জাতীয়

কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ

ঢাকা, ২০ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

নারীমুক্তি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ। ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে একটি অভিজাত পরিবারে তার জন্ম।

সুফিয়া কামাল যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানে নারী শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতো না। তার বাবা সৈয়দ আবদুল বারী ছিলেন একজন আইনবিদ। মা সাবেরা বেগমের কাছে পড়তে শেখেন তিনি। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক।

মাত্র বারো বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার স্বামী সাহিত্য পাঠে তাকে আগ্রহী করে তোলেন। যা তাকে পরবর্তীকালে সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করেও তার মনোগঠনে দেশ, মানুষ, সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বাংলার মানুষ তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো। বেগম রোকেয়ার আদর্শ তাকে প্রভাবিত করে। সুফিয়া কামালের কাজেকর্মেও বেগম রোকেয়ার  ছাপ পাওয়া যায়। ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ যা বরিশালের তরুণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা বাসন্তী প্রকাশিত হয়। মহাত্মা গান্ধীর সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতা কাটেন। সে সময়ে ‘মাতৃমঙ্গল’ নামে একটি নারী কল্যাণমূলক সংগঠনে  যোগ দেন। ১৯২৯ সালে তিনি বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলামে যোগ দেন।১৯৩১ সালে তিনি মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ইন্ডিয়ান মহিলা ফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

তার স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে ১৯৩২ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এর মাঝে ১৯৩৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হয়। যার ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রশংসা করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। সে সময়ের নারী বিষয়ক উপমহাদেশের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সরাসরি যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ (বর্তমানে মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছায়ানটের সভাপতি ছিলেন।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে- সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, মোর জাদুদের সমাধি পরে প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। স্মৃতিকথা ‘একাত্তুরের ডায়েরি’।

সুফিয়া কামাল ৫০টির বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মাঝে উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি:

বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৭৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), দেশবন্ধু সি আর দাস গোল্ড মেডেল (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৯৭)।

১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেন।

সুফিয়া কামালকে স্মরণ করে আজ ছায়ানট ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অনুষ্ঠানটি হবে সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। আর বেলা ১১টায় ছায়ানটের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে একক ও সম্মেলক গান, পাঠ, আবৃত্তি ও কথা দিয়ে স্মরণ করা হবে।

‘সুফিয়া কামাল ও একুশ শতকের নারী আন্দোলন’ স্মারক বক্তৃতা দেবেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন। কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংগীত পরিবেশন করবেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা। এ বছর সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক পাচ্ছেন অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক।

এদিকে দিনটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, কবি সুফিয়া কামাল নারী সমাজকে কুসংস্কার আর অবরোধের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের নারী সমাজের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় আদর্শ। দেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।সুফিয়া কামাল নারীদের সংগঠিত করে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, দেশাত্মবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সুফিয়া কামাল ছিলেন একদিকে আবহমান বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি, মমতাময়ী মা; অন্য দিকে বাংলার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তার দৃপ্ত পদচারণা। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তাকে জনগণের ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে অভিষিক্ত করেছে।

 

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button