জাতীয়

অভিযানে দিশেহারা জঙ্গিরা

ঢাকা, ১৮ জুলাই, (ডেইলি টাইমস ২৪):

পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযানে মাঠে থাকা জঙ্গিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগি¦বিদিক ছোটাছুটি করছে। বেশির ভাগ আস্তানার খবর আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে চলে আসায় সবাই পাততাড়ি গুটিয়ে সটকে পড়ছে। এ অবস্থায় আইনশৃংখলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের জালে অনেকে আটকা পড়েছে। আটকের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি ও সিটি ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা এ মুহূর্তে সবিস্তারে কিছুই বলতে চান না। নির্ভরযোগ্য সূত্রে ১৩ জনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। এছাড়া নানা কারণে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সন্দেহ ক্রমেই বাড়ছে। তবে নিরীহ কোনো শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সে বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আটক জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। বেরিয়ে এসেছে মদদদাতাদের পরিচয়। আর হামলার নেপথ্যে পাওয়া যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের কানেকশনও। আটককৃতদের দেয়া জবানবন্দির উদ্ধৃতি দিয়ে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, সরকার পতনের ছক অনুযায়ী এ দুটি হামলা চালায় জঙ্গিরা। মূল লক্ষ্য সফল করতে এদের প্রথম টার্গেট শুধু বিদেশী নাগরিক। দ্বিতীয় ধাপে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোববার যুগান্তরকে বলেন, দুই হামলার পেছনে ছিল সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র। এর নেপথ্যে জামায়াত-শিবিরসহ অন্য রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, হামলার পর বিভিন্ন স্থানে ই-মেইলে তথ্য আদান-প্রদান হয়। এসব মেইল থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলো এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ গ্রেফতারকৃত তিনজনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। অপরদিকে রোববার মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বাড়ির মালিক নুরুল ইসলামকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কারও কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে নানা তথ্য মিলেছে। তবে কোনো কিছু একেবারে নিশ্চিত না হয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হবে না।
এদিকে গুলশান হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত যাদের আটক করা হয়েছে তাদের সংখ্যা ৩০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে অফিসিয়ালি কেউ কোনো বক্তব্য দিতে চাননি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে আটকদের মধ্যে ১৩ জনের নাম জানা গেছে। এরা গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার সঙ্গে জড়িত। সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে এ দুটি হামলা চালায়। এদের কেউ কেউ ব্যাকআপ পার্টির সদস্য হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।এছাড়া প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন দু’জন জঙ্গির কাছ থেকে পাওয়া গেছে সামাজিক মাধ্যমে তথ্য ছড়ানোর নানা কৌশল। এদের মধ্যে জঙ্গিদের বিভিন্ন সারির নেতাও রয়েছে। তাদের ভাষায় কেউ আবার জঙ্গিদের সিনিয়র ভাই। এরা দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এরা হচ্ছে- গাইবান্ধার সাঘাটার জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী। এ জঙ্গি নিজেকে ‘বাংলার বাঘ’ বলে দাবি করে। সে নিষিদ্ধ জেএমবির রংপুর অঞ্চলের কমান্ডারের দায়িত্বে ছিল। এছাড়া অন্যদের মধ্যে কুড়িগ্রামের ফরকেরহাটের রিয়াজুল ইসলাম ওরফে মেহেদী, একই জেলার সাদ্দাম ওরফে চঞ্চল ওরফে রাহুল, একই জেলার রাজারহাটের বিদ্যানন্দেরচরের গোলাম রাব্বানী ওরফে সুভাস বসু, গাইবান্ধার তৌফিকুল ইসলাম, রাজশাহীর রিপন, বগুড়ার বিজয়, দিনাজপুরের রবিন ও আরিফুল ইসলাম, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের বাইক হাসান ওরফে নজরুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আজাদুল কবিরাজ। এছাড়া মিলন নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে গুলশান হামলা বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে জাহাঙ্গীর, নজরুল ও রবিন। এদের নেপথ্যে থাকা সাকিব মাস্টারকে ইতিমধ্যে নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়েছে।
আটক জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সারা দেশের সাংগঠনিক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত ‘মানিক’ নামে একজনের নাম জানা যায়। জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব জানিয়েছে, মানিকের নির্দিষ্ট অবস্থান তারা জানে না। তবে লোকটি বেশিরভাগ সময় ‘ভরাট’ গলায় কথা বলে। গোয়েন্দাদের ধারণা, শেওড়াপাড়ায় ওই বাসায় এই মানিকের যাতায়াত ছিল। বিশেষ করে চেহারা বর্ণনায় মানিকের বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। মানিক হচ্ছে তাদের সবার ‘গুরু’ বলে পরিচিত।

