জেলার সংবাদ

সুন্দরবনের দুই বাহিনী প্রধানসহ ১১ দস্যুর আত্মসমর্পণ

ঢাকা, ১৫ জুলাই, (ডেইলি টাইমস ২৪):

সুন্দরবনের কুখ্যাত বনদস্যু মাস্টার বাহিনীর পর এবার আরো দু‌ই বাহিনী প্রধানসহ ১১ দস্যু আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। বনদস্যু মজনু ও ইলিয়াস বাহিনীর প্রধান তাদের আরো ৯ সহযোগী নিয়ে আজ শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের মংলায়  বিএফডিসি জেটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় দস্যুরা ২৫টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং হাজার রাউন্ড গুলি জমা দেন। আত্মসমর্পণ করা দস্যুদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা মহানগরীর দৌলতপুরের পাবলা সবুজ সংঘ এলাকার আমির আলী গাজীর ছেলে মজনু বাহিনীর প্রধান মজনু গাজী, তার দলের সদস্য বাবুল হাসান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন রহমত, মো. ইদ্রিস আলী, ইসমাঈল হোসেন, মজনু শেখ, মো. রবিউল ইসলাম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. এনামুল হোসেন এবং খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের আবু বক্কর গাজীর ছেলে ইলিয়াস বাহিনীর প্রধান মো. ইলিয়াস গাজী এবং তার সহযোগী মো. নাসির হোসেন। সদস্যদের বাড়ি খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন এলাকায়। জমা দেয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১১টি বিদেশি একনলা বন্দুক, তিনটি দোনলা বন্দুক, দুটি এয়ার রাইফেল, তিনটি ওয়ান শুটারগান, পাঁচটি শাটারগান, একটি রিভলবার এবং বিভিন্ন ধরনের এক হাজার ২০টি গুলি। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, “এই দস্যুরা সুন্দরবনে ভয়ংকররূপে বিচরণ করছিল। তারা তাদের কৃতকর্মের ভুল বুঝতে পেরে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে। আমাদের সরকার সমস্ত বাংলাদেশকে সন্ত্রাস ও দস্যুমুক্ত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা সন্ত্রাস দস্যুতা এর কোনটাই করতে দেব না। আমাদের র‍্যাবসহ সমস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। উদ্দেশ্য একটাই, সবধরনের সন্ত্রাস দেশ থেকে নির্মূল করা।” আজ শুক্রবার দুপুরে মংলা বন্দরের বিএফডিসি জেটিতে দস্যুদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সুন্দরবনের গুরুত্বটা অনেক বেশি। সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে প্রতিনিয়ত দেশি-বিদেশি  অসংখ্য পর্যটক ঘুরতে আসেন। সুন্দরবন মৎস্যজীবীদের জন্যও একটি আদর্শ জায়গা। সুন্দরবন বিপদমুক্ত, দস্যুমুক্ত করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যারা দস্যুতা ছেড়ে ফিরে আসছেন তাদেরকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। আর যারা এখনো ফিরে আসেননি তারা দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।” আর যদি না ফিরে বনে দস্যুতা চালিয়ে যান তাহলে পরিণতি কী হবে তা বলতে চাই না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, “আমাদের র‍্যাব যেমন সক্রিয় তেমনি অন্য বাহিনীগুলোও সক্রিয় রয়েছে। আমরা সুন্দরবনে কোনো ধরনের দস্যুতা করতে দেব না। এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। আজকে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদেরকে আমরা সব ধরনের আইনি সহায়তা দেব। তারা যে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিজ্ঞা করেছেন তা যেন অক্ষুণ্ন থাকে।” তিনি বলেন, “আমরা কারো সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না, যারা আত্মসমর্পণ করতে চান, ক্ষমা চান, তাদেরকে আমরা স্বাগত জানাব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বনদস্যু মাস্টার বাহিনীর পর বনদস্যু মজনু এবং ইলিয়াস বাহিনীর আত্মসমর্পণের এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে গত ৩১ মে সুন্দরবনের আরেক বনদস্যু মাস্টার বাহিনীর প্রধান মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টার এবং তার নয় সহযোগী আত্মসমর্পণ করেন। ওই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মাস্টার বাহিনী ৫২টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও পাঁচ হাজার রাউন্ড গুলি জমা দেয়। বনদস্যু মাস্টার বাহিনীর সদস্যরা বর্তমানে বাগেরহাট জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির এক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, “কয়েক বছর আগে বনদস্যু মজনু এবং ইলিয়াস বাহিনী তাদের নিজ নিজ নামে বাহিনী গঠন করেন। তারা সুন্দরবনের পশ্চিম অঞ্চলের