সাক্ষাৎকার

‘আবেগ ছাড়া মানুষ কিছুই করতে পারে না’

ঢাকা, ৩০ জুলাই, (ডেইলি টাইমস ২৪):

খেলোয়ােড়রা কথা বললে খবর হন। তিনি খবর হয়েছেন কথা না বলেও। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েও দেশে ফিরলেন ‘খলনায়ক’ হয়ে। জয় থেকে ২ রান দূরে থাকতে তুলে দিলেন ক্যাচ, পরে সেই ম্যাচটা হেরেই গেল বাংলাদেশ। আর মুশফিকুর রহিম যেন হারিয়ে ফেললেন ভাষা! পরশু দুপুরে সেই তিনিই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে বসে খুলে দিলেন মনের অর্গল। তারেক মাহমুদকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জবাব দিলেন তাঁকে নিয়ে সব অপ্রিয় প্রশ্নের। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে কথা বললেন সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও…

* গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে জয়ের কাছে গিয়েও হেরে গেছে বাংলাদেশ দল। শেষ ওভারে আপনার আউটের পরই মূলত সম্ভাবনাটা শেষ হতে থাকে। এত দিন পর সেই আউটটা নিয়ে কী মনে হয়?

মুশফিকুর রহিম: (হাসি) এটার উত্তর দিতে দিতে আমি বিরক্ত। মিডিয়া না হলেও ব্যক্তিগত জীবনে এ নিয়ে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়েছি। আমাদের দেশে বা উপমহাদেশেই খেলোয়াড়দের ভক্ত-দর্শকদের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে যে কৌতূহল নিয়ে তাঁরা এসব জিজ্ঞেস করতেই পারেন। তাঁদের জবাব দিতে হয়েছে। আসলে দিন শেষে সবাই ফলাফলটাই দেখে। তার আগে কী চিন্তা ছিল বা কী পরিস্থিতি হয়েছিল, সেটা কেউ ভাবেন না। মনে করে দেখেন ওই ওভারে দ্বিতীয় যে চারটা মারলাম, ওটা না মারলে কিন্তু আমাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই তৈরি হতো না। ওটাও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ শট ছিল, কিন্তু আমি সেটা মারতে পেরেছিলাম। ওই সময় রানের ব্যবধান কমে এলেও পর পর দুটি চার হয়ে গেলে যেকোনো বোলার চাপে পড়ে যায়। আর আমার মাথায় এটা ছিল না যে আমাকে আগে একটা রান নিয়ে টাই করতে হবে। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, বোলার আরেকটা বাজে বল দেবে। আমি যদি আমার স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলি তাহলে বাউন্ডারি না হোক, অন্তত দুটি রান হবে।

* আরেকবার যদি ওই পরিস্থিতিতে ও রকম বল পান, একই শট খেলবেন?
মুশফিকুর রহিমমুশফিক: ও রকম পরিস্থিতি হলে আবারও চেষ্টা করব ও রকম শটই খেলার। তবে নিশ্চিত হয়ে নেব ওটা যেন ছয় বা চারই হয়। সেদিন ওই পাশেও প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যান ছিল তখন। রিয়াদ (মাহমুদউল্লাহ) ভাই ছিলেন এবং উনি খুব ভালো ফর্মে ছিলেন। এ জন্যই আমি ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম। আমার কখনো মনে হয়নি এখান থেকেও আমরা ম্যাচ হেরে যেতে পারি। মিস টাইমিং হলে এক বা দুই রানও হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি। এ জন্যই আমাদের ওপর দোষটা এসেছে। আমার অনুতাপ থাকলে সেটা ম্যাচ হারার জন্য আছে। ওই শট খেলার জন্য কোনো অনুতাপ নেই। তবে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যেকোনো ম্যাচেই এ রকম পরিস্থিতি এলে যেন আর এ রকম না ঘটে।

