বিনোদন

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ৪৫ বছর পূর্ণ হল আজ

ঢাকা, ১ আগস্ট, (ডেইলি টাইমস ২৪):

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। পৃথিবীতে অবস্থিত বাংলাদেশ নামক একটি ছোট্ট দেশে চলছিল মুক্তিযুদ্ধ। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে এদিন  নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ৪০ হাজার দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে ছোট্ট দেশটির মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ও সাহায্যার্থে ইতিহাস সৃষ্টি করে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। আর এর আয়োজন করেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ‘বিটলস’ তারকা  শিল্পী জর্জ হ্যারিসন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অনুপ্রাণিত করে।

ষাটের দশকে বিশ্বে সাড়াজাগানো বিখ্যাত ব্রিটিশ ব্যান্ড বিটলসের অন্যতম সদস্য জর্জ হ্যারিসন ছিলেন এই কনসার্টের মূল উদ্যোক্তা। ভারতীয় সংগীতের অনুরাগী জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ভারতের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী রবিশঙ্করের গভীর বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর বহু মানুষের দুর্দশা রবিশঙ্করকে ব্যথিত এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। ভারতে আশ্রয় নেওয়া অজস্র বাঙালি শরণার্থীকে সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহের ইচ্ছা থেকে একটি কনসার্ট আয়োজন করা যায় কি না এই ব্যাপারে রবিশঙ্কর একাত্তর সালের মাঝামাঝি সময়ে জর্জ হ্যারিসনকে অনুরোধ করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কেও জর্জ হ্যারিসনকে জানান রবিশঙ্কর। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর এমন অনুরোধ পাওয়ার পর জর্জ হ্যারিসন সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক করেন তিনি একটি কনসার্ট আয়োজনের চেষ্টা করবেন, আর তিনি অন্য অনেক বিখ্যাত শিল্পীকেও অনুরোধ করবেন এই কনসার্টে অংশ নেওয়ার জন্য। রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসনের ইচ্ছা আর চেষ্টা থেকেই এরপর অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক এই কনসার্ট। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে একাত্তরের আগস্ট মাসে নতুনভাবে সচেতন হয়ে ওঠে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু মানুষ।

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৪০ হাজার দর্শক-শোতার উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে উপস্থিত হন প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিংগো স্টার, বিলি প্রেস্টন, রিওন রাসেল, সারোদ শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং পন্ডিত রবি শংকর। অনুষ্ঠানের শুরুতেই রবিশংকর বাংলাদেশের অবস্থার কথা সংক্ষেপে সবার কাছে তুলে ধরেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে। হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতাদের জর্জ হ্যারিসন বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা জানান। কনসার্টে বেশির ভাগ গানই অর্থাৎ ৮টি গানই পরিবেশন করেন জর্জ হ্যারিসন। তাঁর বিখ্যাত গানগুলো গাওয়ার পরই সবশেষে তাঁর নিজের লেখা ও সুরে গেয়ে শোনান সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটি। গানটি দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং ৪০ হাজারেরও বেশি দর্শক দীর্ঘস্থায়ী তুমুল করতালির মাধ্যমে বর্বর পাকিস্তানিদের ধিক্কার জানিয়ে বাংলাদেশকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন দিয়ে জর্জ হ্যারিসনকে বিপুলভাবে অভিনন্দন জানান। এই স্মরণীয় কনসার্ট জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গীত জীবনে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় দুই লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার ডলার- যার পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ও ভারতে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশের অসহায় শরণার্থীদের জন্য দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই জর্জ হ্যারিসনকে বলা হত বাংলাদেশের বন্ধু।

একনজরে জর্জ হ্যারিসন:
জর্জ হ্যারিসনের জন্ম ইংল্যান্ডের লিভারপুলের ওভারট্রিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ সালে। জর্জ হ্যারিসনের বড় ভাই হ্যারি, অপর ভাই পিটার আর মা লুইস এবং বাবা হ্যারি সকলেই আইরিশ অরিজিন ছিলেন। ডোভডেল প্রাইমারি স্কুল লেভেলের পড়াশোনা শেষ করে লিভারপুল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন জর্জ হ্যারিসন এবং স্কুলের বাসে পল ম্যাকাটনের সাথে পরিচয় হয়। ১৩ বছর বয়সে সাড়ে তিন পাউন্ডের একটি পুরনো গিটার কিনে দেন তার মা। জর্জ স্কুলের পথে সেই গিটারের গল্প করলেন পল-এর কাছে। পল তখন জন লেননের ব্যান্ড ‘কোয়ারিমেন’-এর সদস্য তাই জর্জকে নিয়ে গেলেন লেননের কাছে। লেনন জর্জকে পছন্দ করেন এবং ‘কোয়ারিমেন’-এর সদস্য করে নেন।

১৯৬০ সালে ‘কোয়ারিমেন’ ব্যান্ড চুক্তিবদ্ধ হয় ইন্ড্রা ক্লাবের সঙ্গে এবং তখন ‘কোয়ারিমেন’ ব্যান্ড-এর নাম বদল করে রাখা হয় ‘দি বিটলস’। কিন্তু তখন জর্জ-এর বয়স ১৭ হওয়াতে মিউজিক করার ওয়ার্ক পারমিট পাননি। ওয়ার্ক পারমিট পেতে বয়স হতে হয় আঠারো। ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই জর্জ মিউজিক বাজাতে শুরু করলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। ১ বৎসর পর জর্জ ইন্ড্রা ক্লাবের অডিয়েন্সের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন এবং সেই সময় তিনি গান লিখা শুরু করেন। ব্যাপক সফলতার পর ‘বিটলস’ ভেঙ্গে গেলে ১৯৬৩ সালে জর্জ ‘বিটলস’ ত্যাগ করে নিজের মত করে এগিয়ে চললেন।

১৯৬৬ সালে জর্জ বিয়ে করেন পেট্রিকে। ১৯৬৭ সালে জর্জের পরিচয় হয় পন্ডিত রবিশংকর এবং মহাঋষি মহেষ যোগির সাথে। রবিশংকরের সাথে থেকে জর্জ ভারতীয় মিউজিকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন আর মহেষ তাকে শেখান মেডিটেশন। এদিকে বিটলস ব্যান্ড জর্জের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে। ‘সামথিং’, ‘টেক্সম্যান’, ‘হেয়ার কামস দ্য সান’, ‘আই নিড ইউ’, ‘হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস’ প্রভৃতি জর্জের নিজের হাতে করা গান এবং গানগুলো বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। সত্তুরের পরবর্তী সময়ে তাঁর অনেক গান প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য ‘মাই সুইট লর্ড’, ‘গিভ মি পিস অন আর্থ’, ‘আল দোজ ইয়ার্স এগো’, ‘গট মাই মাইন্ড সেট আন ইউ’।পেট্রিকের সাথে ছাড়াছাড়ির পর ১৯৭৭ সালে জর্জ বিয়ে করেন তার সেক্রেটারি অলিভিয়াকে।

১৯৭১ সালে নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ছিল জর্জ হ্যারিসনের শেষ কনসার্ট- যা দীর্ঘদিন রেকর্ড বিক্রির চার্টে এক নম্বর স্থানে ছিল। অক্লান্ত পরিশ্রমে হ্যারিসন শিল্পী ও যন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি এই কনসার্টের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানের গানের অ্যালবামটি সে বছর গ্র্যামি পুরস্কার লাভ করে। ২০০১ সালের ৩০ নভেম্বর লস এ্যাঞ্জেলসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জর্জ হ্যারিসন চিরবিদায় নেন।

 

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button