মুক্তমত

ব্রেক্সিট বিশ্লেষণ: ব্রিটিশরা আসলেই ব্রিটিশ

ঢাকা, ২৬ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস গড়লো ব্রিটেন। আবারও নিজেদের বদলে নিলো তারা সময়ের প্রয়োজনে। দেখিয়ে দিলো ‘ব্রিটিশরা আসলেই কতটা ব্রিটিশ’। প্রয়োজন এবং বাস্তবতাকে সামনে রেখে তারা সব কিছু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারে। যদিও ব্রিটেনের গন্তব্য এবং সামনের পথ আসলে কোন দিকে-সেটি পরিস্কার নয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। যার শঙ্কা হয়তো বাধ্য করলো ছয় বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের। তার পদত্যাগ একদিকে যেমন ব্রিটেনের জন্য দুর্যোগের বার্তা বহন করছে, অন্যদিকে কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সে দেশের অর্থনীতি।

সুনামি কিংবা বড় ধরনের ভূমিকম্পের আফটার শককে হার মানিয়েছে ব্রিটেনের অপ্রত্যাশিত গণভোটের ফলাফল। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় যখন প্রতিযোগিতায় টিকতে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা জোরালো হচ্ছে। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেকে মানতে পারছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট, জার্মান চ্যাঞ্চেলর, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীসহ জোটের অনেক গুরুত্বপুর্ণ নেতৃবৃন্দ অনেক আগে থেকেই জোট ছাড়ার পরিণতির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাচ্ছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও বা ভবিষ্যত কী-সেটি অনিশ্চত।

৪৩ বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাজ্য এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে নীতিগতভাবে বিচ্ছিন্ন। বাকি কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতার। এরই মধ্যে ব্রিটেনকে বাদ দিয়ে ইইউ বিশেষ বৈঠক ডেকে দিয়েছে। যা বিচ্ছিন্নতা হয়ে গেছে এমনটাই নির্দেশ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিপর্যস্ত যে দেশটি অভিবাসী এবং আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে জোর তত্পরতা শুরু করেছিল। সেই দেশটি এখন অভিবাসী আর আঞ্চলিক দেশগুলোকেই মনে করছে অগ্রযাত্রা আর উন্নয়নের পথে অন্তরায়। অথচ এক সময় তারা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি আর সমাজ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য ইমিগ্রান্টদের ওপরই ছিল নির্ভরশীল। ব্রিটিশরা সেই জাতি-যারা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এই উপমহাদেশে এজেন্ট নিয়োগ করেছিল- জাহাজ ভরে সে দেশে মানুষ নিয়ে যাওয়ার জন্যই। এখন তাদের সেই সব প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই আবারও নিজেদের এই বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত। এখন তারা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর কোন সদস্য এভাবে জোট ছেড়ে যায়নি।

অবশ্য ইউরোপকে পুরোপুরি বিদায় জানাতে বছর দুই লাগতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইন সংশোধনের দরকার হবে। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। ফলে আসবেন একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী। নতুন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে পুরোপুরি বিদায় জানানো হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। তবে জনগণের এই সিদ্ধান্তই যে চুড়ান্ত সেটি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন নিশ্চিত করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী অক্টোবর মাসে ক্ষমতাসীন দলের সম্মেলনে ঠিক করা হবে নতুন প্রধানমন্ত্রী।

কেউ বলছেন, ব্রিটেন যেনো স্বাধীনতা পেলো। ফিরে পেলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ। আটচল্লিশ ভাগ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চাইলেও বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাকি বায়ান্ন ভাগ মানুষ। আর তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে বদলে গেলো বিশ্ব প্রেক্ষাপট। না, ফেরার সুযোগ নেই। ছেড়ে আসা মানে ছেড়ে আসাই। এটাই ব্রিটিশদের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

তাই একদিকে যেমন বাঁধভাঙ্গা কান্না। আরেক দিকে উল্লাস। সেই উল্লাস বাংলাদেশীসহ নন-ইউরোপীয় নাগরিকদের মধ্যে যেনো আরেক ধাপ বাড়তি। নন-ইউরোপীয়রা মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন নীতিতে ইউরোপীয় এবং নন-ইউরোপীয় বৈষম্যের একটা অবসান ঘটবে। নাটকীয় এই পালা বদলের প্রকৃত কারণ কি ব্রিটিশদের আত্ম অহঙ্কার আর দম্ভ নাকি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা-তা নিয়ে হয়তো অনেক বিতর্ক হতে পারে। তবে এই মুহুর্তের সব চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সভ্যতা, বিশ্ব রাজনীতি, বিশ্ব বাণিজ্য এবং সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করলো যুক্তরাজ্য। যার প্রভাব কিছুটা হলেও বাংলাদেশকে বরণ করতে হবে। ব্রিটেনের বাঙালী কমিউনিটিও দুটো দলে বিভক্ত। এক পক্ষ চেয়েছিল জোটে থাকতে-যারা ইউরোপে নানা ধরনের রফতানি এবং আমদানি বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। এখন তারা প্রতিকুলতার মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন। অবশ্য বাঙালী কমিউনিটির একটি অংশ মনে করছেন, জোট ছাড়ার কারনে ব্রিটেনে নন-ইউরোপীয়দের দৌরাত্ব কমবে। তাতে ব্রিটেনে বাংলাদেশী শ্রমিক এবং ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা বাড়তে পারে। শিথিল হতে পারে অভিবাসনের কিছু কিছু নীতি।

তবে বিশেষজ্ঞরা এও হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, ইউরোপ ছাড়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে এক চরম এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো ব্রিটেন। স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদী অসংখ্য চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হবে ব্রিটেনকে। ইতোমধ্যে ব্রিটিশ পাউন্ডের ভয়াবহ দরপতন ঘটেছে। ১৯৮৫ সালের পর পাউন্ডের দাম এখন সবচেয়ে কম। ফলে ব্রিটেনের আমদানি এবং রফতানি বাণিজ্যের ওপর একটা বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এই অবস্থায় রফতানিকারকরা চাইবে না, তাদের পণ্য ব্রিটেনে যাক। ফলে ব্রিটেনের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্রিটেন হচ্ছে একটি বাজার অর্থনীতির দেশ। তারা অনেক ক্ষেত্রেই আমদানি নির্ভর। সরবরাহ কমলে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিকভাবেই সেখানে লম্ফ ঝম্প দেয়া শুরু করে। কমতে পারে মানুষের আয়। ফলে স্বল্প মেয়াদে ব্রিটেনের জনগণকে একটা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে হবে। অবশ্য যে কোন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ব্রিটেন প্রস্তুত আছে বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার কারণে ব্রিটেনের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে টানা পোড়েন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্কটল্যান্ড এবং নর্দান আয়ারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দেয়ার কারনে অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে বিভক্তি সৃস্টির আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে স্কটল্যান্ডের প্রভাবশালী কোন কোন নেতা স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য দ্বিতীয় দফায় গণভোট আয়োজনের কথা বলেছেন। ১৯৭৫ সাল থেকেই স্কটল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান করছে। এবার তাদের অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ডের সাথে ইংল্যান্ডের টানা পোড়েন নতুন মোড় নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় ব্রিটেন-সেটাই দেখার বিষয়।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button