* দ্বিতীয় বাউন্ডারিটা মারার পর মাঠে খুব উল্লাস করলেন। ওই উত্তেজনা কি কোনোভাবে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটিয়ে থাকবে?
মুশফিক: এটাকে উল্লাস বলব না। এটা আসলে নিজেকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য করা। উল্লাস বা উৎসব করলে তো আমি আরও অনেক কিছুই করতে পারতাম। ওটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে যায়। আমি পরিকল্পনা করে এটা করিনি যে রান হয়ে গেছে বা আমরা জিতে গেছি। আমরা তখন জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম। ওটা করেছি নিজেকে এই প্রেরণাটুকু দেওয়ার জন্য যে, আর মাত্র একটা ধাপ বাকি। সেটা পার হতে পারলেই জয় আমাদের। আপনার মনে আছে কিনা, ঢাকায় এশিয়া কাপে যখন পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হচ্ছিল, জয়ের জন্য ১০ রান বাকি থাকতে সামির বলে রিয়াদ ভাই স্ল্যাশ করে পয়েন্ট দিয়ে চার মারলেন। তখন কিন্তু তিনিও একই কাজ করেছিলেন। শূন্যে একটা ঘুষি মারা বা এ রকম কিছু করা…এর মানে আমরা লক্ষ্যের খুব কাছে চলে এসেছি। এটা তাৎক্ষণিক এসে যায়। এর সঙ্গে উৎসব করার কোনো সম্পর্ক নেই।

* আপনার আউটটা নিয়ে সর্বত্রই অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আপনি নিজে এ নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। মানুষের কথা শুনে, ফেসবুক দেখে কী প্রতিক্রিয়া হতো?
মুশফিক: মানুষের বলাটা স্বাভাবিক। আমিও তো বলি…ওটা আমার ভুল ছিল। আমার কারণেই বাংলাদেশ হেরেছে, দলের ক্ষতি হয়েছে। আমি এ জন্য দুঃখিত। ভবিষ্যতে এ রকম পরিস্থিতি এলে আমি আরও ভালোভাবে সামলানোর চেষ্টা করব।

* ওই ম্যাচের পর আপনি অস্বাভাবিক রকমের চুপ হয়ে গেলেন। সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলতে লাগলেন। এমনকি প্রিমিয়ার লিগে সেঞ্চুরি করার পরও কথা বলতে চাইলেন না। নিজেকে এ রকম গুটিয়ে ফেলার বিশেষ কোনো কারণ?
মুশফিক: এড়িয়ে চলা ঠিক না। আমি মানুষ যেহেতু, একটা খারাপ সময় যেতেই পারে। ভারত ম্যাচে আমার আউট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল। ওই সময় সাংবাদিক বা অন্য কারও সঙ্গে এসব নিয়ে কথা না বলে আমি চেষ্টা করেছি কাজে মনোনিবেশ করতে। আমি গিয়ে হয়তো বলতাম আমি এটা করব, ওটা করব বা ওটা আমার টার্গেট। তার চেয়ে ভালো আমি আমার কাজটা করি। সেটার ফল যদি মাঠে দিতে পারি, তাই বরং ভালো। এ জন্যই চেষ্টা করি এগুলো থেকে একটু দূরে থাকতে। আমি যেন আমার আসল কাজটা ঠিকভাবে করতে পারি। আল্লাহর রহমতে প্রিমিয়ার লিগে বেশ ভালো শুরু করেছিলাম। মাঝের দিকে হয়তো কয়েকটা ম্যাচে ভালো হয়নি। কিন্তু এত খারাপ খেলেও ৪৫-এর বেশি গড়ে ৫৯৬ রান করেছি। খুব বেশি খারাপ না তো! তবে আমি চেষ্টা করেছি আরও বেশি রান করতে।

* নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রেখেই তাহলে মনোযোগটা ফিরে পেলেন?
মুশফিক: স্বাভাবিক…কথা বললে সবাই এই প্রশ্নগুলোই জিজ্ঞেস করত। আবারও আমার ওটা মনে পড়ত, আবারও খারাপ লাগত। খারাপ লাগাটা সব সময়ই থাকে, তবে আমি চেষ্টা করেছি আমার ফোকাসটা যেন বর্তমানে থাকে।

* সবাই তো বলে মুশফিকুর রহিম অভিমানী মানুষ। সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হয়েই নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন…
মুশফিক: পৃথিবীর কোন মানুষ আছে যার সমালোচনা শুনলে খারাপ লাগে না? খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এটা নয় যে সে জন্যই দূরে ছিলাম। দূরে থাকার ওই একটাই কারণ ছিল, যেটা বললাম। আমি যেন আমার কাজে মন দিতে পারি।

* রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ এই ব্যাপারগুলো আপনার নাকি একটু বেশিই। খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও তা শোনা যায়। এটা কি ঠিক নাকি মানুষ আপনাকে ভুল বোঝে?
মুশফিক: মানুষ তো অবশ্যই ভুল বুঝছে। বিশেষ করে আমার সঙ্গে যারা থাকে তারাও যদি এত দিনে আমাকে না চিনে থাকে, এর চেয়ে খারাপ কিছু আর হতে পারে না। তবে এটা ঠিক, সমালোচনা করলে খারাপ লাগেই। আমি সেগুলো সব সময় মনে রাখার চেষ্টা করি। খারাপ খেলার পর যখন সমালোচনা হয় সেটা অনেক দিন মনে রাখি। কারণ ভুল কিছু করলে আমাকে তা শোধরাতে হবে। কিন্তু কিছু সময় কোনো কারণ ছাড়াই সমালোচনা হয়। তখন খারাপ লাগে। যারা আমাকে জানে, এত বছর ধরে দেখছে—তারা যখন উল্টো কথাগুলো বলে তখন ভালো লাগে না। তখন আসলেই মনে হয় যে কারও সঙ্গে কথা বলব না। খেলাটা তো আমার একটা কাজ। আমার এই কাজটাকে যদি কেউ অন্য দিক থেকে খারাপ করার চেষ্টা করে, তাহলে তো আমার কোনো উপায় নেই! আমি কেন তাকে সময় দেব বা তার সঙ্গে কেন কথা বলব? তার চেয়ে ভালো আমার কাজটাই আমি করি।

* কখনো কি এ রকম হয়েছে যে কেউ কোনো কারণ ছাড়াই আপনাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা বলেছে বা আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে?
মুশফিক: অনেকবার। আমার আর রিয়াদ ভাইয়ের আত্মীয়তা নিয়ে অনেক কাহিনিই হয়েছে, যেসব একজন খেলোয়াড়ের জন্য খুবই অসম্মানজনক কথা! এটা আমার নিজের দল না, আমার বাবারও দল না যেখানে আমি আমার ভাইকে খেলাব, ছেলেকে খেলাব বা চাচাকে খেলাব। এটা বাংলাদেশ দল, আমি অধিনায়ক। আমি কীভাবে দেশের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারি? তাহলে তো আমাকে দলেই নেওয়া উচিত না। এই জিনিসগুলো নিয়ে যখন কথা উঠল, তখন আমার মনে হয়েছে আসলে জীবনেও কারও সঙ্গে কথা বলা ঠিক না। এত দিন কষ্ট করার পর, সৎ থাকার পরও যদি কেউ আমাকে এতটুকু সম্মান দিতে না পারে তাহলে আমার দরকার নেই তার সঙ্গে কথা বলার।

* কিন্তু খেলোয়াড়দের জীবনই তো এ রকম। নেতিবাচক সমালোচনা হবে, আবার ভালো খেললে প্রশংসায় ভাসবেন। দুই ক্ষেত্রেই হয়তো অনেক সময় বাড়াবাড়ি হয়। তবু এত দিনে কি এসবের সঙ্গে আপনার অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল না?
মুশফিক: আমার তো উল্টো প্রশ্ন! সবাই যদি এ রকম হবে তাহলে কেন আমাদের বাংলাদেশ বদলায় না? কেউ ভালো করলে তাকে এক শ ফুট ওপরে না তুলে এমন জায়গায় রাখেন সে যেন সেই অবস্থানটা ধরে রাখতে পারে। আবার কাউকে খুব নিচেও নামাবেন না। একজন খেলোয়াড় তো একদিনে তৈরি হয় না। অন্য দেশে কী রকম জানি না। তবে আমাদের দেশেই এটা বেশি হয়। মানুষ হিসেবে কাউকে খারাপ কিছু করতে দেখলে কি আমি বলব, ‘আমার বড় ভাই করছে। আমিও করি। সমস্যা কী?’ কেন এটা হবে? পরিবর্তনটা আমিই আনি না! সেটা তো আমি খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখি। আমি তাই চেষ্টা করি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলতে। এ ছাড়া আমি অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে স্বচ্ছন্দবোধ করি না। কারণ, খেলা আর যত বছরই খেলি আমি চেষ্টা করি মানুষ হিসেবে যেন আমি ভালো থাকতে পারি। আমার পরিবার আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে সেটা মেনে চলার চেষ্টা করি। এমন কারও সঙ্গে ওঠাবসা করতে চাই না যে মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে জানে না।

* ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের প্রকাশগুলো অনেক তীব্র হয় আপনার। ২০১১ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে আপনি সেঞ্চুরি করার পরও দল হেরে গিয়েছিল। ড্রেসিংরুমে ফিরে কেঁদেছিলেন। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারও আনতে যাননি। এসব তো আপনার জন্যই ক্ষতিকর…
মুশফিক: আবেগ ছাড়া মানুষ কিছুই করতে পারে না। তবে অবশ্যই এটার একটা মাত্রা থাকা উচিত। কখনো কখনো আমার হয়তো এটাতে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর এ জন্যই আমি মানুষ। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন আমি আমার আবেগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছি। অনেক পরিণত হয়েছি। ভবিষ্যতে ও রকম পরিস্থিতি হলে আরও পরিণত আচরণ করার চেষ্টা করব।

* টেস্টের পর আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতেও আপনার ক্যারিয়ারের ১০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে অনেক উন্নতি করলেও টেস্ট ক্রিকেটে সেটা হয়নি। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে এর কারণ কী মনে করেন আপনি?
মুশফিকুর রহিম: আমার মনে হয়, আমার জায়গায় অন্য কেউ টেস্ট অধিনায়ক হলে আমরা আরও অনেক ভালো করতে পারতাম (হাসি)। আসলে টেস্ট ম্যাচ বেশি না খেললে উন্নতি করার কোনো রাস্তা নেই। আমরা সর্বশেষ টেস্ট খেলেছি গত আগস্ট মাসে। এরপর এখন পর্যন্ত একটাও টেস্ট খেলিনি। এভাবে খেললে কারও পক্ষেই ভালো করা সম্ভব না।

* উন্নতির পথটা তাহলে কী?
মুশফিক: বাংলাদেশ দল যত বেশি টেস্ট খেলবে তত বেশি উন্নতি করবে। পারফরমারের সংখ্যা বাড়ায় ওয়ানডেতে আমরা এখন ভালো করছি। এই খেলোয়াড়েরা টেস্টেও ভালো খেলছে। সাকিব তো ছিলই, এখন মুস্তাফিজ আসায় আমাদের বোলিং আগের তুলনায় অনেক ভালো। টেস্টে জিততে হলে হাতে এমন কিছু বোলার থাকতে হবে যারা প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট নিতে পারে। বাংলাদেশ দল এখন সেই জায়গায় আছে। আইসিসি ও বিসিবি মিলে যদি আমাদের আরও বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ দেয়, তাহলে দেখাতে পারব, ওয়ানডের পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন টেস্টেও ভালো দল।

* বছরে বাংলাদেশ দলের অন্তত কয়টা টেস্ট খেলা উচিত বলে মনে করেন?
মুশফিক: ১১ বছরে আমি মাত্র ৪৮টি টেস্ট খেলেছি। টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে দুর্ভাগা মনে করি এ জন্য। ইংল্যান্ড বা ভারতীয় দলে কেউ ১১ বছর ধরে খেললে দুই শর মতো টেস্ট খেলে ফেলত। আমি বলি খারাপ-ভালো পরের ব্যাপার, আগে খেলার সুযোগ দিতে হবে। বছরে দু-তিনটা করে টেস্ট খেললে পারফরম্যান্স কোনো দিনই ভালো হবে না। আট থেকে দশটা টেস্ট অন্তত খেলতে হবে। এ রকম আমাদের তিন বছর সুযোগ দিয়ে দেখুন। তারপর যদি কেউ বলে বাংলাদেশ দল টেস্টে যথেষ্ট ভালো নয়, সেটা ভিন্ন কথা। এখন যেভাবে চলছে, এ রকম চললে টেস্টে বাংলাদেশ ভালো করতে পারবে না।

* টেস্টের সংখ্যাটাই তাহলে ব্যাপার, খেলোয়াড়দের টেস্ট খেলার সামর্থ্যে কোনো সমস্যা নেই…
মুশফিক: আমাদের টেস্ট খেলার সামর্থ্য আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। জেনুইন সাতটা ব্যাটসম্যান আছে। জেনুইন চারটা বোলার আছে। সাকিব আছে, এটা বাড়তি সুবিধা। সে বোলার-ব্যাটসম্যান দুভাবেই পারফরম করতে পারে। খেলোয়াড় বাছাইয়ের সুযোগও অনেক বেড়েছে। পরিপূর্ণ ভারসাম্য আছে দলে। শুধু সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

