জাতীয়

প্রশ্নবিদ্ধ সাঁড়াশি অভিযান

ঢাকা, ১৮ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

সপ্তাহব্যাপী জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ১৫ হাজার ৫৭৬ অপরাধীর গ্রেফতারের মধ্যে সন্দেহভাজন জঙ্গি ১৯৪ জন। ডিএমপি কর্তৃক পুরস্কার ঘোষিত ৬ জঙ্গির ৫ জনকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। দেশব্যাপী  স্লিপার সেলের সদস্যসহ শীর্ষ পর্যায়ের একজন জঙ্গি নেতার নাম নেই গ্রেফতারকৃতদের তালিকায়।
পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য স্থির না করে আগাম ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামায় উগ্রপন্থীরা আত্মগোপনে চলে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার শেষ হয়েছে সাত দিনের সাঁড়াশি অভিযান।  তবে এ অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন  আইজিপি। এ অভিযানের
মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। তবে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান ও পুলিশের বিশেষ অভিযান বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি একেএম শহীদুল হক যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযানের নানান কৌশল থাকে। কখনও ঘোষণা দিয়ে, কখনও গোপনে অভিযান চালানো হয়। ঘোষণা দিয়ে জঙ্গিবিরোধী এ অভিযানের ভালো ফল পাওয়া গেছে। এ বিশেষ অভিযানের মেয়াদ বাড়ানো হবে না। তবে পুলিশের নিয়মিত অভিযান, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তবে এ অভিযানের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার গ্রেফতারের বিপরীতে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ১৯৪ জন। তারা সবাই জঙ্গি কিনা সন্দেহ আছে। এতে আমাদের সন্দেহ হয় যে, এ অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল? আগাম ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের অভিযান চালিয়ে গুপ্তহত্যা এবং জঙ্গিবাদ কার্যকরভাবে দমন করা যাবে না। মনে রাখতে হবে ছিঁচকে চোর, পকেটমার, ড্রাগ এডিকটেড মানুষের মোকাবেলা একই সঙ্গে সম্ভব নয়। জঙ্গি গ্রেফতারে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
১০ জুন মধ্যরাত থেকে ১৭ জুন শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত এই অভিযান চলে। দেশব্যাপী টার্গেট কিলিং অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে পুলিশ এ অভিযানে নামে। গত ১৮ মাসে উগ্রপন্থীদের ৪৮টি হামলায় ৫০ জন নিহত হয়। সপ্তাহব্যাপী অভিযানে নৃশংস হত্যার সঙ্গে জড়িত একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। ঢাকার খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা শিহাব ওরফে সাইফুল ওরফে সুমন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে হামলা ও প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলের ওপর হামলাকারী বলে জানা গেছে। অথচ এই সাত দিনের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে মোট ১৫৫৭৬ জন। তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন ১৫১ জন জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদীন), ৭ জন জেএমজেবি (জাগ্রত মুসলিম জনতা), ২১ জন হিজবুত তাহরির, ৬ জন এবিটি (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম), ৩ জন আনসার আল ইসলাম, ৪ জন আল্লার দল, একজন হরকাতুল জিহাদ এবং একজন আফগান ফেরত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।

পুলিশ সদর দফতরের সূত্র জানায়, সারা দেশে একই সঙ্গে দুটি অভিযান চলে। এর একটি হল পুলিশের বিশেষ অভিযান। যার মধ্যে আদালতের পরোয়ানা তামিল, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ আসামিদের গ্রেফতার সংক্রান্ত। এটি শুরু হয় ৭ জুন। অভিযানটি শেষ হয় ১৪ জুন। এর পাশাপাশি ১০ জুন শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান। এই দুই অভিযানে গত এক সপ্তাহে সারা দেশে ১৫ হাজার ৫৭৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে সর্বোচ্চ ২৫ জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে বগুড়া জেলা থেকে।

