে চায়নি। পরে মামলা নিলেও কেবল আত্মহত্যার প্ররোচনার ধারাটি উল্লেখ করা হয়েছে। থানায়ও জামাই আদরে ছিলেন জাহিদ। আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কোন রিমান্ডও চায়নি পুলিশ।

উল্টো জাহিদকে গ্রেফতারের পর থেকেই একের পর এক হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নিহত বৃষ্টির পরিবারের সদস্যরা। নিহত বৃষ্টির মামা জুয়েল রানা বলেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তারা জাহিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

[icon name=”*”]

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button