সাক্ষাৎকার

‘পানি ঘোলা করে’ ক্ষমতায় থাকতে চায় আ.লীগ

ঢাকা, ২৪ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে’ জনগণকে বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় বলে দাবি করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, ‘সরকার এই ধরনের ব্লেম গেম খেলে, কারণ তাদের কোনো রাজনীতি নেই। রাজনৈতিকভাবে তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। সেজন্য বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপিকে দোষ দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সবসময় পানি ঘোলা করে ক্ষমতায় আসতে অভ্যস্ত এবং সেটি করেই এখন তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়।’ রাজধানীর উত্তরায় বিএনপি মহাসচিবের বাসায় তার অফিস কক্ষে  দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে বলেন।

সাক্ষাৎকারে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সময়ে সমসাময়িক রাজনীতি, দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা, নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনে দলের অবস্থান এবং সর্বোপরি দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি ওই অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলেও কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন ও একাধিক সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৮০-র দশকে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে আসেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মির্জা ফখরুল অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি সফল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন। পরে পর্যায়ক্রমে তিনি সাংসদ ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ সালের মার্চে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ২০১৬ সালের মার্চে দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে তাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন। তিনি গ্রেফতার হতে পারেন বলেও বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে করা। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। সেজন্যই মামলাগুলো করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) নিজেও অভিযুক্ত ছিলেন। সেগুলো থেকে তিনি তার নাম বাদ দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি নেত্রীর নাম রয়ে গেছে। একই মামলায় অর্থাৎ নাইকো বা গ্যাটকো মামলায় তার নামও ছিল।

আর জিয়া চ্যারিটেবল বা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্রের মামলায় তো কোনো মামলাই নয়। কারণ, এগুলোতে কোনো দুর্নীতিই হয়নি। এরপরও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে মামলা করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে যদি অভিযুক্ত করা হয় আর কোনোরকম একটি সাজা দেওয়া হয় দেশবাসী তার জবাব দেবে।

বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে বিএনপিকে দায়ী করে ক্ষমতাসীনদের অভিযোগকে কীভাবে মুল্যায়ন করবেন? বলা হচ্ছে, ক্ষমতায় আসার জন্য পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে এই ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : বিএনপির কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে চক্রান্ত করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আর বিএনপি এতে বিশ্বাসও করে না। এটি মূল কথা। সরকার এই ব্লেম গেম খেলে, কারণ তাদের রাজনীতি নেই। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এখন দেউলিয়া হয়ে গেছে। বিএনপিকে যতটা সম্ভব দোষ দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। সেটাই হচ্ছে বড় সমস্যা। সরকারের এই মিথ্যা প্রচারের কারণে যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। বিএনপির ওপর দোষ চাপানোয় ঘটনাটি উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বাড়বে। প্রকৃত দোষীদের ধরা সম্ভব হবে না।

গণতান্ত্রিক পরিবেশকে যত সংকুচিত করা হবে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ বা ত্রাস সৃষ্টির ক্ষেত্রটি আরো বৃহৎ হবে। সুতরাং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের স্বার্থে, একই সঙ্গে সরকারের স্বার্থেও গণতন্ত্রকে সম্প্রসারিত করা দরকার, সংকুচিত করা নয়।

বলা হচ্ছে, আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন চক্রান্ত করে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চাইছে। কী বলবেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : বিএনপি একটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির জন্ম হয়েছে সেভাবে। যতবার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে এসেছে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে এসেছে। কারো সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় আসেনি, চক্রান্ত করে নয়। বরং চক্রান্ত করে আমাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৯৮২ সালে বিএনপি সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাত্তার সাহেবের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামরিক অভ্যূত্থান ঘটিয়ে এরশাদ সরিয়ে দিয়েছেন। একইভাবে এক-এগারোতে যে একটি নিয়মমাফিক সংবিধান অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তাকেও সরিয়ে দিয়ে দুই বছরের জন্য একটি অস্থায়ী সরকার নিয়ে এসেছিল। এটি বিএনপি কখনো করেনি। বিএনপি কোনো চক্রান্তের সঙ্গে জড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে, এটি কখনো প্রমাণ করা যাবে না। বিএনপি সবসময়ই জনগণের সমর্থনে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এটি ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং এখনও তাই আছে।

