আইন ও আদালত

দুই বিচারপতিকে সতর্ক করলেন আপিল বিভাগ

ডেইলি টাইমস ২৪:  বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি বরাদ্দের লিজ বাতিলসংক্রান্ত রায়ের সমালোচনা করে মন্তব্য করায় হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতিকে সতর্ক করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চের দেয়া এ সংক্রান্ত রায় গত সপ্তাহে প্রকাশ হয়েছে। বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি ছিলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘আমরা আশা করি ভবিষ্যতে বিচারপতিদ্বয় বিচারিক শৃংখলা, প্রচলিত নিয়ম এবং শালীনতা বজায় রাখবেন। তারা একই ধরনের ভয়ানক মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করবেন না। আইন ও তাদের শপথ ভঙ্গ থেকে নিবৃত্ত থাকবেন যাতে করে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থার ক্ষয় না হয়।’

‘মো. বাহাউদ্দিন ভার্সেস জয়নাব বিবি’ শীর্ষক রিভিশন মামলাটির বিচার শেষে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। এ রায়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার বাড়ির রেজিস্ট্রিকৃত লিজ দলিল বাতিলসংক্রান্ত সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের রায়ের বিষয়টি টেনে এনে সমালোচনা করা হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি শরিফ উদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের দেয়া ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘যে মামলাটি বর্তমান বাদী (বাহাউদ্দিন) দায়ের করেছেন, তাতে আমাদের কাছে বিষয়বস্তু খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে আমাদের বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, রেজিস্ট্রিকৃত দলিল প্রশাসনিক আদেশে বাতিল আইনসিদ্ধ কিনা। এখানে হয়তো বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলাটির উল্লেখ করতে পারেন। যেখানে তার বাড়ির রেজিস্ট্রিকৃত লিজ দলিল প্রশাসনিক আদেশে বাতিল করা হয়েছিল। সেই আদেশ হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ বহাল রেখেছেন। এ সিদ্ধান্তটি ছিল উপমহাদেশের একমাত্র সিদ্ধান্ত যা কোনো আইনের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হয়নি। কিন্তু কিছু অধিকতর উন্নত আইনের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। যে কারণে রায়টি দেয়া হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত আইনের বা রীতির বাইরে গিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত তা সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।’

এ রায়টি লেখেন বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার এবং তাতে স্বাক্ষর করেন বিচারপতি একেএম সাহিদুল হক। পরে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে জয়নাব বিবি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। একই সঙ্গে এই রায়ের পর্যবেক্ষণ আপিল বিভাগের নজরে নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে প্রধান বিচারপতির কাছে একটি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ এপ্রিল আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ রায় প্রদানকারী ওই দুই বিচারপতির কাছে ৭ দিনের মধ্যে ওই মন্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ পাঠান।

আপিল বিভাগের ওই নোটিশে বলা হয়, ‘আমরা ওই রায়টি (হাইকোর্টের) পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করেছি। আমরা লক্ষ্য করেছি যে বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার এবং একেএম সাহিদুল হক খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলার ক্ষেত্রে দেয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের দক্ষতা, সততা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তারা বাড়িটির মামলায় হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখায় এই বিভাগের (আপিল বিভাগের) বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখার ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন।

এই টিপ্পনী কাটার বিষয়টি তুলে ধরে আপিল বিভাগের নোটিশে আরও বলা হয়, ‘বিজ্ঞ বিচারপতিরা এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যেন হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তাদের অধস্তন। এছাড়া আমরা লক্ষ্য করেছি, ওইসব মন্তব্য আদৌ রুল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ছিল না। অধিকতর বিচারপতি শরিফ উদ্দিন চাকলাদার যিনি রায়টির লেখক তিনি এর আগেও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। আগের প্রধান বিচারপতি এবং এই বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরা তখন তার কাছে মৌখিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন।

তখন ওই বিচারপতি ভবিষ্যতে রায় দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন উল্লেখ করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন, তিনি ভবিষ্যতে একই ধরনের মন্তব্য এবং পর্যবেক্ষণ দেয়া থেকে বিরত থাকবেন। হাইকোর্টের বর্তমান রায়ে একটা রাজনৈতিক দলের নেত্রীর বাড়ির বিষয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি টিপ্পনী কেটেছেন। আমাদের সন্দেহ না করার কোনো কারণ নেই যে, বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ওইসব মন্তব্য করেছেন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে যা দৈবক্রমে বা অনিচ্ছাকৃত ছিল না।

পরে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অশ্রদ্ধা করার কারণে কেন যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা জানতে চেয়ে বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হককে নোটিশ গ্রহণের ৭ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। নোটিশ পাওয়ার পর উভয় বিচারপতি রায়ের মধ্যে বিরূপ মন্তব্যের কারণে আপিল বিভাগের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেন। ১১ মে এ বিষয়ে আপিল বিভাগে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন আপিল বিভাগ রেজিস্ট্রি লিজ দলিল বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে নিু আদালতের রায় বহাল করেন।

