ফিচার

ইরাকের জেনারেটর মানব

ঢাকা, ২৯ জুন, (ডেইলি টাইমস ২৪):

২০০৩ সালে ইরাকে আধিপত্যবাদী আক্রমন চালিয়েছিল পশ্চিমা দেশ যুক্তরাষ্ট্র। বাগদাদ দখলের আগ পর্যন্ত দেশটির জনগোষ্ঠি নিজেদের দুর্বল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার মধ্যেও দৈনিক ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। কিন্তু মার্কিন হামলায় সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর প্রায় এক দশক কেটে গেছে, আর বর্তমানে দৈনিক প্রতি চার ঘণ্টা পর পর এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ পায় ইরাকি জনগণ। অর্থাৎ হিসেব করলে দেখা যায়, চব্বিশ ঘণ্টায় ইরাকিরা বর্তমানে পাচ্ছে মাত্র ছয় ঘণ্টার চেয়েও কম সময়ের জন্য বিদ্যুৎ। সেই ইরাকেরই এক বাসিন্দা হলেন হাদি। বাগদাদের স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘জেনারেটর মানব’ নামে পরিচিত। কারণ একমাত্র তিনিই আছেন যিনি নিজ উদ্যোগে জেনারেটর দিয়ে বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছেন।

‘ইরাক খুবই ধনী দেশ, কিন্তু এখানে জীবনযাপন খুবই কষ্টকর। জীবনযাপনের জন্য মৌলিক যে চাহিদাগুলো তাই আমাদের পক্ষে সম্মানের সঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে বিদ্যুৎটাই অনেক বড় সমস্যা। বিদ্যুৎ না থাকায় ইরাকিরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারছে না। এটা এমন একটা অবস্থা যে, আমাদের কাছে অনেক তেল রয়েছে কিন্তু কোনো বিদ্যুৎ নেই।’ কথাগুলো বলছিলেন জেনারেটর মানব হাদি। দশ অ্যাম্পায়ারের একটি জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মাসে খরচ হয় ৬০ থেকে ১০০ ডলার। খুব অল্প সংখ্যক পরিবারের পক্ষে এই ব্যয়টুকু করা সম্ভব, বিশেষত যুদ্ধের বাজারে। কিন্তু হাদির কাছে রয়েছে লাইসেন্স যা সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয়েছে। এই লাইসেন্সের ফলে হাদি একটি জেনারেটর চালাতে পারে এবং অন্যদের বিদ্যুৎ দিতে পারে। বস্তুতপক্ষে হাদির রয়েছে দুটি জেনারেটর।

যখন কোনো খদ্দের তাকে ফোন করে বিদ্যুতের কথা বলেন তখন তিনি একটি জেনারেটরের লাইন তাদের ফিউজ বক্সে লাগিয়ে দেন। হাদি বলছিলেন, ‘যখন আমি ওগুলো চালাই তখন প্রত্যেকেই চুক্তি অনুযায়ী অ্যাম্পায়ার পায়। চার, পাঁচ, ছয় অ্যাম্পায়ার আসলে নির্ভর করে চাহিদার উপর।’ খুব কম ক্ষেত্রেই একটি ফিউজ বক্স একের অধিক পরিবার ব্যবহার করে আর মাত্র চার অ্যাম্পায়ার বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে নেয় পরিবারগুলো। বর্তমানে প্রায় ১৫৪ থেকে ১৫৬টি পরিবার হাদির নিয়মিত খদ্দের। যারা তাকে বিদ্যুতের বিপরীতে অর্থ দিতে পারেন তাদেরই যে তিনি শুধু বিদ্যুৎ দিয়ে থাকেন ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়। এমন অনেক পরিবার আছে যাদের অর্থ দেবার সামর্থ্য নেই, তাদেরকেও বিদ্যুৎ দেন তিনি।

‘আমার প্রতিবেশীরাও আমার পরিবারেরই মতো এবং আমার যা আছে তাই দিয়ে তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিছু পরিবারকে আমি কোনো অর্থ ছাড়াই বিদ্যুৎ দেই কারণ জানি তাদের পক্ষে অর্থ দেয়া সম্ভব নয়।’ হাদিরও এক বয়স্ক বৃদ্ধা খদ্দের জানালেন যে, তিনি সরকারি বিদ্যুৎ পান দিনে এক ঘণ্টা এবং সেটা দিনেও আসতে পারে অথবা রাতে। তার ভাষ্য মতে, ‘বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দিয়ে হাদি আমাকে বাচিয়ে রেখেছে। দুদিন আগে কারা যেন বিদ্যুতের তার কেটে দিয়ে গিয়েছিল। বেচারা হাদিকে খুব কষ্ট করতে হয় ওই তার মেরামত করতে। একটা সময় আমি মাত্র ৩৩ সেন্টের বিনিময়ে আবায়া( আরব অঞ্চলের পোশাক) তৈরি করেছিলাম। ওটা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ পরিবারের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। আমার মনে আছে আগে আমি একেক রাতে দশটা পর্যন্ত আবায়া সেলাই করতে পারতাম।’

হাদি অবশ্য সর্বদা ব্যস্ত। আর এই ব্যস্ততার একটি বড় অংশ জুড়েই থাকে খাতাপত্র ঠিকঠাক রাখা। কারণ অনেকেই আসেন তার কাছে যারা এক মাসের টাকা আরেক মাসে দিতে চান নিজেদের সমস্যার কারণে। আবার অনেকে মোটে টাকাও দিতে চান না। এসব কিছু নিখুতভাবে ব্যবসার খাতিরে লিখে রাখতে হয় হাদিকে। খুব একটা বাধ্য না হলে তিনি কারও বাড়ির জেনারেটরের লাইন কেটে দেন না। কারণ তিনিও জানেন যে, আজ যারা তার কাছ থেকে ঠেকায় পরে বিদ্যুৎ নিচ্ছেন, একটা সময় ছিল তারা নিজেরাই দুটো জেনারেটর চালানোর ক্ষমতা রাখতেন। দীর্ঘ যুদ্ধ পরিস্থিতি আজ ইরাকের সামাজিক স্তরবিন্যাস ধ্বংস করে দিয়েছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button