সম্প্রতি ভারতে ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর গোপন বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারকে উৎখাত করতে ওই বৈঠক হয়েছিল। এ বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য কী?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসরায়েলের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই এবং বিএনপি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। দেশটিতে ইসরায়েল যে আগ্রাসন চালায় সে বিষয়ে বিএনপি সবসময় প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। সুতরাং রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আর আসলাম সাহেব তো নিজেই বলেছেন, যে তিনি ব্যবসার প্রয়োজনে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে সাফাদির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। যেটি শুক্রবার সাফাদি সাহেবও বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে তার হঠাৎ করে দেখা হয়েছে।’ বিষয়টি বিবিসিও ক্লিয়ার (স্পষ্ট) করেছে। সাফাদি তার ইন্টারভিউতে বলেছে, এমনকি ভারতে যাদের অতিথি হয়ে গিয়েছিল, ভারতের সেই রুলিং পার্টি বলেছে, ‘এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

সরকারের সমস্যা হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মনে করে। কারণ, তারা জানে যে, বিএনপি এবং খালেদা জিয়া যদি মাঠে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে কখনো বিজয়ী হওয়া সম্ভব হবে না। সুতরাং এইসব মিথ্যা প্রচারণা করে বিএনপিকে হেয় করতে চায় তারা। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের কাছে বিএনপিকে ছোট করে দিতে চায়। কিন্তু দেখেন সত্যি বেরিয়ে এসেছে। সাফাদি তার সাক্ষাৎকারে বলেছে, ‘এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার সঙ্গে তার হঠাৎ করেই দেখা হয়েছে।’ তিনি এও বলেছেন, আসলাম চৌধুরী সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। জয়ের সঙ্গে কথা বললে যদি ইসরায়েলকে পক্ষে নিয়ে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত না হয়, তাহলে আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হওয়াটা ষড়যন্ত্র হয় কী করে? এটি একটি প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন, বন্ধু দেশ ভারত। সেখানে একটি ওপেন সেমিনার হচ্ছে। যেখানে আগ্রার মেয়র উপস্থিত ছিলেন। সেখানে এই চক্রান্ত করার সুযোগটি পায় কোথায়? আওয়ামী লীগ সবসময় পানি ঘোলা করে ক্ষমতায় আসতে অভ্যস্ত এবং সেটি করেই তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়।

৩০ মে প্রয়াত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৫তম শাহাদৎবার্ষিকী। তার কর্মময় জীবন মূল্যায়ণ করবেন কীভাবে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে সময়ে রাজনীতিতে এসেছেন সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথমটি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ৭১ সালে। ৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দল রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষমতা পেল না। পাকিস্তানের দমন নীতি এবং মানুষের ওপর মতামত পুরোপুরিভাবে ইগনোর (অবজ্ঞা) করার কারণেই কিন্তু যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যুদ্ধের সূচনাটা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার যে কথাটা আমরা বারবার বলি যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক; কারণ তিনিই প্রথম সশস্ত্র সংগ্রাম বা যুদ্ধে যাওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি যুদ্ধের আহ্বান করেছিলেন। তার আহ্বানের পরেই কিন্তু গোটা জাতি যুদ্ধে নেমে পড়েছিল। ওই বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন ওই নামটি জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলো মেজর জিয়া, মেজর জিয়া। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যখন আরেকটি পটপরিবর্তন ও দেশে একটি নৈরাজ্য বিরাজ করছিল, মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল; সে সময়ে আবার জিয়ার আবির্ভাব বাংলাদেশের মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল। তিনি শক্ত হাতে সেই সময়কার রাজনৈতিক সামরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন। যদিও তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতাও কম ছিল কিন্তু জিয়াউর রহমানের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাংলাদেশের মানুষকে যদি ঐক্যবদ্ধ করা যায় তাহলে জাতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এই জাতিকে একটি বিষয়েই ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব, সেটি হচ্ছে তার নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষা করে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এই জাতি এগিয়ে যাবে। যে কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান কতটা সফল বলে মনে করেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, রাজনীতিতে কোন সময়ে তিনি আসলেন। তার আগে এমন একটি সময় ছিল, যখন মানুষের অধিকারগুলো চলে গিয়েছিল, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়েছিল। মানুষ একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে ছিল। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের পর্যন্ত বিলুপ্ত করে দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল কায়েম করেছিল। যেটা এ দেশের মানুষ কখনো মেনে নিতে পারেনি। পরে সেটির পরিবর্তন হল। বহুদলীয় গণতন্ত্র নিয়ে এলেন জিয়া। বাংলাদেশের মানুষ সেটা আনন্দের সঙ্গে গ্রহন করল। একই সঙ্গে অর্থনেতিক যে দুরবস্থা ছিল, দুর্ভিক্ষ হয়েছে, বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ব্যক্তি মালিকানায় কোনো কিছুই হচ্ছিল না, এটাকে তিনি দূর করেছিলেন। মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই অর্থনীতিকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