গত সপ্তাহে ওই রায়ের কপিতে স্বাক্ষর হয়। রায়ে বলা হয়েছে, ‘ওই মামলায় (খালেদা জিয়ার বাড়ির লিজ বাতিলের মামলায়) আইনি বিষয় যুক্ত থাকার বিষয়টি বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার অনুধাবন না করেই ওইসব মন্তব্য করেছেন। খালেদা জিয়ার মামলায় কোনো কর্তৃপক্ষ দ্বারা রেজিস্ট্রি দলিল বাতিল হয়নি। খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানো পৃথক দুটি নোটিশের মাধ্যমে ওই সম্পত্তি ফেরতের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী নোটিশে বলা হয়েছিল, ‘ওই জমি ছিল ক্লাস-১ সেনাবাহিনীর জমি। যা সেনানিবাসের ভূমি প্রশাসক রুলস-১৯৩৭ এর ৫(১) উপবিধি অনুযায়ী একটি সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে। এ ধরনের জমি একজন বেসামরিক লোকের কাছে লিজ দেয়ায় তা বাতিল করা হয়েছিল।’

হাইকোর্ট বিভাগ এই মত গ্রহণ করেছিলেন যে, সেনাবাহিনীর ক্লাস-১ জমি প্রকৃতিগত ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কোনো বেসামরিক ব্যক্তিবিশেষকে সারা জীবনের জন্য লিজ অথবা হস্তান্তর করতে পারে না। বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার এটা লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যদি তিনি (বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার) এটা উপলব্ধি করতেন যে হাইকোর্ট বিভাগের অন্য একটি দ্বৈত বেঞ্চ ওই মত গ্রহণ করেছিলেন, তাবে সেটা সঠিক ছিল কিনা তা নিয়ে সমালোচনা করতে পারতেন না।

রায়ে বলা হয়েছে, আইনগত প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো দ্বৈত বেঞ্চ যদি অপর একটি দ্বৈত বেঞ্চের মতামতের সঙ্গে একমত না হতে পারেন তবে হাইকোর্ট রুলসের অধ্যায় ৭-এর বিধি-১ অনুযায়ী সেটা নিষ্পত্তির জন্য বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করতে প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠাতে পারেন। উভয় বিভাগের বিচারপতিদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত।’

‘শেরআলী ভার্সেস স্টেট’ (৪৬ ডিএলআর(এডি) ৬৭) মামলার নজির টেনে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে- এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আপিল বিভাগকে সতর্ক করে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, ‘সংসদের কোনো আইন অথবা সংবিধানের ব্যাখ্যায় সুপ্রিমকোর্টকে অবশ্যই যতœবান হতে হবে। এক্ষেত্রে তাকে দেখতে হবে, তিনি যেন নিজেই সংবিধান দ্বারা সংরক্ষিত ক্ষমতাকে অতিক্রম না করেন।’ এই বিষয়ে শুনানিকালে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা ওই পর্যবেক্ষণকে ভয়ানক উল্লেখ করে তা আইন বা সংবিধানকে লংঘন করেছে কিনা সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে তার বক্তব্য দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য ছিল যে, ওই পর্যবেক্ষণ ছিল আদালত অবমাননার পাশপাশি সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের লংঘন। তিনি এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের জন্য তিনটি বিকল্প তুলে ধরেছিলেন। (এ) আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা (বি) বিষয়টি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠিয়ে দেয়া এবং (সি) বিচারপতিদ্বয়কে সতর্ক করে দেয়া। আমরা এ ক্ষেত্রে তিন নম্বর (সি) কোর্স অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

মোহাম্মদপুর এলাকার একটি সম্পত্তি ১৯৯৮ সালের ৭ ডিসেম্বর মো. বাহাউদ্দিনের নামে রেজিস্ট্রি লিজ দলিল সম্পন্ন হয়। যে জমির মালিকানা জয়নাব বিবি দাবি করলে ওই রেজিস্ট্রিকৃত লিজ দলিল ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বাতিল হয় প্রশাসনিক আদেশে। এই রেজিস্ট্রি লিজ দলিল বাতিল আদেশ চ্যালেঞ্জ করে বাহাউদ্দিন নিু আদালতে মামলা করেন। নিু আদালত জয়নাব বিবির পক্ষে রায় দেন। এই রায় রিভিশন চেয়ে বাহাউদ্দিন হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। হাইকোর্টের দেয়া রায়ে জয়নাব বিবি হেরে যান। পরে জয়নাব বিবি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগ রিভিশন মামলায় হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল করে দেন। পাশপাশি জয়নাব বিবির পক্ষে নিু আদালতের দেয়া রায় বহাল রাখেন।

অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে শহীদ মইনুল রোডে খালেদা জিয়ার বাড়ি বরাদ্দ বাতিলের বিষয়ে ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই বছরের ২০ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে ১৫ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে নোটিশ দেয় সামরিক ভূমি কর্তৃপক্ষ। এ নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়া ওই বছরের ৩ মে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। এরপর ২০১০ সালে খালেদা জিয়ার রিট খারিজ করে হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে বাড়ি বরাদ্দ বাতিলের নোটিশের বৈধতা দেয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়া আপিল করলেও তা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই খালেদাকে ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপিল নট প্রেস রিজেক্ট করে নেন।

[icon name=”*”]
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button