* ২০ উইকেট নেওয়ার কথা বললেন। প্রতিপক্ষকে দুবার অলআউট করার সামর্থ্য কি আসলেই আছে আপনার বোলারদের?
মুশফিক: আমাদের বোলিং সামর্থ্য অবশ্যই ২০ উইকেট নেওয়ার মতো ছিল। কিন্তু টেস্টে বা দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে নিয়মিত ২০ উইকেট নেওয়ার চর্চা না করলে আপনি জীবনেও শিখবেন না কীভাবে ২০টি উইকেট নিতে হয়। টেস্টে একজন পেসার ৫-৬ স্পেলে ২৫-৩০ ওভার বল করে। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে তো আমি কোনো বোলারকেই ২৫-৩০ ওভার বল করতে দেখি না! এখানে অভ্যস্ততা তৈরি না হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কীভাবে পারবেন? একজন বোলারকে জানতে হবে কখন ব্যাটসম্যানকে আক্রমণ করতে হবে বা ডিফেন্স করতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে বাউন্স দিতে হবে, রিভার্স সুইংয়ে ফিল্ড প্লেসিং কী হয়, নতুন বা পুরোনো বলে কী হয়। এ রকম অনেক ছোট ছোট খেলা আছে টেস্টে। ব্যক্তিগতভাবে সবাই সেগুলো না জানলে শুধু অধিনায়ক বা কোচ বললে হবে না। ওয়ানডেতে দেখেন—আমাদের এমন কোনো বোলার নেই যে জানে না তাকে কী করতে হবে। সবাই জানে তাকে ৩-৪ স্পেল বল করতে হতে পারে। তার স্ট্রেংথ জানে। সে এটা করে অভ্যস্ত। প্রিমিয়ার লিগেও সবাই পুরো ১০ ওভার বল করে। চার দিনের ম্যাচেও তা না করলে একজন বোলার কোনো দিনও শিখবে না। ম্যাচ প্র্যাকটিসের অভাব পেস বোলারদের বড় ঘাটতি।

* দ্বিস্তরবিশিষ্ট টেস্টের চিন্তাভাবনা এখনো চলছে। কেউ বলেন বাংলাদেশের জন্য এতে ভালো হবে, কেউ বলেন খারাপ। আপনার কী মতামত?
মুশফিক: দুই রকমই হতে পারে। তবে শক্তিশালী দলের সঙ্গে বেশি খেললে উন্নতিও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দ্বিতীয় স্তরে খেলতে হলে হয়তো টেস্টের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু ও রকমভাবে উন্নতি হবে না। এখন তাই চ্যালেঞ্জ হলো, যে কয়টা টেস্টই খেলব সেগুলো যেন ভালো খেলতে পারি। যারা এসব চিন্তা করছে তারা যেন দেখে বাংলাদেশ দল টেস্টে উন্নতি করছে। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো দ্বিস্তরবিশিষ্ট টেস্ট হলে আমাদের জন্য খারাপই হবে।

* ঘরোয়া ক্রিকেটে নেতৃত্ব নিয়েও মাঝে মাঝে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। টেস্ট দলের নেতৃত্বও তো আপনার কাঁধে! সেটা নিয়ে কী ভাবনা?
মুশফিক: লিগে মোহামেডানের অধিনায়কত্ব ছেড়েছিলাম অ্যাংকেলের চোটের কারণে। ওয়ার্মআপের ৪০ মিনিট আগে আমাকে নামতে হতো, টেপিং-রিহ্যাব করতে হয়তো, এরপর আবার টস। আমি চেয়েছিলাম শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ে ফিজিওর সঙ্গে একটু সময় কাটাতে। মাঠের কাজগুলো অন্য কেউ করুক, আমি প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করব। শারীরিক সমস্যা নিয়ে অধিনায়কত্ব করলে আমিই পুরোটা দিতে পারব না। খেলা নিয়ে চিন্তাগুলো ঠিকভাবে করতে পারব না। তাতে দলের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এটার জন্যই ছাড়া। আর বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্বের কথা যদি বলেন—একজন খেলোয়াড়ের জন্য এর চেয়ে গৌরবের আর কিছু হতে পারে না। ভবিষ্যতেও আমাকে এই দায়িত্বে রাখা হলে অবশ্যই আমি তা পালনের চেষ্টা করব। আগের চেয়ে ভালোভাবেই চেষ্টা করব।

  • ২০০ টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান
  • ২৬৩ বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ
  • ২৯৩ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ডিসমিসাল
Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button