আটক জঙ্গিদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী পুলিশকে জানিয়েছে, নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতারা তাদের বলেছিল, সরকার উৎখাত করতে একের পর এক বড় ধরনের হামলা চালাতে হবে। এরই অংশ হিসেবে তারা এক সপ্তাহের ব্যবধানে গুলশান ও শোলাকিয়ায় বড় ধরনের দুটি হামলা চালায়। হামলায় যাতে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে সে ধরনের দিকনির্দেশনা আগেই থেকে তাদের দেয়া ছিল। আর এ হামলার মাধ্যমে তাদের (জঙ্গিদের) কথিত খেলাফতের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও গোয়েন্দারা বলছেন, জঙ্গিদের কাছে ধর্মের ভুল ব্যাখা দিয়ে হামলা চালাতে প্ররোচিত করা হয়। এর সঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কানেকশনের যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।
এদিকে শোলাকিয়ায় হামলাকারীদের বাড়ি ভাড়া করতে সহায়তাকারী জয়নাল আবেদীন ওরফে আকাশকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছে আরও তথ্য জানার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। শফিউলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের দলে যারা হামলাকারী এদের প্রায় সবাই মোটরসাইকেল চালাতে পারে। ঢাকাতেও বেশিরভাগ সময় জঙ্গিরা মোটরসাইকেলে চলাফেরা করে। শফিউলের তথ্য অনুযায়ী, গুলশান ও শোলকিয়ার হামলার ঘটনায় যে গ্রুপ জড়িত ছিল এদের হাতে ছিল বিদেশী নাগরিক ও ইসলাম ধর্মের বাইরে ভিন্নধর্মের লোককে হত্যার ছক। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ১১টি হামলার ঘটনার পরই সক্রিয় জঙ্গি ইউনিটের সব সদস্যকে বলা হয়, এবার বড় হামলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আর সেই প্রস্তুতির মধ্যে ছিল গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পরিকল্পনা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. দিদার আহাম্মদ রোববার বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর কয়েকজন জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে। যাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে কোনো জঙ্গিরই এখন নাম-পরিচয় বলা যাবে না। তবে  দুটি হামলা একই সূত্রে গাঁথা সে বিষয়ে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলা চালানো হয়। আটক জঙ্গিরা এ বিষয়ে পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া দুটি হামলার পেছনে জঙ্গিদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এমন প্রবাসী বাংলাদেশী এবং একাধিক ব্যবসায়ীর নাম ইতিমধ্যে গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে। গুলশান হামলায় বড় ধরনের বাজেট ছিল জঙ্গিদের।
তারা আরও বলেন, জঙ্গি হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত চাকরিচ্যুত সেই মেজর জিয়াকে যে কোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে। গোয়েন্দারা আশা করছেন, খুব শিগগিরই গুলশান ও শোলাকিয়া সংক্রান্ত হামলার নেপথ্যের সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এ দুটি ঘটনার আগে কারাবন্দি কয়েক জঙ্গির সঙ্গে হামলাকারীদের যোগাযোগের প্রাপ্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটক জঙ্গিদের দেয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে ফেরত উগ্রপন্থীদেরও একই পরিকল্পনা ছিল। তারাও দেশে এসে বড় ধরনের হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা আরও স্বীকার করেছে, এসব জঙ্গির অনেকেই দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে এদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। ঢাকায় তাদের আরও আস্তানা রয়েছে। আর এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা আছে জঙ্গি নেতা সাকিব মাস্টার ও মানিকের। এজন্য তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ দু’জনকে দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার যে বাসা থেকে শনিবার গভীর রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে গ্রেনেডসহ জঙ্গিদের ব্যবহৃত বেশকিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করে সে বাসাটি পাঁচ মাস আগেই ভাড়া নিয়েছিল জঙ্গিরা। এর আগেও এ বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিভিন্ন ধরনের পোশাক উদ্ধার করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, একই বাড়িতে জঙ্গিরা ফের বাসা ভাড়া নিতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র বলছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসির বসুন্ধরার বাসার সঙ্গে শেওড়াপাড়া বাসায় অবস্থান নেয়া জঙ্গিদের যোগসূত্র ছিল। এমন তথ্য পাওয়ার পর সেখানে শনিবার রাতে অভিযান চালানো হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, নর্থ সাউথের সাবেক শিক্ষক হাসনাতের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ওই বাসার ঠিকানা জানা যায়। এরপর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে একে একে জঙ্গিদের বিভিন্ন আস্তানার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।
তদন্ত ও অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গত দু’সপ্তাহে বেশ কিছুসংখ্যক সন্দেহভাজন ও মোস্টওয়ান্টেড জঙ্গি আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিদিনই অভিযান চলছে। আটক জঙ্গিদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে শনিবার রাতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে বেশ সাফল্য পেয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী। অভিযানগুলোতে সঙ্গে থাকা জঙ্গিদের দেখিয়ে দেয়া বাসাবাড়ি থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা জালে প্রতিদিনই আটকের সংখ্যা বাড়ছে।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button