ফিচার

ময়লা যাদের খাবার

ঢাকা, ১৭ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

শীলা তখন বেশ ছোটো বয়সে। শৈশবে মানুষের যেমন বাচ্চাদের নানান বিষয়ে আগ্রহ থাকে তেমনি শীলাও ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছিল তার চারপাশ সম্পর্কে। এই আগ্রহের জায়গা থেকেই অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি শীলার হঠাৎ করেই মাটি খেতে ভালো লেগে যায়। শৈশবে মানুষ অনেক কিছু করলেও তা বড় হয়ে আর করে না, এই স্বাভাবিকতাকে এগিয়ে গিয়ে শীলা আজও তার প্রিয় খাবার হিসেবে মাটি খাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন এবং এখনও প্রতিদিন নিয়ম করে তিনি সেই মাটি খেয়ে যাচ্ছেন।

ক্যায়োলিন। ক্যামেরুনের মানুষ তাদের ব্যবহার্য ময়লা মাটিকে ক্যায়োলিন নামে ডাকে। প্রতিদিনকার চলতি রাস্তায় ধুলাবালি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদার্থের মিশ্রনে যে কাদার সৃষ্টি হয় সেই কাদাই শুকালে সৃষ্টি হয় ক্যায়োলিনের। আর এই ক্যায়োলিনই হলো শীলার পছন্দের খাবার। অবশ্য ক্যামেরুনে এই ক্যায়োলিন খাবার ইতিহাস মোটামুটি প্রাচীন। কলোনিয়াল সময়কালীন বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ ঘেটে বাতাঙ্গাদের(আফ্রিকান আদিবাসী গোষ্ঠি) এক জার্নালে দেখা যায় লেখা আছে, ‘আমাদের সকলকেই বলা হলো ওটা (ক্যায়োলিন) খেয়ে নিতে। এমনকি আমাদের সঙ্গে থাকা মিশনারিরা পর্যন্ত ওই মাটি খেলেন।’ অর্থাৎ স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে শীলাই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি মাটি খান নিজের ইচ্ছেতে।

বিশিষ্ট ভূগোলবিদ এবং কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেরা ইয়ংয়ের মতে, মানবসভ্যতার অনেক প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে এমন ময়লা খাবার। ইয়ং মানবজাতির মধ্যে বিভিন্ন মানুষের এমন বিচিত্র ব্যবহারের কারণ খুঁজতে কমপক্ষে দুই দশকেরও বেশি সময় ব্যয় করেছেন। এই দীর্ঘ গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি প্রায় পাঁচশ ঐতিহাসিক ঘটনাকে বেছে নিয়েছিলেন তার কাজের স্বার্থে। তিনি এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকা গবেষকদল অনেক ধৈর্য্য এবং গুরুত্বের সঙ্গে এবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যাদি সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তথ্যাদিতে দেখা যায়, ঐতিহাসিকভাবেই এই মাটি খাবার প্রবনতা আর্জেন্টিনা, ইরান এবং নামিবিয়াতে সর্বাধিক। আর এই দেশগুলোর জনগণের মধ্যে একদিকে শিশু ও অন্যদিকে অন্তস্বত্ত্বা নারীদের মধ্যে এই মাটি খাবার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায় বেশি।

খাবার তৈরিতে ব্যস্ত ক্যামেরুনের এক নারী

গবেষকদল এই মাটি খাবার প্রবনতাকে ট্যাবু হিসেবে বলতে চাচ্ছেন বারবার। এক্ষেত্রে ইয়ং বলেন, ‘এরকম মাটি খাবার ঘটনা যে খুব দুর্লভ তা কিন্তু নয়। আমাদের চোখের সামনেই অনেক সময় অনেককে দেখা যায় মাটি খেতে।’ তার মতে নিউইয়র্কের একজন সুপরিচিত অপেরা সঙ্গীত শিল্পী গোপনে মাটি খেতেন এবং এটা তার কাছে নেশার মতো ছিল। যদিও ইয়ং মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে মাটি খাবার কারণ বিভিন্ন হতে পারে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি বিশেষ স্থানের মাটিতে কিছু বাড়তি উপাদান থাকে, যে উপাদান মানুষের রক্তে মিশলে তন্দ্রালুতার সৃষ্টি হয়, তার প্রতিও অনেকেই আসক্ত হয়ে মাটি খায়। কিন্তু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন ঘটে না। যেমনটা ইয়ং তাঞ্জানিয়াতে কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেন।

‘আমি এক নারীর পাশে তারই বাড়িতে বসে ছিলাম। একটা সময় আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, মাতৃত্বকালীন সময়ে তিনি কোন বস্তুটি খেতে সর্বাধিক পছন্দ করেন। উত্তরে তিনি আমাকে জানালেন যে, তিনি দিনে দুবার নিজের ঘরের দেয়াল থেকে মাটি তুলে খেতেন যা তার কাছে খুবই সুস্বাদু মনে হতো।’ ইয়ং একদিকে যেমন এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন অন্যদিকে তিনি এটাও বুঝতে পারছেন যে, গোটা বিশ্বব্যাপী মানুষ আজ খাবার হিসেবে যা চিনছে-জানছে এবং খাচ্ছে, সেই তালিকায় মাটির কোনো স্থানই নেই। কিন্তু তারপরেও কিছু মানুষ অবধারিতভাবে মাটিকেই খাবার হিসেবে গ্রহন করছে এবং দিব্যি বেঁচে আছেন তারা।

ইয়ং কেনিয়াতে কাজ করতে গিয়ে আরও কিছু মজার বিষয় দেখতে পান। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন দোকানগুলোতে বিভিন্ন মসলার প্যাকেটের পাশাপাশি মাটির প্যাকেটও বিক্রি হচ্ছে। ওখানে প্রাপ্ত মাটির মধ্যে উন্নত অনুন্নত ভেদাভেদও রয়েছে। সবচেয়ে দামি যে প্যাকেটজাত ময়লা মাটি পাওয়া যায় সেটা যুক্তরাষ্ট্রে জর্জিয়ার। বলা হয়ে থাকে, জর্জিয়ার মাটির স্বাদ অন্য মাটির স্বাদের তুলনায় ভিন্ন। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ‘প্রেগন্যান্সি ক্লে’ নামে এই মাটি বিক্রি হতে দেখা যায়।

তবে শুধু আফ্রিকা বা ইউরোপই নয় এশিয়ার অনেক দেশেও আছে মাটি খাবার প্রবনতা। যেমন, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের মধ্যে অন্তস্বত্ত্বাকালীন সময়ে পোড়ানো মাটি খাবার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। এর বাইরে বিভিন্ন ধর্মীয় বিভিন্ন বিশ্বাসের কারণেও অনেকে মাটি খান নিয়মিত। ভারতের বিখ্যাত কুম্ভ মেলার একটি নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে যেখানে হাজারো মানুষ লাইন ধরে দাড়ান স্রেফ একটি ময়লা মাটি খাবার জন্য। যদিও তাদের অন্তরে থাকে ধর্মীয় বিশ্বাস যে, ওই মাটি খেলে তার এবং তার পুরো পরিবারের কল্যাণ হবে। এই বিপুলা দুনিয়ার কতটুকুই আমরা জানি। যতিদিন যাবে ততই একটু একটু করে পৃথিবীর অব্যক্ত কথাগুলো বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে চলে আসবে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button