রাজনীতি

চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মহানগর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার

ঢাকা, জুলাই(ডেইলি টাইমস ২৪):

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে রোববার তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র দাবি করেছে।

রোববার একটি গণমাধ্যমে ‘১৫ কোটি টাকা চাঁদার মিশন’ শিরোনামে রেজাকে নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়। তারই প্রেক্ষাপটে রেজাকে বহিষ্কার করা হলো।

যেখানে বলা হয়, এবার ঈদে কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজির মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত এ সাধারণ সম্পাদক। নিজের সম্পদ বৃদ্ধি ও গডফাদার মহিকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক করতেই এ অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়। আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুবলীগের কাউন্সিলের আগে নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করতে প্রয়োজন এই টাকার। তাই ঈদ মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে বিশাল চাঁদাবাজির মিশনে নেমেছে রেজাবাহিনী।

যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহির ক্যাডার এবং ক্যাশিয়ার হিসেবে রেজাউল করিম রেজা কাজ করে বলে শাসক দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। তারা বলেন, মহি যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হতে মরিয়া। এজন্য টাকা দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ম্যানেজ করতেও তিনি রাজি। এলক্ষ্যে তার প্রয়োজন বিপুল অংকের টাকা। সেই টাকার জন্যই শিষ্য রেজাকে মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সিগন্যাল পেয়ে রাজধানী সুপার মার্কেট, টিকাটুলী, ওয়ারী, বংশাল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে রেজাবাহিনী। তাদের কাছে বিশাল অংকের চাঁদা দাবি করে তা আদায় শুরু করেছে। বিভিন্ন মার্কেট ও বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহন খাত, দখল বাণিজ্য এবং মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঈদের আগেই এ বিশাল অংকের চাঁদা আদায়ে মরিয়া রেজাবাহিনী। গডফাদারের স্বার্থসংরক্ষণের পাশাপাশি নিজের আখের গোছাতেও ব্যস্ত রেজা। যে কারণে চাঁদাবাজির পাশাপাশি দখল বাণিজ্যেও সমান ব্যস্ত তিনি। সব কিছুতেই মাথার ওপর ছাতা হিসেবে পাচ্ছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মহিউদ্দিন মহিকে। এছাড়া অভিযোগ আছে গডফাদার মহির প্রশ্রয়েই রেজা সায়দাবাদ এলাকায় রেলওয়ে এবং ওয়াসার জমিতে দু’তলা মার্কেট গড়ে তুলেছেন। একইভাবে পুরান ঢাকার আগা নগরের একটি মার্কেট দখল করে নিয়েছেন তিনি। ওয়াইজ ঘাট, সিম্পসন ঘাট ও কার্গো ঘাটের পার্কিং ইয়ার্ড দখল নিয়েছে রেজাবাহিনী। টার্মিনাল ছাড়াও যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও রেজার হাতে। পরিবহন ব্যবসায়ী, সাধারণ ব্যবসায়ী, মাছের আড়ত, ফলের আড়ত, থেকে রেজাবাহিনী নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ করার সাহস পাচ্ছেন না। এ সুযোগে পুলিশও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মাঝেমধ্যে আটক হলেও খুব বেশি সময় রেজাকে আটকে রাখতে পারে না কোনো সংস্থাই।

টিকাটুলির রাজধানী সুপার মার্কেটে দোকান সংখ্যা ১ হাজার ৬৮৮টি। যুবলীগ নেতা রেজাউল করিমের নেতৃত্বে এই মার্কেটে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা চাঁদা হয়। প্রতিটি দোকানে ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নিয়েছে রেজাউলের লোকজন। কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা না দিলে মার্কেট সমিতির কার্যালয়ে নিয়ে তাকে নির্যাতন করা হতো। এমনকি চোখ বেঁধে অন্যত্র নিয়ে দিনের পর দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। প্রায় মাস দুয়েক আগে মার্কেটের দুই ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে মহির লোকজন।

রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন দলের এসব ক্যাডারের যন্ত্রণায় গত কয়েক বছর ধরে তারা অতিষ্ঠ। ঈদ কিংবা পূজা-পার্বণ ছাড়াও দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা বলে প্রায় প্রতি মাসেই তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ছাড়াও ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে যায় রেজার বাহিনী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিকাটুলি মোড়ের এক ব্যবসায়ী বলেন, রাজি না হওয়ায় গত সপ্তাহে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অজ্ঞাত একটি স্থানে আটকে রেখে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এর একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় দু’দিন পর এক লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে তিনি ছাড়া পান। ছাড়া পাওয়ার পর বিষয়টি তিনি র‌্যাব ও স্থানীয় থানা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি।

যুবলীগ নেতা রেজার ছত্রচ্ছায়ায় তার সহযোগীরা চাঁদার দাবিতে হুমকি দিয়েছে বাংলাবাজার, সদরঘাট, নবাবপুর রোডসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের। তাদের হুমকিতে অনেকেই এলাকাছাড়া। সদরঘাট টার্মিনালের ইজারাদার আলমগীর হোসেন যুবলীগ নেতাদের হুমকিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আত্মগোপনে থাকাবস্থায় তিনি এক গণমাধ্যমকে বলেন, ওয়াইজঘাট, সিমসনঘাট, কার্গোগেট ও পার্কিং ইয়ার্ডের ইজারা নিয়েছেন। যুবলীগ নেতা রেজার ছত্রচ্ছায়ায় তার ক্যাডার শিপু আহমেদ ও ইকবাল হোসেন এগুলো দখল করে নিয়েছে। সদরঘাটের তেলঘাটের টোলঘর ভেঙে ফেলেছে। এ ছাড়াও যুবলীগ কর্মীরা সদরঘাটে জাতীয় ঘাট শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনকে মারধর করে। তারা ১০ জুন ফকিরাপুলের হোটেল মেলোডি থেকে ব্যবসায়ী দেলোয়ারকে অপহরণ করে। পরে তাকে কেরানীগঞ্জের একটি টর্চার সেলে আটকে রেখে মোটা অংকের টাকা দাবি করে।

রাজধানী সুপার মার্কেটটি র‌্যাব-১০-এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-১ (সিপিসি)-এর আওতাধীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যুবলীগ নেতা রেজা ও তার দলবল বহুদিন থেকে চাঁদাবাজি করে আসছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তার গ্র“পের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ীরা কয়েক দফা অভিযোগ করেন। তারা র‌্যাব কার্যালয়ে ফোন করে তাদের রক্ষার আকুতি জানান। এরপর র‌্যাব যুবলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজা ও তার ১০ সহযোগীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। কিন্তু যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন মহি এবং ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন মহলের নানামুখী চাপে আটকের ২২ ঘণ্টা পর রেজাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় র‌্যাব।

মোবাইল কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম শনিবার এক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা মার্কেটের নিচতলা থেকে ছয়জন ও দৌড়ে উপরে ওঠে যাওয়ার পর দোতলা থেকে চারজনসহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করি। ব্যবসায়ীরা নামে-বেনামে অভিযোগ করলেও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করতে কিংবা সামনাসামনি সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ কারণে সরকারি কাজে বাধা ও দোকান ভাংচুরের অভিযোগে ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ১০ চাঁদাবাজের সহযোগী আরও কয়েকজন রয়েছে। র‌্যাব তাদের নাম জানতে পেরেছে। তদন্ত চলছে শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা হবে।

ঢাকা, জুলাই(ডেইলি টাইমস ২৪),বা/খ:

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button