তিনি অত্যন্ত দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল করে দিয়েছিলেন। ৭৪-এ যেখানে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তিনি আসার পরে বাংলাদেশে খাদ্যে উদ্ধৃত্ত হয়ে গেল। এরপর ব্যক্তি বিনিয়োগ শুরু হলো। খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে এসে তিনি কৃষিতে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন। এর মাধ্যমে মানুষের মাঝে চলে গিয়েছিলেন। আর এতো বেশি কাজ করতে পারতেন- সকাল থেকে শুরু করে রাত ২টা ৩টা পর্যন্ত কাজ করতেন। এজন্য জনগণের সঙ্গে তার একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। সে কারণেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মানুষের কাছে এতো প্রিয়। এখন বিশ্লেষকরাই বলছেন, জিয়াউর রহমান যদি না আসতো তাহলে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো। কারণ, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল।

জিয়াউর রহমানকে হত্যার নেপথ্য কারণ কী বলে মনে করেন ?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যায়, রাষ্ট্রের যদি সমৃদ্ধি বাড়তে থাকে; তাহলে নিঃসন্দেহে কিছু কিছু দেশ বা গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হতেই পারে, তাদের স্বার্থে আঘাত লাগতেই পারে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক বেশি অগ্রগতি করেছিলেন। সেজন্য দেশের শত্রুরাই তাকে হত্যা করেছিল।

অনেকেই জিয়াউর রহমানের হত্যার সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সম্পৃক্ততা খোঁজেন। এ বিষয়ে কী বলবেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। যদিও এই বিষয়ে একটি মামলা আছে। তবে সেটি এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। অনেকে সন্দেহ করেন, সেই সময়ে যারা দায়িত্বে ছিলেন তার সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে পারে।

সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়ে আসি। দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কেমন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই এটি শেষ হবে। শেষ হলেই দ্রুত আমরা সাংগঠনিক কাজে নামব। জেলা, উপজেলা ও অঙ্গ সংগঠনকে পুনর্গঠন করব।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুয়ায়ী এক নেতা এক পদের বেশি পদে থাকতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে মহাসচিব হওয়ার পর আপনি বাকি পদগুলো স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু অন্যরা এখনও ছাড়ছেন না। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : আমরা আশা করি, সরে দাঁড়াবে। তা না হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বিএনপি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন করছে, সেটি কোন পর্যায়ে আছে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : গণতান্ত্রিক আন্দোলন তার লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত চলতেই থাকবে। এখনও চলছে। আমরা যে কথা বলছি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন করছি, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছি; সবই আন্দোলনের অংশ। এটি একটি প্রক্রিয়া। নির্বাচন কবে দেওয়া হবে সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, আমার নিজেদের সংগঠিত করছি। তবে এই দাবি আদায়ে সব বিরোধী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের জাতীয় ঐক্য চাই। আওয়ামী লীগকেও বলব, আসুন আলোচনা করে সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটি জায়গায় পৌঁছাই, যেভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারব। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও সেই আহ্বানই জানিয়েছেন।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূলায়ণ করবেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : দেশে এখন সবচেয়ে বড় সংকট রাজনৈতিক সংকট। গণতন্ত্র একেবারেই নেই। যে সরকার ক্ষমতায় আছে তাদের নৈতিক ভিত্তি নেই। জনগণের অধিকারগুলোকে হরণ করা হয়েছে। দেশে হত্যা, গুম, সহিংসতায় অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে সরিয়ে দিয়ে একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য করা এবং জনগণের নির্বাচিত সরকার গঠন করার  বিকল্প নেই। আমাদের এখন অবৈধ সরকারকে বাধ্য করতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ নির্বাচন দিতে। জনগণ অবশ্যই তাদের সব শক্তি দিয়ে অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করবে।

সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের কথা বলছিলেন, ভবিষ্যতে ২০ দলীয় জোটের পরিধি বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি ?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে গণতান্ত্রিক সরকার ফিরিয়ে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে বিএনপি রাজনৈতিক জোট করেছে। এখন যে অগণতান্ত্রিক অবস্থা চলছে এর বিরুদ্ধেই আন্দোলনের জোট বিএনপির। এই জোটে প্রত্যেককে স্বাগত জানাচ্ছি। বিএনপি জোটের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও যদি কোনো দল বা ব্যক্তি আন্দোলন করে তাকেও আমরা স্বাগত জানাই।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : আপনাকেও ধন্যবাদ। এর অগনিত পাঠকদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button