ফিচার

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা কখনোই নয়

ঢাকা, ২৯ জুলাই(ডেইলি টাইমস ২৪):  সম্প্রতি সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনকে বর্বর ও অত্যাচার-নির্যাতনের পর খুন করার ঘটনা আমাদের বিবেকের সামনেই যেন নিজেদের দাঁড় করিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এ ঘটনার পেছনে আমাদের সমাজে আইন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা এবং জেনেও আইন না মানার যে প্রবণতা তা-ও কম অংশে দায়ী নয়। শুধু রাজন হত্যা নয়, প্রায়ই শিশুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। শিশুর প্রতি এ নিষ্ঠুরতা পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গনসহ সব জায়গায় ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিল এবং দেশের আইন অনুযায়ী, কোনোভাবেই কোনো শিশুর ওপর কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা চালানো যাবে না। এমনকি পিতা-মাতাও সন্তানকে শাসনের নামে নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারবেন না। আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে নারীদের সুরক্ষা এবং নারী নির্যাতনের জন্যই আইনের প্রয়োগ হয়, কোনো শিশু নির্যাতনের বিচারে বুঝি কোনো আইন নেই। তা কিন্তু নয়। যেখানে নারীদের নির্যাতনের জন্য আইনের প্রয়োগ আছে, সেখানে শিশুদের ওপর নির্যাতনের জন্যও আইনের প্রয়োগে কোনো বাধা নেই। তা ছাড়া দেশে শিশু আইন ২০১৩ বলবৎ আছে। এ আইনে শিশুর প্রতি আচরণ কেমন হবে, তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে। আর মনে রাখতে হবে বর্তমান আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে।

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করলে…
শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হলে শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। এ আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা করে এবং এর ফলে শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বা স্বাস্থ্যের এমন ক্ষতি হয়, যাতে তার দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়, শরীরের কোনো অঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি হয় বা কোনো মানসিক বিকৃতি ঘটে—তাহলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ আইন অনুযায়ী শিশুকে অসৎ পথে এবং যৌন কাজে লিপ্ত করালে কিংবা এ রকম কাজে উৎসাহ দিলেও একই শাস্তি পেতে হবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দহনকারী, ক্ষয়কারী অথবা বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটান বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করেন, তাহলে মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান আছে। আবার যদি কোনো ব্যক্তি কোনো দহনকারী, ক্ষয়কারী বা বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা কোনো শিশুকে এমনভাবে আহত করেন, যার ফলে শিশুর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট বা মুখমণ্ডল, স্তন বা যৌনাঙ্গ বিকৃত বা নষ্ট হয়, তাহলে দায়ী ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকার অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। এর ফলে যদি শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ, গ্রন্থি বা অংশ বিকৃত বা নষ্ট হয় বা শরীরের কোনো স্থানে আঘাত পায়, সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি অনধিক ১৪ বছর কিন্তু অন্যূন সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

শিশুও পেতে পারে পারিবারিক সুরক্ষা
পারিবারিকভাবে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০-এর আশ্রয় একজন শিশুও নিতে পারে। কোনো শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হলে এ আইনের অধীনে প্রতিকার পাওয়ার জন্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করা যাবে। কোনো শিশুর পক্ষে যেকোনো ব্যক্তি আইনজীবীর মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে পারেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত যদি উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে পারিবারিক সহিংসতা ঘটতে পারে এমন অথবা শিশুটির স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, এমন যেকোনো ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সুরক্ষা আদেশ দিতে পারেন। এ সুরক্ষা আদেশে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পারিবারিক কোনো সহিংসতামূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেবেন।

শিক্ষাঙ্গনে শাস্তি দেওয়া যাবে না
২০১০ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক)-এর দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি না দিতে নির্দেশনা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা-সংক্রান্ত নীতিমালাও প্রণয়ন করেছে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

-আ/বি/আ , ডেইলি টাইমস ২৪

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button