মুক্তমত

এ দায় গণমাধ্যমের নয়!

ঢাকা, ২৭ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

ডিবি কার্যালয়ে বাবুল আখতারকে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন অনেকে। গণমাধ্যমকে এক হাত নিচ্ছেন তারা। এই সমালোচকদের মধ্যে সাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি। কেউ বলছেন, গণমাধ্যমের ভূমিকায় লজ্জিত, কেউ বলছেন, গণমাধ্যম গল্প বানাচ্ছে। কেউ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোনটি জিজ্ঞাসাবাদ আর কোনটি আটক- সেই সংজ্ঞা। একজন তো সাংবাদিকতা ছেড়ে ফুটপাতের হকার হওয়ার বাসনা দেখিয়েছেন। সমালোচক ওইসব সাংবাদিকদের ভাবখানা এমন যে তারা ছাড়া সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পর্কে আর কেউ কিছু জানেন না, বোঝেন না এবং আর কেউ এথিক্সের প্রয়োগও করেন না।

এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, যারা সব কিছুর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখান। বাবুল আখতারকে জিজ্ঞাসাবাদের সংবাদ পরিবেশনকারী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সমালোচক সাংবাদিকরাও ওই শ্রেণীরই মনে হয়। সমালোচক সাংবাদিকেরা যেমন নিউজ পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের অভিযোগ তুলছেন, তেমনি তারাও যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে গণমানুষের কাছে সস্তা বাহাবা কুড়াতে সচেষ্ট হচ্ছেন না- তাই বা বলি কিভাবে।

এবার আসা যাক্, কেন এই সমালোচনা, বিতর্ক। গণমাধ্যম কি লিখেছে। কয়েকটি শিরোনাম উল্লেখ করছি- ‘এসপি বাবুল আটক!’, ‘এসপি বাবুল আখতারকে ১৫ ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ’, ‘স্ত্রী হত্যার ছক নিজেই কেটেছিলেন এসপি বাবুল আখতার!’ ‘দামপাড়ায় ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো মিতুর!’ প্রভৃতি। অভিযোগ, গণমাধ্যম বানোয়াট সংবাদ প্রচার করেছে। এখানেই আমার বক্তব্য- গণমাধ্যম সঠিক সংবাদই প্রচার করেছে। যদিও ঘটনা সত্য নাও হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে, ঘটনা সত্যি না হলে গণমাধ্যমের সংবাদ সঠিক হয় কিভাবে?

একটি ঘটনার পর সংবাদ কিভাবে প্রচার হয়? সাংবাদিকরা তো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন। সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে তাই সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য নিতে হয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকলে তা প্রতিষ্ঠিত করতে প্রত্যক্ষদর্শীর প্রয়োজন পড়ে না। তবে আগুন কখন লেগেছে কিংবা আগুন লাগার কারণ কি তা পাঠককে জানাতে প্রত্যক্ষদর্শী বা বিশেষজ্ঞের বক্তব্য নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। যা বলছিলাম। এসব প্রত্যক্ষদর্শী বা ক্ষেত্র বিশেষে বিশেষজ্ঞরাই একটি ঘটনায় সাংবাদিকের সোর্স।

এসপি বাবুল আখতারের স্ত্রী মিতু হত্যাকান্ড সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনার রহস্য জানতে যেমন উৎসুক মানুষ তেমনি তদন্ত কাজে সংশ্লিষ্টরাও সত্যান্বেষণে ব্যতিব্যস্ত। গণমাধ্যমেও এই ঘটনার ফলোআপ প্রতিনিয়ত আসছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, মিতু হত্যার পরপরই একটি সিসি টিভির ক্যামেরার ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাতে এই হত্যাকান্ডে একটি মোটর সাইকেল ব্যবহার করা হয় বলে প্রতীয়মান হয়। ঘটনার পরদিন ওই মোটর সাইকেলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। খবরে প্রকাশ, হত্যাকান্ডে একটি কালো মাইক্রোবাসও অংশ নেয়। সেটি খুঁজছে পুলিশ। এবং দুয়েক দিনের মধ্যে ড্রাইভারসহ সেই কালো মাইক্রোবাসটিকেও আটক করা হয়। এরই মধ্যে গ্রেফতার হন হত্যাকারী আবু নসর গুন্নু নামে একজন। শিবির কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তাকে। গুন্নু গ্রেফতারের পর মিতু হত্যাকান্ডে বিএনপি-জামায়াত জড়িত বলে মন্তব্যও করেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ। মিতু হত্যাকান্ডে জঙ্গী সম্পৃক্ততার কথাও জানানো হয়। একজনকে গ্রেফতারও করা হয়। কারাগারে একজন কয়েদীকে জিজ্ঞাসাবাদও করে পুলিশ। তদন্ত কাজের এসব অগ্রগতি ফলাও করে প্রচার করে গণমাধ্যম। এসব তথ্য কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নাম গোপন রাখার শর্তে সাংবাদিকদের দিয়েছেন তদন্তকারী ব্যক্তি বা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা- এ নিয়ে সমালোচক সাংবাদিকদের সন্দেহ থাকার কথা নয়। গণমাধ্যমের এসব খবর পরবর্তী সময়ে কি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে?

