ধর্ম ও জীবন

মহানবী (সা.) যেভাবে ইতেকাফ পালন করতেন

ধর্ম ও জীবন,৯ জুলাই (ডেইলি টাইমস ২৪): রমজান মাসে অনেক মুসলমান ভাই ইতেকাফ পালন করে থাকেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তিনিও ইতেকাফ পালন করেছেন। আমাদের নবীজী (সা) কিভাবে ইতেকাফ পালন করতেন চলুন হাদিসের আলোকে তা জেনে নিই-


প্রতি বছর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে মদিনায় এতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা রা. বর্ণনা করেন: রাসুল প্রতি রমজানে এতেকাফ পালন করতেন। [বোখারি : ২০৪১।]

রাসুল বলেন :—

إني اعتكفت العشر الأُوَل ألتمس هذه الليلة، ثم اعتكفت العشر الأوسط، ثم أُتيت فقيل لي: إنها في العشر الأواخر؛ فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف؛ فاعتكف الناس معه.

আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম দশ দিন এতেকাফ করলাম। এরপর এতেকাফ করলাম মধ্যবর্তী দশদিনে। অত:পর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হল যে তা শেষ দশ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে এতেকাফ পছন্দ করবে, সে যেন এতেকাফ করে। ফলে, মানুষ তার সাথে এতেকাফ যাপন করল। (মুসলিম : ১১৬৭)

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল (সা) মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করেছেন। (বোখারি : ২০২৬)

এতেকাফকালীন রাসুল মসজিদে সকলের থেকে আলাদা করে একটি তাঁবু-সদৃশ টানিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতেন। সকল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাতে তিনি আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য যাপন করতেন। অন্তরের যাবতীয় একাগ্রতা ও মনোযোগ, আল্লাহর জিকির, বিনয়-বিনম্রতার সাথে নিজেকে তার দরবারে সমর্পণ যেন হয় অন্তরের একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান—এ উদ্দেশ্যেই রাসুল নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্ত সময় যাপন করতেন।

আবু সাইদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল এক তুর্কি তাঁবুতে এতেকাফে বসলেন, যার প্রবেশমুখে ছিল একটি চাটাইয়ের টুকরো। তিনি বলেন : রাসুল সে চাটাইটি হাতে ধরে একপাশে সরিয়ে রাখলেন এবং মুখমন্ডল বের করে মানুষের সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত হলেন। [ইবনে মাজা : ১৭৭৫।]

নাফে বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ করতেন। নাফে বলেন: আব্দুল্লাহ রা. মসজিদের যে অংশে রাসুল এতেকাফ করতেন, তা আমাকে দেখিয়েছেন। [মুসলিম : ১১৭১।]

বিশ তারিখের দিবসের সূর্যাস্তের পর একুশ তারিখের রাতের সূচনাতে রাসুল তার এতেকাফগাহে প্রবেশ করতেন, এবং তা হতে বের হতেন ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর। মধ্যবর্তী এই সময়টি শেষ দশদিন, যাতে এতেকাফের বিধান দেয়া হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের মধ্যবর্তী দশ দিনে সম্মিলিতভাবে এতেকাফ পালন করতেন। বিশতম রাত্রি বিগত হয়ে একুশতম দিবস উদিত হলে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন, এবং যারা তার সাথে এতেকাফ যাপন করত, তারাও ফিরে আসত, সম্মিলিতভাবে যাপিত রাত্রিগুলোর যে রাতে তিনি প্রত্যাবর্তন করতেন, একবার সে রাত্রি যাপন করলেন সকলকে নিয়ে, সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, তাদের নির্দেশ দিলেন আল্লাহ তাআলার আদেশ বিষয়ে। অত:পর বললেন : আমি ইতিপূর্বে এই দশে সম্মিলিতভাবে এতেকাফ পালন করতাম। এখন আমাকে জানানো হয়েছে যে, শেষ দশ রাত্রিতে সম্মিলিতভাবে যাপন করা কাম্য, সুতরাং যে আমার সাথে এতেকাফ করবে, সে যেন এতেকাফস্থলে অবস্থান করে। আমাকে এ (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল, অত:পর আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। তোমরা তা শেষ দশ দিনে অনুসন্ধান কর, এবং অনুসন্ধান কর প্রতি বেজোড়ে। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি পানি ও কাদায় সেজদা দিচ্ছি। একুশের রাতে আকাশ ঝেপে বৃষ্টি এল, এবং রাসুলের জায়নামাজে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। [বোখারি : ১৯১৪। ] হাদিসটি প্রমাণ করে, একুশের রাত্রি হতেই এতেকাফের সূচনা, এবং এতেকাফ দিবসগুলোর শেষ দিবসের সূর্যাস্তের পরই কেবল এতেকাফকারী আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে।

এস্থলে উল্লেখ্য যে, আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত এক হাদিসে আমরা দেখতে পাই, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর বাদে এতেকাফস্থালে প্রবেশ করতেন। তার বর্ণিত হাদিসে এসেছে—

كان رسول الله صلي الله عليه و سلم إذا أراد أن يعتكف صلى الفجر ثم دخل معتكفه.

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এতেকাফের ইচ্ছা পোষণ করতেন, তখন ফজর আদায় করে এতেকাফগাহে প্রবেশ করতেন। [মুসলিম : ১১৭৩।]

এতেকাফরত অবস্থায় রাসুলের স্ত্রী-গণ তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কথোপকথন করতেন তার সাথে। সাফিয়া রা. বলেন : রাসুল এতেকাফরত অবস্থায় আমি তার সাথে সাক্ষাতের জন্য এলাম, তার সাথে আলাপ করে অত:পর চলে এলাম…। [বোখারি : ৩০৩৯।] অপর রেওয়ায়েতে আছে—একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে অবস্থানকালীন তার স্ত্রী-গণ তার পাশে ছিলেন, তারা ছিলেন আনন্দিত….। [বোখারি : ১৮৯৭।]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যবশ্যকীয় কোন কারণ ব্যতীত এতেকাফগাহ হতে বের হতেন না। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল এতেকাফরত অবস্থায় কোন কারণ ব্যতীত গৃহে প্রবেশ করতেন না। [বোখারি : ২০২৯।] সাফিয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফরত অবস্থায় এক রাতে আমি তার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গমন করলাম। আমি তার সাথে আলোচনা সেরে উঠে চলে এলাম। আমাকে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি এলেন। সাফিয়ার আবাস ছিল উসামা বিন যায়েদের বাড়িতে। [বোখারি : ৩২৮১।]

রাসুল, এভাবে, দুটি ভাল কাজ একই সাথে সমাধা করেছেন—এক দিকে এতেকাফ পালন করেছেন, অপরদিকে স্ত্রী-গণের মানসিকতার প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ দৃষ্টি রেখেছেন, তাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, অযাচিত কোন কারণ বশত: ইবাদত বন্দেগির মাঝে বিঘ্ন সৃষ্টি সর্বার্থে অনুচিত।

-আ/বি , ডেইলি টাইমস ২৪

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button