জাতীয়মুক্তমত

কী হচ্ছে সংসদে !

sঢাকা,ডেস্ক,(ডেইলি টাইমস২৪) জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। কিন্তু সংসদে জাতীয় সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। সংসদ সদস্যদের কাছে এ নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়নি। অথচ দাবি করা হয় বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতির এখন সবচেয়ে সুসময় যাচ্ছে। কিন্তু দেশের জাতীয় সমস্যা নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা নেই। জাতীয় জীবনকে স্পর্শ করে এমন বিষয় নিয়ে সংসদে কেউ আলোচনায় আগ্রহী আছে বলে মনে হয় না। যেমন চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল পরিমাণ কোকেন উদ্ধার হলো, পুলিশের একজন কর্মকর্তার গাড়ি থেকে উদ্ধার হলো বিশাল ইয়াবার চালান, বিমানবন্দরে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে স্বর্ণ। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের মধ্যে এর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এই সংসদ যেন ভিন্ন জগতে রয়েছে। অথচ সংসদ হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় জবাবদিহিতার স্থান। এসব বিষয় ছাড়াও ৪০০ কোটি টাকার নিম্নমানের গম আমদানি নিয়ে সরকারকে এখন পর্যন্ত সংসদে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি। টুঁ শব্দটি কেউ করেনি। সরকারের এমন সব কাজ নিয়ে ক্ষমতার অংশীদার সংসদে বিরোধী দল পর্যন্ত কোনো কথা বলছে না। জনগণের সব কিছু জানার যে অধিকার রয়েছে তা নিয়ে এই সংসদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
বিরোধী দলকে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যে গুরুত্ব দেয়া হয়, এখানে সে গুরুত্ব নেই। যতটুকু রয়েছে তা-ও ব্যবহার করা হচ্ছে না। যুক্তরাজ্যে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে। এসব ছায়া মন্ত্রী সরকারের বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেন। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরকারের সমালোচনা করে সংবাদপত্র। কোনো অনিয়ম হলে চার দিক থেকে সরকারের সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন অন্যরকম সংসদীয় গণতন্ত্র চলছে। সংসদে ক্ষমতাসীন দলের প্রশংসায় সবাই ব্যস্ত। অপর দিকে সংবাদপত্র ব্যস্ত সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দল নিয়ে। এ দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অনেকটাই সরকারের প্রচারণার অংশ হয়ে গেছে। সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী জোট কবে ভাঙবে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়ছে কি না, খালেদা জিয়ার সাথে কেউ নেই- এ ধরনের খবর নিয়ে আমাদের সংবাদপত্র বেশি ব্যস্ত। অথচ সরকারের ভেতরে অস্থিরতা, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা সংসদের অকার্যকারিতা নিয়ে খুব কমই গণমাধ্যমের আগ্রহ আছে।
সংসদে বিরোধী দল নামকাওয়াস্তে হলেও তাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব তারা সংসদে ভেতরে বা বাইরে কোথাও পালন করতে পারছে না। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব সমস্যা নিয়ে সরকারের সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। এ নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের কোনো আগ্রহ আছে বলেও মনে হয় না। ফলে সরকারে জবাবদিহিতা করার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। কয়েক দিন আগে বিএনপির চেয়ারপারসন মন্তব্য করেছেন, এই সংসদ এখন গানবাজনার আসরে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দলের যে চরিত্র হওয়া দরকার, তার ধারেকাছে জাতীয় পার্টি যায়নি। সংসদে আলোচনা হলে সাধারণ মানুষ অন্তত জানতে পারত দেশ কীভাবে চলছে, কোথায় যাচ্ছে। সরকারের প্রয়োজনে দরকার ছিল সংসদকে কার্যকর করে তোলার। তাদের যাত্রাপথে কোথায় তারা ভুল করছে বুঝতে পারত।
সংসদের বাইরে যে বিরোধী দল রয়েছে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা সরকারের সমালোচনা করছে বটে, এই সমালোচনা কেবল রাজনীতিকেন্দ্রিক। অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে সরকারের ব্যর্থতার দিকগুলো তুলে ধরতে পারছে না। বিরোধী দলের যারা মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন, তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, তথ্য প্রমাণ এমনকি এজেন্ডা নির্ধারণে যে দক্ষতা দরকার তার অভাব রয়েছে। অবশ্য বিরোধী দলের প্রথম সারির সব নেতা এখন কারাগারে বা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রকাশ্য নেতৃত্বের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন দল প্রচারণার সুযোগ নিয়ে এমন একটি আবহ তৈরি করছে, যেন দেশ রকেট গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে সাধারণ মানুষ অবর্ণনীয় অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও রাজনৈতিক অধিকার হারিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই কণ্ঠস্বর কেউ তুলে ধরছে না।
আওয়ামী লীগের সংসদীয় রাজনীতির চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরতে হবে। সংসদ নিয়ে কখনোই আওয়ামী লীগ উৎসাহী ছিল না। স্বাধীতার পর প্রথম যে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছিল তার করুণ পরিণতি দেশের মানুষ দেখেছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এখন আবার সরকার সেই পথে চলছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থার দিকে ক্ষমতাসীনদের নজর রয়েছে কি না তাই বা কে বলতে পারে।
