জেলার সংবাদ

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান ববিজান

ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস ২৪):

সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত নারীদের খেতাব দিয়েছেন ‘বীরাঙ্গনা’ মানে সাহসী নারী। কিন্তু সামাজিকভাবে হয়রানির ভয়ে অনেকেই বীরঙ্গনা শব্দটা ব্যবহার করতে চান না। তাই মির্জাপুরের বীরাঙ্গনা ববিজান বেগম চান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

তিনি এ উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত আরাদন আলীর মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর।

জানা গেছে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে একই গ্রামের দবু খাঁর ছেলে দুদু খাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় ববিজানের। সাত বছরের সংসারজীবন চলাকালে শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। তাদের গ্রামে ক্যাম্প স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনা। ১৯ বছরের তরুণী গৃহবধূ ববিজানের ওপর নজর পড়ে পাক সেনা ও এদেশীয় দোসরদের। সেদিনের সেই ভয়াবহতার কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন ববিজান বেগম।

বৃদ্ধা ববিজান বেগম জানান, যুদ্ধ চলাকালে একদিন পাকিস্তানি সেনারা গ্রামের বাঁশতৈল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিএসসি ও আরো কয়েকজনের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ওই দিনই পাক সেনারা গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকেসহ কয়েকজন নারীকে ধর্ষণ করে। অস্ত্রের ভয় আর গণধর্ষণের কারণে জ্ঞান হারান তিনি।

গণধর্ষণ শেষে পাক সেনারা চলে গেলে আশপাশের বাড়ির লোকজন উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন তাকেসহ অন্য ধর্ষিতাদের। কিন্তু সুস্থ হলেও ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয় তাকে।

সাত বছরের সংসার জীবন থেকে এক বছরের শিশুকন্যা রহিমাকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন ববিজান। ঘরে সৎ মা থাকায় বাবার অভাবের সংসারে বেশি দিন ঠাঁই হয়নি ববিজান এবং তার শিশু মেয়ের।

যুদ্ধের কিছুদিন পর ময়মনসিংহের আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে হয় ববিজানের। কিন্তু আগে থেকে তার স্ত্রী-সন্তান থাকায় সেখানে বেশিদিন সংসার করতে পারেননি তিনি। দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে জন্ম নেয়া ছেলে রফিকুলকে নিয়ে ফিরে আসেন বাবার বাড়ি বাঁশতৈল গ্রামে।

তার বাবার মৃত্যুতে সৎমায়ের সংসারে জায়গা না হওয়ায় সরকারি জমিতে ঘর তুলে মেয়ে রহিমা ও ছেলে রফিকুলকে নিয়ে সেখানে কোনো রকম বসবাস শুরু করেন। শিশু ছেলে মেয়ে নিয়ে ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে চলতে থাকে ববিজানের সংসার।

তার এই দুরবস্থা দেখে বাঁশতৈল গ্রামের বৃদ্ধ ইয়াদ আলী তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। ৭ বছর আগে ইয়াদ আলী মারা গেলে ছেলে রফিকুলের সঙ্গে বন বিভাগের জায়গায় বসবাস করতে থাকেন।

২০ বছর আগে বন বিভাগের একটি প্লট পান ববিজান বেগম। কিন্তু সেই প্লট নিয়েও বাঁশতৈল গ্রামের গফুর মিয়ার ছেলে নুরু মিয়া নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করেন ববিজান বেগম। অথচ নূরু মিয়ার নামে বন বিভাগের তিনটি প্লট রয়েছে বলেও জানান ববিজান।

বয়স হওয়ায় এখন কানেও কম শোনেন, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। ববিজানের দুঃখ, যুদ্ধের পর সমাজ তো তাদের মেনেই নেয়নি, উল্টো খারাপ কথা ও কটূক্তি শুনতে হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও কষ্ট গেল না তার।

ববিজান বলেন, কেউ তো কোনো দিন আমার খবরও নেয় না। এ কথা কারও কাছে বলতেও ভালো লাগে না।

সরকারি কোনো সুবিধা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষের লাঞ্ছনা, ঘৃণা, অপবাদ আর ঘাড়ধাক্কা পেয়েছি।

বয়স্ক বা বিধবা ভাতা তো পানইনি, বন বিভাগের একটি প্লট ছাড়া সরকারি কোনো সযোগ-সুবিধাও পাননি বলে জানান তিনি। কাজকার্ম করতে না পারায় ছেলের সংসারে খেয়ে না খেয়ে কাটছে বীরাঙ্গনা বৃদ্ধা ববিজানের দিন। বাঁশতৈল গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য আব্দুল হাই বলেন, খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধা ববিজান বেগম।

বাঁশতৈল ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইয়াকুব আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যেদিন পাক সেনারা বাঁশতৈল গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিএসসির বাড়িসহ কয়েকটি বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়, একই দিন দুদু খাঁর বাড়িতে ঢুকে ববিজানসহ গ্রামের কয়েকজন নারীকে ধর্ষণ করে পাক সেনারা। ওই ঘটনার পর দুদু খাঁ ববিজানকে ত্যাগ করেন বলে সাংবাদিকদের জানান।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ওই এলাকার মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা জানতে পেরেছি। ভবিষ্যতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাঁশতৈল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান মিল্টনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ববিজানের বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি সবে মাত্র ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে খোঁজ খবর নিয়ে সরকারি সুবিধা পাওয়ার সকল ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button