শুক্রবার পুলিশ সদর দফতর জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সারা দেশে ১৭ জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে ৯ জন জেএমবি, ৭ জন হিজবুত তাহরির এবং একজন এটিটি সদস্য। মাদারীপুরে সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের প্রভাষক গোলাম ফায়জুল্লাহ ফাহিমও আছে। গ্রেফতার হওয়া ১৭ জঙ্গির কাছ থেকে একটি পাইপগান, শাটারগান, গুলি, দুটি ককটেল, রামদা, চাপাতি এবং উগ্রপন্থী বই উদ্ধার করা হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকা থেকে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের অনেককেই আদালতে হাজির করা হয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি। পুলিশ হেফাজত থেকে ‘উধাও’ হওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকের স্বজন। গ্রেফতার বাণিজ্যের লক্ষ্যে অনেককে  মামলা ছাড়াই গ্রেফতার করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন শুক্রবার যুগান্তরকে সাঁড়াশি অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ধরেই নিয়েছিলাম জঙ্গিবিরোধী এ অভিযান হবে জঙ্গিদের মূলোৎপাটন করা। তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করা। এ ধরনের অভিযানে সফলতার জন্য আগে থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অভিযানের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। পুলিশ যেসব আসামি গ্রেফতার করেছে সেগুলো পরোয়ানা তামিল, মাদক ও অস্ত্র মামলা, পেন্ডিং মামলার আসামি। এগুলো পুলিশের রুটিন কাজ। তারা প্রায়ই জঙ্গি গ্রেফতার করে। সারা দেশে জঙ্গি গ্রেফতারের যে চিত্র আমরা পেয়েছি সেটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রুটিন কাজের মধ্য দিয়েও অর্জন করা সম্ভব ছিল। জঙ্গিদের যে অপতৎপরতা দেশে শুরু হয়েছে; আমি মনে করি আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে এটা শেষ হবে না। এ কাজে পুলিশের বিশেষায়িত যে বাহিনী তাদের আরও সবল করতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। এসব অভিযানে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তারা যাতে মনে না করে পুলিশ তথ্য দিয়ে ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। জনসাধারণের হাতে শুধু লাঠি-বাঁশি তুলে দিয়ে জঙ্গি দমন করা যাবে না। জঙ্গি দমন করতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে হবে। জঙ্গিদের তৎপরতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ধারণা দিতে হবে। সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
এদিকে বুধবার সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছে ৩৫২ জন। এদের মধ্যে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার হয়েছে ১৭ জন। সারা দেশ থেকে যুগান্তরের ব্যুরো ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট-

ফরিদপুর :  জেলা সদরসহ ৯ উপজেলায় ৬২ জনকে আটক করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা : জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন জেএমবি সদস্য ও দু’জন জামায়াতকর্মী রয়েছেন। জেএমবি সদস্য আনিসুর রহমান খোকন শহরতলির ইটাগাছার ওমর আলীর ছেলে। ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার মামলার আসামি তিনি।
গাইবান্ধা :  জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নাটোর : জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
পটুয়াখালী : হিজবুত তাহিরের কেন্দ্রীয় সদস্য রোকনউজ্জামান রোকন, শিবির কর্মী আবদুর রব ও মো. আরিফকে আটক করা হয়েছে।
শেরপুর : সদর উপজেলার চৌধুরী বাড়ি মোড় থেকে জামায়াতকর্মী বিল্লাল হোসেন ও ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকে জামায়াতকর্মী লোকমান হোসেইনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার ও কুলাউড়া : কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের উত্তর বুধপাশা গ্রাম থেকে হুজি নেতা লুৎফুর রহমান হারুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় তার কাছ থেকে ২ রাউন্ড গুলিসহ একটি এলজি উদ্ধার করা হয়।
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) : চিলমারী উপজেলায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
খুলনা : নগরীর টুটপাড়া থেকে মো. মাহাবুবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি দক্ষিণ টুটপাড়া ২নং ক্রস রোড সংলগ্ন জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন ও জামায়াত নেতা।
সিলেট : নগরীর রায়নগর থেকে শিবিরকর্মী রাজুকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড ও  রাউজান : জেএমবি সন্দেহে সীতাকুণ্ডের কুমিরা থেকে দেলিপাড়া গ্রামের মৃত নুরুল আবছারের ছেলে মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও মসজিদ্দা গ্রামের মৃত জহুরুল হকের ছেলে জুলফিকার আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া রাউজান উপজেলায় সরকারবিরোধী লিফলেটসহ মহিবুল আলম নামে এক জেএমবি সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
লোহাগড়া (নড়াইল) : লোহাগড়ায় পৌর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান টিটো ও কর্মী লুৎফর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ : সিদ্ধিরগঞ্জের মাদানীর নগর এলাকা থেকে আবদুর রহমান ও মীর মাসুদুর রহমান নামে হিজবুত তাহরিরের দু’সদস্য গ্রেফতার হয়েছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button