জাতীয়

ঢাকায় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে থাকতে জোর তদবির

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি , (ডেইলি টাইমস ২৪):

পাঠ্যবই ছাপা, পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও বই সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) শিক্ষাক্যাডারের ৬৩টি পদ রয়েছে। ঢাকায় থাকার পাশাপাশি এসব পদের ‘আর্থিক সুবিধাও’ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। কোনো কোনো পদে অনৈতিক পথে অর্থ আয়ের সুবিধাও বেশি। আর এ কারণে এসব পদে থাকার জন্য একপ্রকার মরিয়া হয়ে উঠেন শিক্ষকরা। তবে ‘পাঠ্যবইয়ে ভুল করে’ এবার প্রথমই বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকায় থাকার জন্য শিক্ষকদের অন্যতম পছন্দের প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি। আর এ প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে আসার জন্য জোর তদ্বির থাকে তাদের। ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটিতে আছেন এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম) এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছেন। ২০১৩ সালে এই কর্মকর্তার প্রধান সম্পাদক পদে থাকার সময় পাঠ্যবইয়ে ভুল হয়, যা এবারই প্রকাশ পায়। প্রায় একই সময় ধরে এ প্রতিষ্ঠানটিতে আছেন বিতরণ নিয়ন্ত্রকও।
পদের নাম বিশেষজ্ঞ। অভিজ্ঞতা না থাকলেও ‘পদের’ কারণেই এখানে এসে শিক্ষকরা ‘বিশেষজ্ঞ’ হন। এ কারণে ভুলও হচ্ছে। এনসিটিবিতে ১০ জন ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, ১৫ জন বিশেষজ্ঞ, ২১ জন গবেষণা কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য। এদের বেশিরভাগই ঢাকায় থাকার জন্য তদ্বির করে এসেছেন। অনেকেই রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে একই পদে, একই প্রতিষ্ঠানে।

 

লানা হুমায়রা খান বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপক। অর্থনীতির শিক্ষক হলেও এনসিটিবিতে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কবি কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা বিকৃত করে ছাপা হওয়ায় তাকে দায়ী করা হয়েছে। এ কারণে তাকে ওএসডি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

 

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পান তাদের ওপর একাধিক বই দেখভালের দায়িত্ব থাকে। অসতর্কতার কারণে কোনো ভুল করলে এর দায় তাকেই নিতে হবে। এই কর্মকর্তারা আরো বলেছেন, এখানে সারা দেশ থেকে বাছাই করে অভিজ্ঞদের নিয়োগ বা প্রেষণে দেয়া উচিত। কিন্তু তা হচ্ছে না। যার তদ্বিরের জোর বেশি, তার এই প্রতিষ্ঠানটিতে আসার সুযোগও বেশি এবং একই কারণে বেশি দিন থাকারও সুযোগ থাকে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, যারা এনসিটিবিতে দীর্ঘদিন ধরে আছেন তাদের তালিকা নেয়া হচ্ছে। এদের বদলির চিন্তাভাবনা চলছে। এছাড়া যারা ভুল করেছেন তাদের তালিকাও মন্ত্রণালয়ে এসেছে। এদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে এনসিটিবিতে আছেন তাদের মধ্যে বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শক্তিশালী সিন্ডিকেট:

এনসিটিবিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছেন তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তার পাশাপাশি ছাপাখানার কয়েকজন মালিকও এই সিন্ডিকেটে জড়িত। প্রতিবছর প্রায় হাজার কোটি টাকার বইয়ের কাজ হয়। অভিযোগ উঠেছে, যোগসাজশে এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে একটি কমিশন ভাগিয়ে নেন এনসিটিবিরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, উত্পাদন ও বিতরণ শাখার মাধ্যমেই এই সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এ সিন্ডিকেটের কারণে অসহায় থাকনে এনসিটিবির চেয়ারম্যানও।

ভুল ২০১৩ সাল থেকেই:

এবার পাঠ্যবইয়ে যে ভুল ধরা পড়েছে তার বেশিরভাগই ২০১৩ সাল থেকেই হয়েছে।  তৃতীয় শ্রেণির বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে ইংরেজিতে লেখা ডু নট হার্ট এনিবডি। এখানে ‘আঘাত করা’ অর্থে হার্ট শব্দটি লেখা হলেও, বানান ভুলের কারণে হার্টের অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘হূদয়’। এই ভুলটি হয়েছিল ২০১৩ সাল থেকেই।  ও-দিয়ে বাক্য গঠনে ওলের পরিবর্তে ওড়না ব্যবহার নিয়েও চলছে বিতর্ক। এসব ভুলও হয়েছে ২০১৩ সাল থেকেই। ২০১৩ সালে এই ভুলের দায়ভার নেয়ার কথা তত্কালীন প্রধান সম্পাদকের। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি এখন এনসিটিবিরি সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম) অধ্যাপক ড. মোঃ আবদুল মান্নান। গতকাল তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন, এই ভুলগুলো ২০১৩ সালেই হয়েছিল।

 

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী (রতন সিদ্দিকী) বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন ধরে আছেন তাদের বদলি করার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের’।

Show More

আরো সংবাদ...

Back to top button