পেশাজীবী জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জন্য আতঙ্কের নাম। ওই দুই বাহিনী প্রধান তাদের সহযোগীদের নিয়ে সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগ ও  বঙ্গোপসাগর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিলেন। দস্যু বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে জেলেদের নৌকা ও ট্রলারে হামলা চালিয়ে জাল মাছ লুট করে নেওয়া এবং জেলেদের অপহরণের পর বনের গহীনে জিম্মি রেখে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে আসছিলেন। তাদের অত্যাচার নির্যাতনে সুন্দরবন অভ্যনত্মরে এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা অতিষ্ঠ ছিলেন।” ওই নেতা আরো বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মজনু ও ইলিয়াস বাহিনী আত্মসমর্পণ করায় আমরা দারুণ খুশি হয়েছি। এদের মতো অন্য যে বনদস্যু বাহিনীগুলো রয়েছে তারা যদি সবাই দস্যুবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে তাহলে সাগর ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবীরা তাদের পেশায় নির্ভয়ে কাজ করতে পারবে।” র‍্যাব ৮ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. ফরিদুল আলম বলেন, “সুন্দরবন ও সাগরের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‍্যাব ৮ দস্যু দমনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুন্দরবনে র‍্যাবের বেশ কয়েকটি ক্যাম্প রয়েছে। আমাদের নিয়মিত অভিযানের কারণে বনের দস্যুরা অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।” তাই দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সরকারের প্রতি আস্থা রেখেই দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দুটি দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে বলে দাবি করেন ওই র‍্যাব কর্মকর্তা। ফরিদুল আলম আরো বলেন, “সুন্দরবনে আরো কয়েকটি দস্যু  বাহিনী রয়েছে তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আমরা কাজ করছি।” র‍্যাব ৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির বলেন, “গত ৩১ মে সুন্দরবনের অন্যতম বনদস্যু বাহিনী মাস্টার বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর অন্যরাও দস্যুবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে উদ্বুদ্ধ হন। এই দুই দস্যু বাহিনী যে ভুল পথে ছিল তা তাদের উপলব্ধি হয়। বেশ কয়েক দিন আগে মজনু ও ইলিয়াস বাহিনী আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা আমাদের কাছে আসলে আমরা তাদের হেফাজতে নিই। পরে ওই দুই বাহিনীর প্রধান ও তাদের সহযোগীদের নিয়ে সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি ২৫টি আধুনিক অস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আত্মসমর্পণ করা দস্যু বাহিনীর প্রধানরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বাধ্য হয়ে দস্যু বাহিনীতে যোগ দেই। সুন্দরবনে দস্যু জীবন বেছে নেওয়ার পর সবসময় এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে থাকতাম। কখন বুঝি প্রতিপক্ষ দস্যু বাহিনী অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বুলেট আমাদের বুকে বিদ্ধ হয়। আমাদের প্রতিপক্ষ মাস্টার বাহিনী সম্প্রতি দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করে। মাস্টার বাহিনীকে দেখে আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে উদ্বুদ্ধ হই। আমরা গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওপর আস্থা রেখে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এ উদ্যোগ নিয়েছি।” র‍্যাব জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনে র‍্যাব বরিশাল ৮ এর সঙ্গে দস্যুদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৬৭ জন জলদস্যু-বনদস্যু নিহত হয়েছেন। নিহত ওই দস্যুদের মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন বাহিনী প্রধান। এ সময় দস্যুদের ব্যবহৃত প্রায় ৪০০টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দস্যুদের ব্যবহৃত দেশীয় ধারালো অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ খাদ্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল উদ্ধার করে র‍্যাব। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ, র‍্যাব ৮ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. ফরিদুল আলম, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজ) এম মনিরুজ্জামান, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button