তাহলে, আজ যখন ‘এসপি বাবুল আখতার আটক!’, ‘এসপি বাবুল আখতারকে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ’, ‘স্ত্রী হত্যার ছক নিজেই কেটেছিলেন এসপি বাবুল আখতার!’ ‘দামপাড়ার ব্যবসায়ীর সাথে সম্পর্ক ছিলো মিতুর!’- এসব খবর নিউজ পোর্টাল ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তখন কেন সাংবাদিকদের এথিক্স নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? এসপি বাবুল আখতারকে জিজ্ঞাসাবাদ বা আটক কিংবা মিতুর পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে তার সোর্স কে? এর সোর্স কি রাস্তার কেউ, প্রতিবেশী কোনো ব্যক্তি! তা নিশ্চয়ই নয়। কোনো শক্তিশালী সোর্স ছাড়া এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হবে এমন গণমাধ্যম বাংলাদেশে নেই- এই বিশ্বাস সমালোচক-সাংবাদিকদের থাকা চাই।

নিশ্চয়ই সোর্স যদি হয় তদন্তকারী বা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের কেউ তাহলে খবর যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা বা প্রকাশ না করার যৌক্তিকতা কতটুকু রয়েছে- তা নিয়ে অবশ্য আলোচনা হতে পারে। নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন, প্রায় প্রতিটি সংবাদের শিরোনামে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকেও বলা যায়, প্রকাশিত সংবাদটি চূড়ান্ত সত্য নাও হতে পারে।

প্রসঙ্গত প্রথম আলো’র একটি সংবাদের উদ্দ্রিতি দিচ্ছি- ‘‘কিন্তু এই খুনের ঘটনা নিয়ে নানা জন নানা মন্তব্য করছে। কেউ কেউ তাঁদের পারিবারিক বিষয়েও মন্তব্য করছেন। এসব কি সত্যি? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘হতে পারে। তবে এখনো প্রকাশ করার সময় আসেনি, আমরা সবকিছুই প্রকাশ করব আরও একটু সময় নিয়ে।’’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের এই মন্তব্যের মধ্যেই কি সোর্সের বরাতে সাংবাদিকরা যে খবর প্রচার করেছেন সে সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যায় না? এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন তা উড়িয়ে দিলেন না। কেন বললেন, ‘হতে পারে। তবে এখনো প্রকাশ করার সময় আসেনি।’

আর রোববারে ঢাকায় প্রকাশিত সবগুলো দৈনিকই এমন খবর দিয়েছে, যাতে বাংলানিউজে প্রকাশিত খবরেরই সত্যতার ইঙ্গিত দেয়।

এমন হতে পারে, হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটর সাইকেল ও ড্রাইভারসহ কালো মাইক্রোবাস আটক, আবু নসর গুন্নু ও শাহ জামান রবিন নামে দুজন হত্যাকারী গ্রেফতারের মতো এসপি বাবুল আখতারকে আটক বা স্ত্রী মিতুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশিত খবরের হয়তো কোনো সত্যতা নেই। হয়তো বলছি এ কারণে যে, এ বিষয়েও চূড়ান্ত কিছু বলার সময় এখনো আসেনি। ঘটনার সত্যতা যাই হোক না কেন তা প্রকাশের দায় কতটুকু গণমাধ্যমের আর কতটুকু সাংবাদিকদের সোর্স পুলিশ এর তা বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।

তবে এটাও ঠিক এ থেকে গণমাধ্যমের একটা শিক্ষা হয়েছে। সাংবাদিকেরা হয়তো এ থেকে ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সক্ষম হবেন। যেসব সাংবাদিক এ ঘটনায় গণমাধ্যমকে দোষারোপ করছেন, নসিহত করছেন, তাদের বলি, এ থেকে আপনারা এটা বলুন- এ ঘটনায় গণমাধ্যম ভিকটিম। সাহস করে বলুন, গণমাধ্যম আর ভিকটিম হবে না।

কালই যখন ক্রসফায়ারে একজন ফাহিম বা শরীফ নামে প্রকৃত মুকুল-এর মতো আবারো কারো মৃত্যু হবে তখন গণমাধ্যম কি বলবে? এক্ষেত্রে আপনি, আমি কি বলি? ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ এর তথ্য সাংবাদিকদের কে বা কারা দেয়?

আর সাংবাদিকের সোর্সের দেয়া তথ্যই যদি সঠিক হয়, তাহলে আজ যারা গণমাধ্যমের সমালোচনা করছেন তারা তো মুখ দেখাতেই পারবেন না। তাই বলি, প্রিয় সহকর্মী, এ দায় গণমাধ্যমের নয়, গণমাধ্যম ভিকটিম হতে পারে কেবল।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button