রাজনীতি

রোহিঙ্গা সংকটে উদ্বিগ্ন জাকার্তা রাজনৈতিক সমাধান চায়

ঢাকা, ২১ ডিসেম্বর , (ডেইলি টাইমস ২৪):

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে ইন্দোনেশিয়া। আসিয়ানভুক্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি এতদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে আসছিল। আগের অবস্থান পরিবর্তন করে ঢাকা সফররত ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় জানিয়েছেন যে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। জাকার্তা এ সংকটের আঞ্চলিক ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমাধান চায়। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে বিশেষ সভা করতে যাচ্ছে, সেখানেও বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনার পক্ষে তাদের অবস্থান। ওআইসিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কাজ করতে চায় জাকার্তা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। এদিকে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিয়ানমারে সম্প্রতি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর দমন-পীড়ন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মঙ্গলবার কক্সবাজার জেলার উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে আইওএম মিশন প্রধান শরৎ দাস ও ঢাকায় ইউএনএইচসিআর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শিনজি কুবো। তাদের পরিদর্শনের পর এ বিবৃতি দিয়েছে অভিবাসী ও শরণার্থীবিষয়ক আন্তর্জাতিক এ দুই সংস্থা।

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উখিয়া থেকে ঢাকায় ফিরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। বৈঠকের বিস্তারিত জানা না গেলেও বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মারসুদি রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা করেছেন। এর আগে সকালে হেলিকপ্টারে উখিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়।

আইওএম ও ইউএনএইচসিআর বলেছে, সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংকটজনক অবস্থা দেখেছেন দুই মন্ত্রী। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে জানতে একদিনের সফরে সোমবার রাতে ঢাকায় আসেন। মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান ন্যাশনস’ (আসিয়ান) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের বৈঠকের প্রেক্ষাপটে মারসুদি বাংলাদেশ সফর করলেন। সোমবার আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইয়াঙ্গুনে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর এ নিষ্ঠুরতায় মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির প্রধান নোবেল বিজয়ী সুচির সায় আছে কিনা তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। মিয়ানমারে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী নয়; বরং সেখানে সেনাবাহিনী যথেষ্ট কর্তৃত্বপরায়ন।

আইওএম ও ইউএনএইচসিআর জানায়, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ায় নিবন্ধিত শরণার্থী শিবির ও অনিবন্ধিত খুপরি ঘরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করে। তারা আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। চলতি বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন তাদের অবস্থা জেনেছেন তারা। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপর রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের ফলে যে ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন; তাদের কাছ থেকে সেখানকার বর্তমান অবস্থার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় ধারণা পেয়েছেন বলে আইওএম ও ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।

আইওএম ও ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিরা ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রীকে রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের সেবার বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন। কক্সবাজারে দুটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির রয়েছে। এ দুই শিবিরে নিবন্ধিত ৩২ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। তাদের বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করে থাকে ইউএনএইচসিআর ও তাদের অংশীদাররা। শরণার্থী শিবিরের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তাদের অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খুপরি ঘরে থাকা এমন রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে দুরবস্থায় পড়া এক লাখ রোহিঙ্গার জন্যে সেবা দিয়ে থাকে আইওএম ও তার অংশীদাররা।
ঢাকায় ইউএনএইচসিআরের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শিনজি কুবো বলেছেন, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতায় সেখান থেকে পালিয়ে আসা লোকজনকে জরুরি মানবিক সুবিধা দিতে সরকারকে আহ্বান জানায় তারা। বাংলাদেশে আইওএম মিশন প্রধান শরৎ দাস বলেন, উচ্চপর্যায়ের সফরের ফলে সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বাংলাদেশে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত আইওয়ান উইরানাতা-আটমাডজা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক।

৯ অক্টোবর সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলায় মিয়ানমারের নয়জন সীমান্তরক্ষী নিহত হওয়ার জেরে দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে নির্যাতন করছে। সেখানে এ পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button