ফিচার

ব্রেক্সিটের পর হতে পারে গ্রেক্সিট

ঢাকা, ২৪ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

সন্তান লালন পালনের উপযুক্ত দেশ হিসেবে ইলেনি পীক এবং তার ব্রিটিশ স্বামী পল পীক উভয়েই বেছে নিয়েছেন গ্রিসকে। তারা চাইলে খুব সহজেই যুক্তরাজ্যে তাদের সন্তাদের লালন পালন করতে পারেন, কিন্তু তারপরেও তারা গ্রিসে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের কাছে ব্রেক্সিট খুব একটা অপরিচিত কিছু না হলেও তাদের আয়ত্বে থাকা দুটি দেশই দীর্ঘদিন ধরে নিউজের শিরোনাম হয়ে আসছে। গত শুক্রবার গ্রিসের মিডিয়ার নিউজ আধিপত্যই ছিল ব্রেক্সিট নিয়ে। অনেক নাটকীয়তার পর শেষমেষ ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র ব্লক তৈরিতে।

আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারগুলোর পরিস্থিতির পাশাপাশি এথেন্সের শেয়ার বাজারের অবস্থাও অতটা ভালো নয়। ইতোমধ্যেই গ্রিসের পর্যটন কোম্পানিগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটিশ পর্যটকরা আর আগের মতো অবাধে গ্রিসে আসতে পারবে না। গ্রিসের মেসেডোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে, গ্রিসের অর্ধেক জনগোষ্ঠি ব্রেক্সিটে ভয় পাচ্ছে। অন্যদিকে ২৮ শতাংশ গ্রিক মনে করছেন, এই ফলাফলের ফলে আদতে অতটা কোনো পরিবর্তন আসবে না। পীক দম্পতিও আরও অনেকের মতো বেডরুমে বসে ব্রেক্সিট দেখছিলেন কিন্তু বিষয়টি তাদের অতটা ভাবনায় ফেলে দেয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে গ্রিসের বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্যতা প্রথম শুরু হয় ২০০৯ সালে যখন দেশটির সরকার দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বেইলআউটের জন্য দেনদরবার করছিল। বিগত সময়গুলোতে প্রতিবারই এরকম সমস্যায় গ্রিস স্বতন্ত্র হয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছে। এক বছর আগেই গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস পাওনাদারদের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি করার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। সেই গণভোটের আয়োজনের পেছনে ছিল জার্মানি এবং ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে টানা ছয় মাসের কঠোর আলোচনার প্রেক্ষিতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল শেষমেষ।

ওই গণভোটের পরে অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে গ্রিস থাকবে কি থাকবে না সেবিষয়ে আর আলোচনা আগায়নি। কিন্তু দেশটিকে এখনও পাওনাদারদের শর্তসাপেক্ষে অর্থনৈতিক কাঠামো পরিচালনা করতে হচ্ছে এবং ব্যয়সংকোচনের দিকে আগাতে হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন যে, না ভোটও শেষমেষ গ্রেক্সিটের দিকেই নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু গ্রিসের জনগণ বেইলআউটের সেই শর্তগুলো নাকচ করে দিয়েছিল ৬১ শতাংশ ভোটের বিনিময়ে এবং গ্রিস ইউরোজোনে থেকে যায়।

ওই গণভোটের পর গ্রিসের সরকার আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল এবং পাওনাদারদের অস্বীকার করার প্রবনতা থেকে সরে এসে তাদের গ্রহন করে নেবার দিকে আগায়। দুই বছরের ব্যবধানে আবারও সিপ্রাস ক্ষমতায় বসেন এবং আশা করেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিতব্যয় ধারনার হয়তো সমাপ্তি হবে। গত শুক্রবার সিপ্রাস টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার জায়গা করে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে সম্মানের চোখে দেখা হবে কিন্তু এরফলে ইউরোপে অস্তিত্বের সঙ্কট শুরু হবে। আর এর বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। ফার রাইট দলগুলোর উত্থানের মাধ্যমেই এর যাত্রা নিশ্চিত হয়েছে। শরণার্থী সমস্যা নিয়ে অব্যবস্থাপনা, সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া, ব্যয় সংকোচন, দায়িত্ব গ্রহনে অস্বীকৃতিসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মিলিত রূপ প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপীয়ান প্রকল্পে।’

৪৫ বছর বয়সী এক গ্রিক স্কুল শিক্ষক তার অনুভূতি প্রকাশে বলেন, ‘যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে আমি রাতে ঘুমাতে যাই কিন্তু ঘুম থেকে জেগে উঠি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়া যুক্তরাজ্যকে নিয়ে। এটা নিঃসন্দেহে একটা ধাক্কা। আমি জানি না এখন কি ঘটতে যাচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে অন্যান্য দেশগুলোও হয়তো একই পথে হাটতে পারে। অবশ্যই এটা একটা ভয়ের কারণ যদি ফার রাইটদের উত্থান হয়। এসবকিছুর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকেই আমি দোষারোপ করি। জনগণের ইউরোপ হবার চেয়ে এটা বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের ইউরোপ হওয়ার ফলে আজকের এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’

অবশ্য গ্রিসের রাইট উইং পার্টির মুখপাত্র গোল্ডেন ডন ব্রিটিশ জনগণকে তাদের সিদ্ধান্তের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, দৈত্যের বিরুদ্ধে যাবার জন্য তাদের সাহসকে বাহবা দিতেই হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনাকারীদের মধ্যে ডন অন্যতম। র্দীর্ঘদিন ধরেই অধিক সংখ্যক শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে আসছিলেন তিনি। শেষমেষ যুক্তরাজ্যের এই গণভোটের মাধ্যমে ডন কিছুটা বক্তব্য দেয়ার জায়গা পেয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকেই। ডনের কথার রেশ ধরেই হয়তো গ্রিসের ৬৮ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক কাকলামানিয়াস বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া উচিত। অনেকেই আছেন যারা জাতিরাষ্ট্রে বিশ্বাস করেন এবং সীমান্তকে ফ্যাসিস্ট মনে করেন না। ব্রিটিশরা তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং তারা ভালোই করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হলো একজন নিষ্ঠুর মাস্টার।’

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button