আইন ও আদালতজাতীয়

কারাগারে আমদানি সেলে বন্দী কেনাবেচা জমজমাট

ঢাকা, ০৪ আগস্ট (ডেইলি টাইমস ২৪): ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আমদানি সেলে বন্দী বেচাকেনা জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন আদালত থেকে যেসব বন্দীকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, তার বেশির ভাগ বন্দীকে কারাগারে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট সদস্যরা কিনে নিচ্ছেন। এরপর বন্দীর স্বজনরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের কাছ থেকে সপ্তাহ, মাসিক চুক্তিতে থাকা, খাওয়া, গোসলসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কথা বলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আদায় করছে। যারা সিন্ডিকেটের কথা মতো টাকা দিতে অস্বীকার করছেন, তাদের পাঠানো হচ্ছে মনিহার, পদ্মাসহ বিভিন্ন ঘিঞ্জি ওয়ার্ডে। শুধু আমদানি সেল ঘিরে কারাগারে দুর্নীতি-অনিয়ম হচ্ছে তা কিন্তু নয়, কারাগারের প্রধান গেট দিয়ে অবাধে বন্দীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, ভেতর ও বাইরের গড়ে উঠা দুটি কারা ক্যান্টিনে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করাসহ নানাভাবে বন্দীদের জিম্মি করে টাকা কামাই করাই এখন কারা অভ্যন্তরে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারাগারে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে বন্দী, স্বজন, কারারক্ষী, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
গতকাল শনিবার দুপুরের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, প্রধান কারাফটকের পাশে অনুসন্ধান সেলের সামনে নয়ন শেখ নামের এক কারারক্ষীর সাথে নিউমার্কেট থানা মহিলা আওয়ামী লীগের এক নেত্রীর কথাকাটাকাটি হচ্ছে। ওই ভদ্র মহিলা কারারক্ষীর কাছে অভিযোগ করছিলেন, মতিঝিল থানার জনৈক সাব ইন্সপেক্টর ওমর ফারুক তার কাছ থেকে দেখা করানোর কথা বলে এক হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু তিনি তাকে বন্দীর সাথে দেখা করাননি। কারারক্ষী নয়ন শেখ এ সময় তাকে বলেন, আমি কি করবো। এখানে টাকা ছাড়া বন্দীর সাথে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। স্যারদের কাছ থেকে স্লিপ নিতে হলে আগে এক হাজার টাকা দিতে হয়। আপনার কাছে যেহেতু টাকা নেই তাই আপনি সাধারণ বন্দীদের সাক্ষাৎ কক্ষে চলে যান। সেখান থেকে দেখা করলে আপনার কোনো টাকা লাগবে না। তবে আসামি ২ ঘণ্টায়ও আসবে কি না তা বলা মুশকিল।
এমন কথা শোনার পর ওই মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর ওমর ফারুককে টেলিফোন করেন। এ সময় তাকে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে আমি দেখে নেবো, আপনি কিভাবে মতিঝিল থানা থেকে গুলশান থানায় পোস্টিং নেন। তিন মাসের মধ্যে আপনাকে আমি বান্দরবানে পাঠাবো। আপনি তখন দেখবেন আমার ক্ষমতা! এরপর টেলিফোন রেখে তিনি কারারক্ষী নয়ন শেখকে প্রস্তাব দেন, আপনি দেখা করালে এখন কত টাকা নেবেন। তখন কারারক্ষী তাকে বলেন, আমাকে টাকা দিলেও আমি আর দেখা করাবো না। একপর্যায়ে সাব-ইন্সপেক্টর ওমর ফারুকের টেলিফোন পেয়ে কারারক্ষী নয়ন শেখ তাকে প্রধান কারা ফটক দিয়ে কারা অভ্যন্তরে নিয়ে যান। আধঘণ্টা পর ওই মহিলা গাড়িতে উঠে কারাগার এলাকা ত্যাগ করেন। এ সময় পাশে ডিউটিরত কারারক্ষী লুৎফর এ প্রতিবেদককে বলতে থাকেন, নয়ন শেখ তো তাকে (মহিলাকে) দেখা করাতে নিয়ে গেছেন। আমি থাকলে তাকে ভেতরেই নিতাম না। কারণ দেখা সাক্ষাৎ যা করানো হচ্ছে সব টাকার বিনিময়ে। এ সময় তিনি বলেন, জেলার, সুপাররা টাকা খান বলে আমরা ওপেন টাকা নিয়ে আসামির সাথে স্বজনদের প্রধান গেট দিয়ে সাক্ষাৎ করাতে পারছি। আর এই টাকার ভাগ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যাচ্ছে। তাই সাংবাদিকরা যদি কিছু লিখেও তাতে কিছু যায় আসে