স্বাধীনতার পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এমনকি আওয়ামী লীগের নামটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। সেই একদলীয় শাসনের স্মৃতি এ দেশের মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। আবারো আওয়ামী লীগ সে পথে হাঁটছে। বর্তমান সংসদে যে বিরোধী দল, সেই দল কার্যত ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বাহন মাত্র। রাজনৈতিক দল যদি স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারে সে দল দেশের জন্য এমনকি দলের জন্য বড় কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। জাতীয় পার্টির পক্ষেও দেশের রাজনীতিতে কোনো অবদান রাখা সম্ভব নয়। বাকশাল গঠনের সময় যেমন অনেক দল বিলীন হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় পার্টি এখন অনেকটা ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ যেভাবে পেছন ফিরে হাঁটছে তাতে জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠানের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে। একই সাথে সংবাদপত্রের ওপর অনেকটাই অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে সরকারের সমালোচনার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো দেশে যদি বাধাহীনভাবে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকারকে লাগামছিন্ন ঘোড়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সেই ঘোড়া সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে ফেলতে পারে। দেশে আমরা সে রকম পরিস্থিতি দেখছি।
সংসদ চলছে, আর এ অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সে আলোচনার কোনো ধার নেই। অধিবেশনে দেশের সমস্যা নিয়ে যে কথাবার্তা হয়েছে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এ সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ঘটনা ঘটছে। অথচ পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক লক্ষ করা যায়নি। ভারতের সাথে সম্প্রতি বেশ কিছু চুক্তি হয়েছে। এ চুক্তিগুলো নিয়ে অধিবেশনে আলোচনা তর্ক-বিতর্ক হতে পারত। দেশের মানুষ তাহলে জানতে পারত। ছিটমহলগুলো নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সমাঝোতায় উপনীতি হয়েছে। তা নিয়ে সংসদের ভেতরে কোনো আলোচনা নেই। আলোচনা হলে এসব চুক্তির লাভ-ক্ষতির বিষয়টি জানা যেত। সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকার পরও সরকার এসব বিষয় নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হচ্ছে না। সব দিক থেকে সরকার যেন জনগণকে অন্ধকারে রাখতে চাইছে।
এখন সরকারের তিন মন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। মন্ত্রী তিনজন হচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও লতিফ সিদ্দিকী। যদিও লতিফ সিদ্দিকী এখন আর মন্ত্রী নন। এর আগে এক মন্ত্রী এভাবে আলোচনায় এসেছিলেন। তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তার অর্থ কেলেঙ্কারি বিষয় নিয়ে সর্বত্র কথা হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সময় বিত্রনপির এক মন্ত্রী সন্ত্রাসীকে নিজ বাসভবনে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এর ফলে সেই মন্ত্রী ছাড়াও গোটা সরকারে বিপাকে পড়ে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। এখন তিন মন্ত্রীর একজনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়া হলেও অন্য দু’জন বহাল আছেন। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মোফাজ্জল হোসেন মায়ার ছেলের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। এবার নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার সাথে তার সেনা কর্মকর্তা জামাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগে কারাগারে আছেন। এবার খোদ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত রায় দিয়েছেন। আর খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ছিলেন পাবলিক প্রসিকিউটর। সে সময় তার অদক্ষতার জন্য আদালত তাকে সতর্ক করেছিলেন। এবার পচা গম আমদানি করে লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছেন।
এ নিয়ে গোটা দেশে সমালোচনা হলেও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। সংসদে এসব বিষয়ে কথা হয়নি। বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধী দল আলোচনার দাবিও করেনি। অপর দিকে সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মন্ত্রীদের এসব দুর্নীতি ও আইন লঙ্ঘনের ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে না।
সরকার দাবি করে এটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার। সরকারের আচরণে তার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কথায় ও কাজে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার কোণঠাসা করে ফেলেছে। মুক্ত পরিবেশ ও সহাবস্থানের নীতি বহু আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। এখন চলছে বিরোধী দল মাঠে ময়দানে নিপীড়নের মাধ্যমে নিঃশে^স করার নীতির বাস্তবায়ন। বিরোধী দলের ঘরোয়া রাজনৈতিক অনুষ্ঠানগুলো যাতে না হতে পারে পুলিশ দিয়ে সব আয়োজন ভণ্ডুল করে দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ কর্মসূচি পালন করার সুযোগ পাচ্ছে না। ইফতার মাহফিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সভা-সমাবেশ করা জনগণের মৌলিক অধিকার। সে অধিকারগুলো ক্ষুণ্ন করা সংবিধানের প্রতি তোয়াক্কা না করার শামিল।
অবশ্য সংবিধানের প্রতি ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া গেছে সংবিধানের সর্বশেষ সংশোধনী পাস করিয়ে নেয়ার মধ্যে। সংবিধানের এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনদের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম হতে পারে। সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ যে ক্ষমতা পেয়েছে তাতে ক্ষমতার ভারসাম্য আর থাকছে না। এখন যে সংসদ গঠিত হয়েছে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এই সংসদ সদস্যদের জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিতা নেই। বর্তমান সংসদও চলছে জবাবদিহিতাহীনভাবে। সরকারের কাজের কোনো দায়বদ্ধতা নেই জনগণের কাছে।
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button