না। এটা কোনো দিন বন্ধ হবে না। যাদের প্রয়োজন তারা ঠিকই দেখা করতে আসবেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যে কেউ গেলেই এখন এ চিত্র দেখতে পাবেন। কারারক্ষী ও পুলিশের লোকজন প্রথমে জানতে চাইবেন, কারো সাথে দেখা করবেন? প্রধান গেট দিয়ে মুখোমুখি দেখা ও কথা বলতে চাইলে টাকা গুনতে হবে ১২০০। প্রত্যক্ষদর্শী ও কারা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একজন বন্দীর সাথে স্বজনদের দেখা করালে ১২০০ টাকার মধ্যে এক হাজার পান কারা কর্মকর্তারা। আর কারারক্ষীরা পান ২০০ টাকা। এ কাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরাও এখন প্রকাশ্যে টাকা নিয়ে ভেতরে দেখা সাক্ষাৎ করাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২০০ বন্দীর সাথে প্রধান গেট দিয়ে সাক্ষাৎ করানো হচ্ছে। যারা আড়াই হাজার টাকা দিতে পারছে তারা সোফায় বসে, আর যারা ১০০০-১২০০ টাকা দিচ্ছে তারা (ওইন্ডোকলে) জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখা করছেন। বিষয়টি কারাগারে ওপেন সিক্রেট।
কারাগারের প্রধান গেট দিয়ে দেখা করে বাইরে এসে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা। তিনি বলেন, কারাগারের প্রধান গেট দিয়ে তিনি এই মাত্র তার স্বামীর সাথে দেখা করে এসেছেন। টাকা লেগেছে ১২০০। স্বামী তাকে বলেছেন, তিনি ভেতরে ভালোই আছেন। তবে চেহারা দেখে মনে হয়নি তিনি ভালো আছেন। তিনি বলেন, ভেতরে খাবারের মান খুব খারাপ। তাই ভালো থাকা ও খাওয়ার জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে কারাগারে এসে ২৫০০ টাকা করে দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো স্বামীর সাথে দেখা করেই টাকা দেন। তার স্বামীকে মনিহার-৪ সেলে রাখা হয়েছে। কী অভিযোগে তার স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুয়া ডাক্তারী করার অপরাধে র‌্যাব-১ এর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইতোমধ্যে দুই মাস পার হয়ে গেছে। এখনো জামিন করাতে পারিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এসব জায়গায় কোনো দিন আসিনি। এখন আদালত আর কারাগারে এসে দেখছি, পদে পদে শুধু টাকা লাগছে। স্বামী আর কী কষ্টে আছে তার চেয়ে বেশি কষ্টে আছি আমরা।
কারাগার সূত্র জানিয়েছে, বন্দীর সাথে স্বজনদের সাক্ষাতের জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর পৌনে ৩টা পর্যন্ত সাধারণ সাক্ষাৎকক্ষ উন্মুক্ত থাকে। তবে অনেকেই সাক্ষাৎকক্ষে ঢুকে বন্দীর দেখা পান না। তবে যারা সাক্ষাৎকক্ষের উল্টো পাশে টেবিল-চেয়ার নিয়ে যারা স্লিপ কাটছেন তাদের ২০০ টাকা দিলেই বন্দীর সাথে অনায়াসে সাক্ষাৎ হচ্ছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে বাইরের খাবারের ক্যান্টিনেও। প্রতিটা পণ্যে বাজারমূল্যের দ্বিগুণ দাম আদায় করা হচ্ছে। তাও অনেক সময় ওই খাবারের প্যাকেট বন্দীরা পান না।
কারাগারের ভেতরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন আদালত থেকে যেসব বন্দী কারাগারে যায় তাদের প্রথম দিন রাখা হয় আমদানি সেলে। সেখানে কয়েদি মেট সাত্তার, জনি, তবারক ও হায়দার সিন্ডিকেট ১২০০-১৫০০ টাকায় কিনে নেয়। এরপর ওই আসামির স্বজনরা পরদিন কারাগারে বন্দীর সাথে দেখা করতে গেলে সিন্ডিকেট সদস্যরা চুক্তির প্রস্তাব দেয়। প্রতিজন বন্দীর থাকা-খাওয়ার জন্য ২৫০০-৩০০০ টাকা সপ্তাহ চুক্তি হয়। গড়ে প্রতিদিন শতাধিক আসামি আমদানি সেলে বেচাকেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে যারা টাকা দিতে পারে না তাদের মারধর করে পাঠানো হয় মনিহার, পদ্মা, মেঘনাসহ বিভিন্ন ঘিঞ্জি ওয়ার্ডে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানি ওয়ার্ডে চলছে জমজমাট বন্দী বেচাকেনা। যেনো এসব দেখার কেউ নেই।

-আ/বি/আ , ডেইলি টাইমস ২৪

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button